বললুম, -কথাটা আপনি শুনতে পেয়েছেন?
– হ্যাঁ। এমনকী তাকে সম্ভবত দেখতেও পেয়েছি।
-আপনি তো পিছু ফেরেননি!
কর্নেল হাসলেন, –আমার পেছনেও চোখ আছে ডার্লিং! যাই হোক, আমরা ফার্স্টক্লাসের সামনে এসে গেছি। রিজার্ভেশনের দরকার মনে করিনি। দেরি একটু করলেও পানাগড় হয়ে ট্রেনটা রাত আটটার মধ্যে পৌঁছনোর কথা। চলো, ওঠা যাক।
ফাস্টক্লাসে উঠে খুঁজতে-খুঁজতে একটা খালি কুপ পাওয়া গেল। দুদিকে জানালার ধারে দুজনে বসলুম। কর্নেলের কিটব্যাগ সিটে তার পাশে রইল। অন্য ব্যাগটা সিটের তলায় ভরে দিলেন উনি। গলায় ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার ঝুলছিল। সেটা ওঁর পেটের কাছে আটকে থাকল।
মাথার টুপি খুলে টাকে হাওয়া দিতে দিতে বললেন, -ট্রেন ছাড়বার সময় ফ্যান চালু হবে। কী ভ্যাপসা গরম! আবার বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে।
আমার ব্যাগ পায়ের কাছে রেখে আরাম করে বসেছিলুম। কিন্তু একটু পরেই এক প্রৌঢ় অবাঙালি ভদ্রলোক দুটো প্ৰকাণ্ড সুটকেস কুলির মাথায় চাপিয়ে কুপে ঢুকে আমাকে বললেন, -ইয়ে লোয়ারবার্থ হামনে রিজার্ভ কিয়া। উয়ো সিট হামারা হ্যায়।
অগত্যা জানালার মায়া ত্যাগ করে কর্নেলের পাশে গিয়ে বসলুম। তারপর কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে এক দম্পতি ঢুকলেন। তাঁদেরও এই লোয়ারবার্থ রিজার্ভ করা। কিন্তু এই ভদ্রলোক বাঙালি। তার স্ত্রী সম্ভবত কর্নেলের ঋষির মতো চেহারা দেখে ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, –না-না! আপনি বসুন। এই টিংকু! কী হচ্ছে? রিংকু! অমন করে না! দাদুকে বসে থাকতে দাও।
ততক্ষণে কর্নেল কচি ছেলে-মেয়ে দুটিকে পাশে জানালার ধারে বসিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে গল্প জুড়েছেন। তারাও কর্নেলের দাড়ি দেখে অভিভূত। তাদের বাবা-মা আমার পাশে বসেছেন। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, কতদূর যাবেন আপনারা?
বললুম, দুর্গাপুর! আপনারা?
আমরা পাটনা। –তিনি ঘড়ি দেখলেন, আপনারা আটটা- সওয়া আটটার মধ্যে পৌঁছে যাবেন, যদি লেট না করে। মধ্যে মাত্র দুটো স্টপ। বর্ধমান আর পানাগড়।
এবার ঢুকলেন বেঁটে মোটাসোটা এক ফো ভদ্রলোক। তাঁর হাতে শুধু একটা ব্রিফকেস। অবাঙালি ভদ্রলোকের লোয়ার বার্থ এবং তার আপার বার্থ! তিনি আমাদের উল্টোদিকের সেই লোয়ার বার্থে বসে পাইপ ধরালেন। তারপর কর্নেলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। দৃষ্টিটা কেমন যেন সন্দেহজনক। অথবা আমার চোখের ভুল!
ঠিক সাড়ে তিনটেতে ট্রেন ছাড়ল। তার কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টির ছাট আসছিল। অবাঙালি ভদ্রলোক কাচ নামিয়ে দিলেন। কিন্তু মায়ের বকুনি সত্ত্বেও টিংকু-রিংকু দাদু-কে কাচ নামাতে দিল না। তারা বৃষ্টি দেখবেই।
দু-ঘন্টা পরে ট্রেন বর্ধমান পৌঁছল! এইসময় কর্নেল উঠে গেলেন। সম্ভবত কফির নেশায়। তার একটু পরে সেই গুফো ভদ্রলোকও উঠে গেলেন। দশ মিনিটের স্টপ। সময় কাটতে চায় না। টিংকু-রিংকু এবার কর্নেলের সিটে বসেছে। কিন্তু ট্রেন ছাড়ল, তবু কর্নেলের পাত্তা নেই। একটু উদ্বিগ্ন হয়ে কুপের দরজা দিয়ে উঁকি মারলুম। কিন্তু কর্নেলকে দেখতে পেলুম না। তারপর করিডরে ডাইনে তাকাতেই দেখি, কর্নেল তুম্বামুখে এগিয়ে আসছেন। বললুম, -এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?
কর্নেল জবাব না দিয়ে কুপে ঢুকে টিংকু-রিংকুর পাশে বসলেন। তারপর সেই ফো ভদ্রলোককে এতক্ষণে ফিরতে দেখলুম। তার ব্রিফকেস সিটেই ছিল। তিনি সিটে বসে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, -ওভাবে ট্রেন ছাড়ার সময় আমাকে ধাক্কা দিয়ে কফির কাপ ফেলে দেওয়া আপনার উচিত হয়নি। আপনি বৃদ্ধ মানুষ। কাণ্ডজ্ঞান থাকা উচিত!
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, আমি পেপারকাপ ফেলে দিয়ে উঠতে যাচ্ছিলুম। কিন্তু আপনি দরজায় যে-ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাতে আমার অ্যাকসিডেন্ট হতে পারত। ভাগ্যিস আমি আপনার হাতটা আঁকড়ে ধরেছিলুম।
ভদ্রলোক খাপ্পা হয়ে বললেন, -আমাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, না টেনে প্লাটফর্মে নামিয়ে ছিলেন? তারপর তো আপনি দিব্যি চলন্ত ট্রেনের অন্য দরজা দিয়ে উঠে পড়লেন। আমি যদি উঠতে না পারতুম?
উঠতে পেরেছেন তো! –বলে কর্নেল সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন।
গুঁফো ভদ্রলোক সরোষ দৃষ্টিতে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে ফেস শব্দে শ্বাস ছেড়ে বললেন, -মাঝখান থেকে আমার তিনশো টাকা দামের বিলিতি পাইপটা গচ্চা গেল! দেবেন কিনে?
কর্নেল চোখ না খুলেই বললেন, -আবার যদি দেখা হয়, সুদে-আসলে পুষিয়ে দেব।
আমার পাশের বাঙালি ভদ্রলোক-মানে টিংকু-রিংকুর বাবা মধ্যস্থতা করার জন্য বললেন, -ট্রেন ছাড়বার সময় দরজা একটু ধাক্কাধাক্কি হয়েই থাকে।
গুঁফো ভদ্রলোক খেঁকিয়ে উঠলেন, –না! উনি আমার হাত ধরে টেনে প্লাটফর্মে ফেলে দিয়েছিলেন।
কর্নেল চোখ খুলে এবার একটু হেসে বললেন, -উঁহু! উনি আমাকে উঠতে বাধা দিচ্ছিলেন। অগত্যা ওঁকে টেনে প্লাটফর্মে নামাতেই হল। যাওয়া না হয় তো দুজনেরই হোক।
বাজে কথা বলবেন না! –গুফো ভদ্রলোক বললেন? জানেন আমি কে? পানাগড়ের সিনহা সাপ্লাই কোম্পানির ম্যানেজার। আমার নাম ভূতনাথ হাজরা। আমার কোম্পানি পানাগড় মিলিটারি ক্যাম্পে অর্ডার সাপ্লাই করে।
কর্নেল বললেন, – বাহ! তাহলে তো আপনি মিলিটারি বিমান ঘাঁটির ক্যাপ্টেন ডি. এন. সাঠেকে চেনেন! তাঁকে বলবেন, বর্ধমান স্টেশনে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে একটু মল্লযুদ্ধ হয়েছিল।
