গোয়েন্দামশাই ব্যস্তভাবে একটা খবরের কাগজ তুলে পাতা ওলটাতে থাকলেন, -কোন্ পাতায় খবরটা দেখলাম য্যান?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, –ছয়ের পাতায়, মফস্বলের খবরে পাবেন। অ্যান্টিক ঘড়ি চুরি।
ডাঃ চক্রবর্তীও নড়ে বসলেন, –ময়ূরগড়ের সেই জমিদারবাড়ির ঘড়ি চুরি গেছে?
হ্যাঁ। আপনার দেখা সেই জমিদার প্রমোদরঞ্জনের এক ছেলে মনোরঞ্জন রায় ওই বাড়িতে বাস করেন। অন্য ছেলে সুরঞ্জন রায় দুর্গাপুর থাকেন।
হালদারমশাই খবরটা বিড়বিড় করে পড়ার পর সোজা হয়ে বললেন। তার গোঁফ তিরতির করে কাঁপছিল। বুঝলুম, উনি খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন লিখছে, ছয়খানা অ্যান্টিক ঘড়ি চুরি গেছে। অ্যান্টিক কী?
কর্নেল বললেন, শতাধিক বছরের পুরনো জিনিসকে সাধারণত অ্যান্টিক বলা হয়। যে কোনও অ্যান্টিক জিনিসের বাজারদর চড়া। বলা যায় না, ছখানা অ্যান্টিক ঘড়ির দাম লাখ-দেড়লাখ টাকা হতেই পারে।
ডাঃ চক্রবর্তী বললেন, -এক দেড়লাখ কী বলছেন কর্নেলসায়েব? ওই বাড়িতে যে সব ঘড়ি দেখেছি, তার একটার দামই হয়তো এক-দেড়লাখ। ওইসব ঘড়ি চোখে না দেখে কল্পনা করা যায় না সেকালের ঘড়ি তৈরিতে কী অসাধারণ দক্ষতা ছিল!… খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। চল্লিশবছর হয়ে গেল প্রায়। আর ময়ুরগড়ে যাওয়া হয়নি। দাদামশাইয়ের মৃত্যুর পর মামারা। দুর্গাপুরে গিয়ে বাড়ি করেছিলেন। কার কাছেই বা যাব?
বলে ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়ালেন। কফির জন্য কর্নেলকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
হালদারমশাই বললেন, -চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। এমন ঘড়ি চুরির কেস কখনও হাতে পাই নাই। ডাক্তারবাবু যে সব ঘড়ির কথা কইয়া গেলেন, তাও চোখে দেখি নাই।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, -সব ঘড়ি তো চুরি যায়নি লিখেছে। এখনও অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত ঘড়ি থাকতে পারে। ইচ্ছে হলে ময়ুরগড় গিয়ে দর্শন করেও আসতে পারেন।
গোয়েন্দাপ্রবর হাসলেন, ইচ্ছা তো করে। ক্লায়েন্ট আমারে হায়ার না করলে যাই ক্যামনে?
– আপনি তো ছদ্মবেশ ধরতে পটু। ছদ্মবেশে চলে যান। কোনও একটা ছলছুতো করে মনোরঞ্জনবাবুর সঙ্গে গিয়ে আলাপ করুন। আপনার তো ডিটেকটিভ এজেন্সির লাইসেন্স আছে। অসুবিধে কীসের?
হাসতে-হাসতে বললুম, কর্নেল আপনাকে তাতাচ্ছেন হালদারমশাই!
হালদারমশাই হাসলেন, না জয়ন্তবাবু! কর্নেলস্যার যা-ই কন, আমার কিন্তু সত্যই দেখতে ইচ্ছা করতাছে। ডাক্তারবাবু পাখির কথা কইলেন। এক ইঞ্চি সায়েবের সিঁড়ি দিয়া নামিয়া ঘণ্টি বাজানোর কথা কইলেন।
বললুম–তাহলে চলে যান।
–যাব?
–হ্যাঁ। স্বচক্ষে গিয়ে দেখে আসুন। লোকে সুন্দরবনে বাঘ দেখতে যায় না?
হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। জানালা দিয়ে বৃষ্টির অবস্থা দেখে বললেন, -নাহ। বৃষ্টি কমছে। যাই গিয়া।
কর্নেল বললেন, খিচুড়ি আর ইলিশের কী হবে হালদারমশাই?
আইজ না কর্নেলস্যার! বাড়িতে কুটুম্ব। যাই গিয়া! –বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর ঘর থেকে কেন যেন সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
বললুম, -কাজটা ঠিক করলেন না কর্নেল! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, হালদারমশাই আজই ময়ূরগড়ে চলে যাবেন। আর খামোকা নাক গলাতে গিয়ে বিপদে পড়বেন।
কর্নেল হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। আস্তে বললেন, -আমরাও আজ ময়ুরগড় রওনা হচ্ছি জয়ন্ত!
চমকে উঠে বললুম, তার মানে?
-মানে অতি সহজ ডার্লিং! প্রাক্তন খনি ইঞ্জিনিয়ার মনোরঞ্জন রায় আমার বন্ধু। বছর পাঁচেক আগে ময়ুরগড় এলাকার পোড়োখনিগুলোতে এক বিশেষ প্রজাতির অর্কিড দেখেছিলুম। এই বর্ষাকালে সেগুলোর মধ্যে বেছে তিন-চারটে আনতে পারলে আশা করি শীত নাগাদ ফুল ফোঁটাতে পারব।
উঁহু! শুধু অর্কিড বলে মনে হচ্ছে না! রহস্যের ঝুলিটা একটু খুলুন কর্নেল!
কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলাতে বুলোতে বললেন, -রহস্যের ঝুলি খোলা খুব। সহজ নয় জয়ন্ত! কারণ রায়মশাই গত রাতে ময়ুরগড় থেকে ট্রাংককল করে শুধু বললেন, শিগগির যেন তাঁর কাছে যাই। তিনি নাকি খুব বিপদের মধ্যে আছেন। ব্যস! এই দুটি কথা। তারপর আজ সকালের কাগজে তাঁর বাড়ি থেকে ছটা মূল্যবান অ্যান্টিক ঘড়ি চুরির খবর পড়লুম। মফস্বলের খবর। কাজেই তুমি নিজে সাংবাদিক হয়ে বুঝতে পারছ, এসব খবর একটু দেরি করেই ছাপে।
সায় দিয়ে বলুম, -হ্যাঁ। নিছক খালি জায়গা ভরাতেই ছাপা হয়।
কর্নেল হাঁকলেন, -ষষ্ঠী!
ষষ্ঠীচরণ পরদার ফাঁকে মুখ বের করে বলল, আজ্ঞে বাবামশাই?
– এবেলা খিচুড়ি আর দুরকমের ইলিশ। তোর দাদাবাবুর নেমতন্ন।
ষষ্ঠী হাসল, – আজ্ঞে বাবামশাই, তা কি আর বুঝিনি?
.
পায়ে-পায়ে বিপদ
হাওড়া স্টেশনে দুর্গাপুরগামী ট্রেন ধরতে গিয়ে সেদিন বিকেলেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। ট্রেন ছাড়ার কথা সাড়ে তিনটেতে। সদ্য বাঁদিকের প্লাটফর্মে একটা মেল ট্রেন এসে পৌঁছেছে এবং ডানদিকের প্লাঠফর্মে আমাদের ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে। তাই প্লাটফর্মে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। কর্নেল আগে এবং আমি তার পেছনে ডানদিক ঘেঁষে ভিড় ঠেলে হাঁটছিলুম। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ চাপাস্বরে বলে উঠল, বুড়ো মরতে চলেছে রে!
সঙ্গে-সঙ্গে পিছু ফিরেছিলুম। কিন্তু পেছনের অসংখ্য মুখের ভিড়ে কোন মুখ থেকে কথাটা বেরিয়েছে, বুঝতে পারলুম না। বারবার পিছু ফিরে লক্ষ রাখতে যাচ্ছিলুম। এই সময় কর্নেল ভিড়ের মাঝে হঠাৎ থেমে একটু হেসে বললেন, -লক্ষণ শুভ জয়ন্ত! যাত্রার শুরুতেই হুঁশিয়ারি!
