মিস্টার নায়েক বললেন, কিন্তু আলমারিটা কে রেখেছিল এখানে?
-এবার খুলেই বলি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্তুটা একটা আফগান হাউন্ড। তার মালিক কোনও উদ্দেশ্যে তাকে দিয়ে মানুষ হত্যা করায়। গতরাত্রে আফগান হাউন্ডটা ক্ষুধার্ত ছিল। অর্থাৎ তাকে ক্ষুধার্ত রাখা হয়েছিল।
মিস্টার প্রসাদ বললেন, –অদ্ভুত ব্যাপার!
-হ্যাঁ আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত। কিন্তু আপনি আমার থিয়োরির কাঠামোটা শক্ত করে দিয়েছেন।
–কীভাবে?
কর্নেল তার কথার জবাব না দিয়ে খাটের তলায় এবং মেঝের সবখানে ভাঙা আসবাবপত্রের ভেতর আলো ফেলে দেখছিলেন। দেখা শেষ হলে তিনি বললেন, হ্যাঁ, আফগান হাউন্ডটাকে এ ঘরে ঢুকিয়ে ভৌতিক উপদ্রব করানোর জন্য আরও কয়েকটা নির্বোধ ভেড়াকে এ ঘরে রাখা হয়েছিল।
এতক্ষণে রামভগত চাপাস্বরে বলে উঠল, -বুঝেছি, বুঝেছি। দেখি সেই চাবিচোর এখন কোথায় আছে। তাকে ধরে নিয়ে আসি।
বলেই সে দৌড়ে চলে গেল।
.
০৪.
রেঞ্জার মিস্টার নায়েক অবাক হয়ে বললেন, -ভেড়ার কথা শুনে রামভগতের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -মাথা খারাপ হওয়ারই কথা। আপনাদের মালি নবচন্দ্রের যে ভেড়া পোর শখ ছিল তার কারণ জেনে এবার রামভগত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।
-নব ভেড়া পুষত? আপনি কী করে জানলেন?
দরকার হলে পুষত। অর্থাৎ যে রাতে ভৌতিক উৎপাত ঘটবে সেদিনই সে একটা কচি ভেড়া নিয়ে আসত। কাল দুপুরে জঙ্গল থেকে ফেরার সময় বাইনোকুলারে দেখছিলাম, নব একটা কচি ভেড়াকে কোয়ার্টারের পেছনে বেঁধে রেখেছে। এদিকে এই ঘরের ভেতর প্রচুর ভেড়ার লোম এবং হাড় দেখলাম। দুটো মিলিয়ে আমার এই সিদ্ধান্ত।
ও. সি. মিস্টার প্রসাদ সায় দিয়ে বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। যাই হোক, এবার জলপ্রপাতের নিচে যেখানে মিস্টার সিনহারা মাছ ধরছিলেন সেখানে যাওয়া যাক। কর্নেল সাহেব কি যাবেন আমার সঙ্গে?
কর্নেল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এমন ঈময় একজন ফরেস্ট গার্ডকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। সে লনে পৌঁছে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল, শর্মা সাহেবের বডি পাওয়া গেছে স্যার। কিন্তু সে জন্তুটাকে দেখতে পাইনি। বডি ক্ষতবিক্ষত। হয়ত তার খাওয়ার সময় আমরা গিয়ে পড়ায় জন্তুটা গা ঢাকা দিয়েছে।
কর্নেল বললেন, –গত রাতে জন্তুটা একটা আস্ত ভেড়া খেয়েছে, তাই মিস্টার শর্মার ডেডবডি বেশি খেতে পারেনি। পরে খাবে বলে চলে গেছে।
কর্নেলের রসিকতায় মিস্টার প্রসাদ হেসে উঠলেন। মিস্টার নায়েক ফরেস্ট গার্ডকে বললেন, –ডেডবডি কি ওঁরা এখানে নিয়ে আসবেন?
ফরেস্ট গার্ড বলল, -বডি নিয়ে আসার জন্যে পুলিশ অফিসাররা আমাকে বললেন বাংলো থেকে একটা বাঁশ আর তেরপল নিয়ে আসতে।
নায়েক ডাকলেন, -রামভগত, রামভগত, শিগগির এখানে এসো।
রামভগত এসে রুষ্টমুখে বলল, –ওই নব আমার ঘর থেকে তালা চুরি করেছে স্যার। আমার বউ একদিন বলছিল, আমি যখন ধরমপুর বাজারে গেছি, তখন নব চুপি-চুপি এই ঘরটা খুলেছিল।
নায়েক বললেন, -নবর কথা পরে। একটুকরো শক্ত বাঁশ আর তেরপল চাই। আছে তো?
-তা আছে স্যার। তেরপলটা একটু ছেঁড়া হবে।
–তা হোক। শিগগিরই নিয়ে এসো।
রামভগত একটা শুকনো লম্বা বাঁশ আর ভাঁজ করা তেরপল নিয়ে এল। ফরেস্ট গার্ড সেদুটো কাঁধে নিয়ে পা বাড়াল।
এবার কর্নেল বললেন, চলো, আমরাও যাব।
প্রসাদ, নায়েক, কর্নেল এবং আমি ফরেস্ট গার্ডকে অনুসরণ করলাম। কর্নেল বললেন, –জয়ন্ত, তুমি আমার কিটব্যাগ, ক্যামেরা আর বাইনোকুলারটা এনে দাও। ঘরে তালা দিতে ভুলে না।
তার নির্দেশ পালন করে আমিও দলটার সঙ্গ ধরলাম।
ফরেস্ট গার্ড পিচরাস্তা ধরে পূর্বে অর্থাৎ ব্রিজের দিকে হাঁটছিল। এই সময় কর্নেলকে বলতে শুনলাম, -আচ্ছা মিস্টার প্রসাদ, এই এলাকায় আপনি যোগিন্দর নামে কোনও লোককে চেনেন?
মিস্টার প্রসাদ দাঁড়িয়ে গেলেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, -যোগিন্দর সাউ?
-হ্যাঁ, লোকটার একটা বন্দুক আছে। রোদে পোড়া, কিন্তু স্বাস্থ্যবান চেহারা। মাথা একটু ছিট আছে বলে মনে হল।
-হ্যাঁ, আপনি তাহলে ঠিকই দেখেছেন। যোগিন্দরকে কোথায় দেখলেন?
–ব্রিজের ওপারে কিছুটা এগিয়ে হরপার্বতী মন্দিরের দিক থেকে তাকে আসতে দেখেছিলাম। তখন ভোর ছটা। আমি মর্নিংওয়াকে বেরিয়েছিলাম।
নায়েক এবার বলে উঠলেন, -সর্বনাশ! আপনি খুব বেঁচে গেছেন কর্নেল সাহেব। লোকটা সাংঘাতিক ডাকাত! শুনেছি, তার সামনে অচেনা লোক পড়লে সে তাকে গুলি করে মারে।
মিস্টার প্রসাদ বললেন, -হা ডাকু যোগিন্দার। একসময় সে অনেক খুন-খারাপি এবং ডাকাতি করেছে। তার দলের সবাইকে আমরা ধরতে পেরেছিলাম। তারা এখন জেলে। কিন্তু যোগিন্দরকে ধরতে পারিনি।
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, -ব্যবসায়ী মিস্টার সিনহা এবং মিস্টার শর্মার সঙ্গে কি কোনওসময় যোগিন্দরের যোগাযোগ ছিল?
হরিহর প্রসাদের অভ্যাস কথা বললেই দাঁড়িয়ে পড়া। তিনি বললেন, –ওই দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা একটি সূত্রে জেনেছিলাম। ওরা লাক্ষা ব্যবসায়ী। কিন্তু লাক্ষার প্যাকেটের তলায় নাকি যোগিন্দরের চোরাই মাল ওঁরা পাচার করেন। কিন্তু বারদুয়েক হানা দিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলাম। মিস্টার সিনহা তাই আমার ওপর কিছুদিন ক্ষুব্ধ ছিলেন।
কথা বলতে-বলতে ফরেস্ট গার্ডকে অনুসরণ করে আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম। প্রায় কুড়ি মিনিট হেঁটে যাওয়ার পর জলপ্রপাতের গর্জন কানে এল। ফরেস্ট গার্ড এবার বাঁদিকের ঢালু একটা জঙ্গলে ঢুকল। তারপরই চোখে পড়ল প্রকাণ্ড কয়েকটা পাথরের উপর কনস্টেবলরা রাইফেল হাতে বসে আছে। এখানটা একটা খাদের মতো জায়গা। এখনওঁ জল জমে আছে। সেই জলের মধ্যে পড়ে আছে ক্ষতবিক্ষত একটা মৃতদেহ।
