একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মিস্টার সিনহা সিগারেট টানছেন। তার দুটো চোখই লাল। কর্নেল সোজা তার কাছে গিয়ে বললেন, -জন্তুটাকে কি আপনি দেখতে পেয়েছিলেন?
কর্নেলের কথার ভঙ্গিতে আমার অবাক লাগল। এ কিরকম প্রশ্ন করছেন উনি?
মিস্টার সিনহা ধমকের সুরে বললেন, –দেখতে পাব না মানে? আমি তো রাকেশের কাছ থেকে প্রায় হাত তিরিশের দূরে ছিপ ফেলেছিলাম। কালো প্রকাণ্ড জন্তুটা পা টিপেটিপে পেছন থেকে এসে রাকেশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাকেশের আর্তনাদ শুনেই আমি চোখ ফিরিয়ে ছিলাম। ওই অবস্থাতেই হতবুদ্ধি হয়ে আমি ছিপের গোড়ায় হুইল বাঁধা অংশটা দিয়ে জন্তুটার মাথায় আঘাত করতে গেলাম। ছিপটা ভেঙে গেল। জন্তুটা গ্রাহ্যও করল না। বড়ো আশ্চর্য ব্যাপার। রাকেশকে সে গলায় কামড়ে ধরে এক লাফে ঘাসের জমি পেরিয়ে জঙ্গলে উধাও হয়ে গেল। ততক্ষণে আমার মনে পড়ে গেছে আমার কাছে রিভলবার আছে। পরপর দু-রাউন্ড গুলি ছুঁড়লাম।
ওদিকে ফরেস্ট গার্ড এবং কনস্টেবলরা মিস্টার শর্মার মৃতদেহটা খাদ থেকে তুলে ত্রিপলে মুড়ছিল। একজন ফরেস্ট গার্ড উঁচু গাছ থেকে ঝুলন্ত লতা টেনে নামিয়ে বলল, -দড়ি আনা উচিত ছিল। কী করা যাবে, এ লতাগুলো খুব শক্ত। এই দিয়ে বাঁশের সঙ্গে তেরপলে জড়ানো যেতে পারে।
একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর বললেন, -বডিটা বাংলোয় নিয়ে যেতে হবে। এতক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছনোর কথা।
তিনি কয়েকজন কনস্টেবল এবং ফরেস্ট গার্ডদের নির্দেশ দিলেন। তারা তেরপলে ঢাকা লাশটা বাঁশের দুই প্রান্ত কাঁধ লাগিয়ে বাংলোয় দিকে চলে গেল।
হরিহর প্রসাদ মিস্টার সিনহার সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি লক্ষ রেখেছিলাম কর্নেলের দিকে। দেখি তিনি সেই গাছের ধারে হাঁটু মুড়ে বসে কিছু দেখছিলেন। দেখার পর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, –জন্তুটা কুকুরজাতীয় প্রাণী। তবে নেকড়ে নয়। মিস্টার প্রসাদ এই এলাকায় কি আদিবাসীর শিকার করার জন্য আফগান হাউন্ড পোষে?
মিস্টার প্রসাদ উত্তেজিতভাবে বললেন, -আফগান হাউন্ড? হ্যাঁ। আমার এক কলিগ পুলিশের ডগ স্কোয়াডে ছিল। তার মুখে আফগান হাউন্ডদের ইতিহাস শুনেছি। ধরমপুর এলাকায় আদিবাসীরা কেন, অন্যেরাও এই জাতীয় কুকুর পোষেন বলে শুনেছি। তারা অবশ্য বাড়ি পাহারা দেবার জন্যই এই প্রজাতির কুকুর পোষেন।
কর্নেল বললেন, আপনি কখনও আফগান হাউন্ড দেখেছেন?
-না। শুনেছি মাত্র।
মিস্টার সিনহা বললেন, আমার নিজেরই একটা আফগান হাউন্ড ছিল। সেটা রোগে ভুগে মারা যায়।
কর্নেল বললেন, তাহলে তো আফগান হাউন্ড আপনি দেখেছেন। যে জন্তুটা মিস্টার শর্মাকে আক্রমণ করেছিল, সেটা দেখে কি আপনার মনে হয়নি যে ওটা আফগান হাউন্ড?
–না। ওটা নিছক কুকুর নয়। সম্ভবত কালো নেকড়ে।
ও.সি. মিস্টার প্রসাদ একটু হেসে বললেন, -নেকড়ে কি কালো হয়?
-হতেই পারে। কালো চিতার কথা শুনেছি। কোনও দেশে নাকি কালো বাঘ আছে। কাজেই কালো নেকড়ে থাকতেই পারে।
কর্নেল হঠাৎ বলে উঠলেন, -মিস্টার সিনহা, কুখ্যাত যোগিন্দারের সঙ্গে আপনার কখনও আলাপ হয়েছে?
মুহূর্তে লাক্ষা ব্যবসায়ীর মুখের চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। কর্কশ কণ্ঠে বললেন, -দেখুন, আপনি একজন রিটায়ার্ড কর্নেল। মিস্টার প্রসাদ এখানে উপস্থিত না থাকলে আপনার এই ধৃষ্টতার ঠিক জবাব দিতাম।
মিস্টার প্রসাদ তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, -প্লিজ, শান্ত হোন মিস্টার সিনহা। উনি আপনাকে নিছক একটা প্রশ্ন করেছেন। স্রেফ কৌতূহল। কারণ যোগিন্দরের নামে এ অঞ্চলে অনেক গল্প চালু আছে। সব ব্যবসায়ীই নাকি তাকে ভেট দিতে বাধ্য হয়। যাই হোক, এখানে আর আমাদের কিছু করার নেই। বাংলোয় ফেরা যাক।
এরপর আমরা বাংলোয় ফিরে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে রাকেশ শর্মার মৃতদেহ স্ট্রেচারে চাপিয়ে নিয়ে গেল। অ্যাম্বুলেন্স অনুসরণ করে পুলিশ ভ্যানে দুজন অফিসার এবং আর্মড কনস্টেবলও চলে গেল।
রামভগত আমাদের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা করছিল। দেখলাম তাকে রান্নায় সাহায্য করছে তার বউ আর অচেনা একটা লোক। রেঞ্জার এবং নায়েক খোঁজ নিয়ে এসে বললেন, -নবচন্দ্রের পাত্তা নেই।
মিস্টার সিনহা তার ঘর খুলে ভেতরে ঢুকেছিলেন। আমরা আমাদের ঘরে বসেছিলাম। বারান্দায় একজন পুলিশ অফিসার আর চারজন আর্মড কনস্টেবল দাঁড়িয়েছিল। আমাদের ঘরে ঢুকে ও.সি. প্রসাদ বললেন, –সিনহা সাহেব তার পার্টনারের ডেডবডির সঙ্গে গেলেন না দেখছি।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -উনি ধরমপুরে ওঁর রেস্টহাউস থেকে পায়ে হেঁটেই বাংলোয় যাতায়াত করেন শুনেছি। হয়তো পায়ে হেঁটেই যাবেন।
মিস্টার নায়েক বললেন, উনি আমার সঙ্গে গেলে আমি ওঁকে পৌঁছে দিতে পারি।
কর্নেল বললেন, -তাহলে আমাদের রামপুর পৌঁছে দিতে আপনাকে আবার জিপ পাঠাতে হবে।
-পাঠাব। কিন্তু মনে হচ্ছে আপনি আফগান হাউন্ডটাকে কোতল না করে এখান থেকে যাবেন না।
মিস্টার প্রসাদ বললেন, আমার মাথায় একটা সন্দেহ জাগছে। এখানে ধরমপুর থানায় বদলি হয়ে এসেই শুনেছিলাম ডাকু যোগিন্দরের নাকি একটা শিকারি কুকুর ছিল। কর্নেল যাকে বলছেন আফগান হাউন্ড। যোগিন্দর নিপাত্তা। সে কি কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল।
কর্নেল আস্তে বললেন, আপনি আজ রাত্তিরটা আপনার ফোর্স নিয়ে এখানে থেকে যান। আমার আশা, আমি ডাকু যোগিন্দরকে ধরিয়ে দিতে পারব। কিন্তু না–এখন আর প্রশ্ন করবেন না।
