এরপর যা ঘটেছিল তা একেবারে অভাবিত। সেই ঘটনা এবার সংক্ষেপে বলছি…
মিস্টার সিনহা ও.সি-র কাছে বিদায় নিয়ে লাঞ্চের পরই পায়ে হেঁটে চলে গিয়েছিলেন। তার এবং মিস্টার শর্মার ব্যাগ ও স্যুটকেসটা মিস্টার নায়েকের কথায় দুজন ফরেস্ট গার্ড তার সঙ্গে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
কর্নেল ও.সি. মিস্টার প্রসাদকে একান্তে ডেকে কী সব আলোচনা করছিলেন। আমি তা জানতে চাইনি। কারণ জানতে চাইলেও কর্নেল আমাকে বলবেন কি না সন্দেহ।
রাত আটটার পর কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠেছিল। এই সময় কর্নেল, মিস্টার নায়েক, মিস্টার প্রসাদ আর তাঁর পুলিশবাহিনী পায়ে হেঁটে রওনা হয়েছিল। ব্রিজ পেরিয়ে যাবার পর বুঝতে পেরেছিলাম আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমরা যাচ্ছি সেই হরপার্বতীর মন্দিরের টিলার দিকে। সবাই কর্নেলের নির্দেশে নিঃশব্দে গাছের ছায়ার আড়ালে সেঁটে গিয়ে টিলার নিচে বসেছিলাম। এরপর টিলার চারদিকে চারজন আমর্ড কনস্টেবল রাইফেল তাক করে গুঁড়ি মেরে বসেছিল। ইতিমধ্যে শিশির পড়ে চুড়ার ওঠার সেই পাথরের সিঁড়ি কিছুটা পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। আমরা গুঁড়ি মেরে সাবধানে টিলার বটগাছটার তলায় যখন পৌঁছুলাম তখন চারদিকে কুয়াশামাখা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে। প্রতিমুহূর্তে আমার ভয় হচ্ছে সেই আফগান হাউন্ডটা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে না তো?
বনে-বনে ঘুরে কুকুরটার তো বুনো হয়ে যাবার কথা। তার হিংসাও বেড়ে যাবার কথা।
মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নেবার পর সেই গুহার দিকে গুঁড়ি মেরে আমরা নেমে গেলাম। সেই সময়েই কানে এল চাপা গলায় সুর করে কেউ কিছু আবৃত্তি করছে। নিচের চাতালে কর্নেল এবং ও.সি. প্ৰসাদ এক হাতে টর্চ অন্য হাতে রিভলবার নিয়ে সশব্দে যেন ঝাঁপ দিলেন। পরপরই মিস্টার প্রসাদের গর্জন শোনা গেল, –যোগিন্দর! বন্দুকের দিকে হাত বাড়িও না। হাত গুড়ো হয়ে যাবে।
অন্য পুলিশ অফিসার, আমি এবং নায়েক পরক্ষণেই তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের হাতেও গুলি ভরা রিভলবার। দেখলাম, সেই ক্যাম্বিসের খাটে বসে একটা রুক্ষ এবং বলিষ্ঠ চেহারার লোক নিস্পলক চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপরেই কর্নেল টর্চের আলো তার খাটিয়ার নিচে ফেলে বললেন, –আরে নবচন্দর যে! ওখানে ঢুকে কী করছ? বেরিয়ে এসো।
পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর এবং ও.সি. এগিয়ে গিয়ে যোগিন্দরের জামার কলার ধরে টেনে তাকে নিচে নামালেন। তার বন্দুকটা খাটে পড়ে রইল। মিস্টার নায়েক নবচন্দ্রকে ঠেলে তুলে বললেন, -এই যে যোগিন্দরের চ্যালা! কতগুলো ভেড়া এ পর্যন্ত কুকুরটাকে খাইয়েছ?
পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের ব্যাগে হ্যান্ডকাফ ছিল। যোগিন্দরের দুটো হাত পিঠের দিকে নিয়ে। গিয়ে তিনি হাতকড়া পরিয়ে দিলেন। সেই সময়েই হঠাৎ ঘুরে কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, -সাবধান!
ক্ষীণ জ্যোৎস্নায় দেখলাম কখন চুপি-চুপি একটা কালো রঙের জন্তু চাতালে ওঠার চেষ্টা করছিল। কর্নেল পরপর দুটো গুলি করলেন। ও.সি. মিস্টার প্রসাদও তাকে লক্ষ করে তিনবার গুলি ছুঁড়লেন। অবশ্য তার আগেই হিংস্র আফগান হাউন্ডটা কর্নেলের পায়ের কাছে নেতিয়ে পড়েছে। টর্চের আলোয় দেখলাম তার মুখটা একপাশে কাত হয়ে আছে। কালো রঙের ওপর রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তার ধারাল দাঁত এবং লকলকে জিভ নিস্পন্দ।
ডাকু যোগিন্দর এবং নবকে নিয়ে গুহার উপরে উঠে মিস্টার প্রসাদ চিৎকার করে ডাকলেন, –পান্ডেজি, বোঘুয়া, হাসিন, তোমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে এসো।
চারজন আমর্ড কনস্টেবলের পৌঁছতে প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল। ওদের দোষ নেই, তিনশ ফুট ওঠা সামান্য ব্যাপার নয়। তাছাড়া সিঁড়িগুলো শিশিরে পিছল হয়ে আছে।
কর্নেল তার পিঠে আঁটা কিটব্যাগ থেকে নাইলনের একটা শক্ত দড়ি বের করলেন। তার কিটব্যাগে দরকারি সবরকমের জিনিসই থাকে। তিনি নেমে গিয়ে মৃত কুকুরটার গলায় ফাঁস বেঁধে একা টানতে-টানতে চূড়ায় উঠছিলেন। মিস্টার প্রসাদের হুকুমে একজন কনস্টেবল কর্নেলকে এই শ্রমসাধ্য কাজ থেকে অব্যাহতি দিল। সে তাগড়াই চেহারার লোক। ডাকু যোগিন্দরের প্রিয় আফগান হাউন্ডটিকে সে অক্লেশে টানতে-টানতে চূড়ায় ওঠাল। এবার আমাদের বাংলোয় ফেরার পালা।
কিন্তু তখনও জানতাম না, আরও একটা বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
কর্নেল নবচন্দ্রকে বললেন, তোমার ঘরে আর কতগুলো ভেড়া আছে, গুনে দেখতে চাই।
মিস্টার প্রসাদ হো-হো করে হেসে উঠলেন।
কর্নেলের চাপে পড়ে নবকে তার ঘরের তালা খুলতে হল। তারপর কর্নেল ঘরের ভেতর টর্চের আলো ফেলে বললেন, -মিস্টার প্রসাদ! ওই দেখুন খাটিয়ার তলায় অনেকগুলো প্যাকেট রাখা হয়েছে। ওগুলোই সম্ভবত নিষিদ্ধ মাদক।
মিস্টার প্রসাদ একটা প্যাকেট টেনে বের করে খুললেন। ভেতরের পলিথিনের আবরণ ছিঁড়ে তিনি বললে উঠলেন, -মাই গড! এ তো হেরোইন!
মিস্টার নায়েক থাপ্পড় তুলে গর্জন করলেন, -শয়তান! তুমি মালিগিরির চাকরি নিয়ে ওই ডাকুর সঙ্গে এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছ?
পিছন থেকে রামভগতের বউ বলে উঠল, হুজুর, এই সব জিনিসের মালিক বড়ো সাহেব আর ছোটো সাহেব।
কর্নেল বললেন, তুমি কি মিস্টার সিনহা আর শর্মার কথা বলছো?
-হা হুজুর।
কর্নেল বললেন, আমার সন্দেহ, রাকেশ শর্মা কোনও কারণে তার পার্টনার মিস্টার সিনহার উপর চটে গিয়েছিলেন। টাকাকড়ি নিয়ে বিবাদও এর কারণ হতে পারে। তাই মিস্টার সিনহার হুকুমে ডাকু যোগিন্দর তার আফগান হাউন্ডকে রাকেশ শর্মার দিকে লেলিয়ে দিয়েছিল।
