রামভগতের বউ বলে উঠল, -হা হুজুর। আমি কাল রাতে নব আর ওই ডাকুর সঙ্গে বড় সাহেবকে চুপি-চুপি কথা বলতে দেখেছিলাম।
কর্নেল বললেন, –মিস্টার প্রসাদকে নবর লেখা একটা চিঠি এবার দেব। তবে তার আগে আফগান হাউন্ডকে একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক।
বাংলোর লনে জ্যোৎস্নায় কালো রঙের ভয়ংকর একটা আফগান হাউন্ডের মৃতদেহ দেখার ইচ্ছে আমার ছিল না। বারান্দায় চুপচাপ বসে পড়লাম।
২.১৬ হিকরি ডিকরি ডক রহস্য
অ্যান্টিক ঘড়ি চুরি
ভোরবেলা থেকেই আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। এতক্ষণে ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার আমাদের প্রিয় হালদারমশাই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। বৃষ্টির শব্দ শুনে জানালার দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে উঠলেন, -ব্যস! জব্বর একখান বাধল এবার!
বললুম, –তা বাধুক না হালদারমশাই! আমরা কর্নেলের গেস্ট হয়ে খিচুড়ি খাব। বৃদ্ধ প্রকৃতিবিজ্ঞানী অর্কিড সংক্রান্ত একটা রঙিন ছবির বই পড়ছিলেন। বললেন, – সুখবর আছে। জয়ন্ত! ষষ্ঠী আজ বাজার থেকে বাংলাদেশের ইলিশ এনেছে। হালদারমশাই বিরস মুখে বললেন, –কয় তো পদ্মার ইলিশ! আসলে কোলাঘাটের। হাসতে-হাসতে বললুম, -ও! আপনি তো খাঁটি বাঙাল। আমরা ঘটি। আমাদের মুখে সব ইলিশই ইলিশ!
হালদারমশাই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ডোরবেল বাজল। কর্নেল অর্কিডের বই টেবিলে রেখে হাঁক দিলেন, -ষষ্ঠী!
তারপর অ্যাশট্রে থেকে আধপোড়া চুরুটটা তুলে লাইটার জ্বেলে ধরালেন। সাদা দাড়ি ঝেড়ে তিনি বললেন, –ডাঃ চক্রবর্তী আসছেন। তার খাতিরে আর এক দফা কফি খাওয়া যাবে।
একটু অবাক হয়ে বললুম, -তাঁর আসবার কথা ছিল বুঝি?
-নাহ। কথা ছিল না।
-তাহলে কী করে বুঝলেন?
আমার কথা থেমে গেল। সত্যিই পাড়ার ডাক্তার তারক চক্রবর্তী হাতে ডাক্তারি ব্যাগ এবং গলায় স্টেথিসকোপ ঝুলিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তারপর আমাদের দেখে সহাস্যে বললেন, -বাহ! বেশ জমাট আড্ডায় ঢুকে পড়লুম তাহলে!
কর্নেল বললেন, –বুঝলেন ডাঃ চক্রবর্তী? জয়ন্ত এইমাত্র জিজ্ঞেস করছিল, আপনিই যে ডোরবেলের সুইচ টিপেছেন, তা বুঝলুম কী করে? বুঝলুম দুটো কারণে। দোতলায় লিন্ডাদের কুকুরটা চাঁচাল না, এবং ডোরবেল খুব আস্তে বাজল।
ডাঃ চক্রবর্তী অবাক হয়ে বললেন, -কী অদ্ভুত!
মোটেও নয়। -কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, কোনও লোক যদি তেতলায় আমার ডেরায় প্রায়দিনই আসে, লিন্ডাদের কুকুর রেক্সি চুপ করে থাকে। কিন্তু মাঝে-মাঝে এলে একটুখানি চাঁচায়। কেউ কদাচিৎ এলে বা প্রথমবার এলে রেক্সি প্রচণ্ড চ্যাঁচামেচি করে। তো লিন্ডার। ঠাকুরদা মিঃ জেভিয়ার অসুস্থ এবং আপনাকে রোজই এ সময় আসতে হচ্ছে। তাই রেক্সি চুপ করে ছিল। আর ডোরবেল! আপনি ডাক্তার মানুষ। যে সুইচ নানারকম লোকেরা আঙুল দিয়ে টেপে, আপনি তা একটুখানি ছুঁয়ে দেন। হা-এটা আমি লক্ষ করেছি। আপনি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, এটা তো ঠিক কাজ। কারও সুইচ জোরে টিপে ডেটল-জলে হাত ধোয়াটা কাজের কথা নয়। ধরুন, আপনার আগে যে সুইচ টিপেছিল, তার আঙুলে বা হাতে কোনও ক্ষত আছে, যা থেকে বিষাক্ত ভাইরাস সুইচে আটকে গেছে।
ডাঃ চক্রবর্তী হো-হো করে হেসে উঠলেন, –এনাফ! দ্যাটস্ এনাফ কর্নেলসায়েব! আপনি সত্যি বলেছেন। বিশেষ করে আপনার ঘরে ঢুকলে এক পেয়ালা কফি না খেয়ে যাব না। বাঁ হাতে এই ব্যাগ, ডানহাতের আঙুলে সুইচ টিপি। অবশ্য এ আমার বাতিক, তা নিজেও বুঝি!
ষষ্ঠী সকালবেলায় কফির জল তৈরিই রাখে। ঝটপট ট্রেতে কফির পট, দুধ, চিনি, চামচ আর চারটে কাপ আনল। কর্নেল বললেন, -যে যার নিজের পছন্দমতো কফি তৈরি করে নিন। আগে ডাঃ চক্রবর্তী।
কফি খেতে-খেতে কর্নেল দোতলার জেভিয়ার সায়েবের অসুখ সম্পর্কে ডাঃ চক্রবর্তীর কাছে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। এই সময় দেয়ালঘড়িতে চারবার পিয়ানোর মিঠে সুর বাজার পর ঢং-ঢং করে নটা বাজল।
ডাঃ চক্রবর্তী বললেন, -বাহ! ঘড়িটা তো সুন্দর বাজনা বাজায়।
কর্নেল বললেন, -জাপানি ঘড়ি। ব্যাটারিতে চলে। পনেরো মিনিটে একটা সুর, আধঘন্টায় দুটো সুর, পঁয়তাল্লিশ মিনিটে তিনটে আর পুরো ঘন্টায় চারটে সুর বাজে।
ডাঃ চক্রবর্তী বললেন, -তবে যা-ই বলুন কর্নেলসায়েব! পুরোনো আমলের ঘড়ির কারিগরি ছিল ভারি আশ্চর্য! আমার দাদামশাইয়ের বাড়ি ময়ূরগড়ে ছোটবেলায় সেখানে বেড়াতে যেতুম। ময়ুরগড়ের জমিদার ছিলেন আমার দাদামশাইয়ের বন্ধু। তার সঙ্গে জমিদারবাড়ি গিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে যেতুম। জমিদারবাবুর ঘড়ির নেশা ছিল প্রচণ্ড। দোতলায় যে ঘরে উনি থাকতেন, সিঁড়ির দু-ধারের দেয়াল থেকে শুরু করে বারান্দা, তারপর ঘরের ভেতর চারদেওয়ালে অজস্র নানা সাইজের ঘড়ি টাঙানো থাকত। আর সে কী বাজনা! তবে তার চেয়ে অদ্ভুত, কোনও ঘড়ির ভেতর খুদে পাখি ঘটা বাজছে, ততবার একটা ঘণ্টিতে ঠোঁট ঠুকত। আবার কোনও ঘড়ির ভেতর পেতলের সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে খুদে এক ইঞ্চি এক সায়েব নেমে এসে ঘণ্টিতে খুদে হাতুড়ির ঘা দিত। ওহ! না দেখলে কল্পনা করা যায় না!
হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। এবার বলে উঠলেন, -ডাক্তারবাবু ময়ূরগড় না কী কইলেন য্যান?
ডাঃ চক্রবর্তী বললেন, –হ্যাঁ। ময়ুরগড়। দুর্গাপুরের কাছে।
