আমি বলে উঠলাম, আর ওই গরর-গরর গর্জনের কথা বলুন।
মিস্টার নায়েক যেন চমকে উঠলেন, -কোনও জন্তুর গর্জন?
-হ্যাঁ। হিংস্র জন্তুর গর্জন বলেই মনে হল।
কর্নেল বললেন, আমি কিন্তু গর্জন শুনিনি।
বললাম, -শুনবেন কী করে? আপনি তো নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। আমি জাগিয়ে দিতে বললেন, ও কিছু নয়। তারপর আবার আপনার নাক ডাকা শুরু হল।
মিস্টার নায়েক হঠাৎ চাপাস্বরে জিগ্যেস করলেন, -কর্নেল সাহেবের আজ সকালে চলে যাওয়ার কথা ছিল। গতরাতের ওই ভূতুড়ে উৎপাতের রহস্য সমাধান করবার জন্যই কি আপনি থেকে গেলেন?
কর্নেল তেমনি চাপাস্বরে উত্তর দিলেন, মিস্টার নায়েক, রামপুর থানার অফিসার ইন-চার্জকে কি আমাদের কথা বলেছেন?
-হ্যাঁ, বলেছি।
–আপাতত পুলিশের কী প্ল্যান?
-ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে নিয়ে রাকেশ শর্মার মৃতদেহ উদ্ধার। অবশ্য আমি ওঁদের বলেছি পুরো লাশ খুঁজে পাবেন না। হাড়গোড় আর রক্ত খুঁজে পাবেন।
এই সময়েই আমাদের ঘরের দরজার সামনে একজন পুলিশ অফিসার এসে বললেন, –আসতে পারি?
মিস্টার নায়েক বললেন, –আসুন মিস্টার প্রসাদ। কর্নেল সাহেবের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
আলাপ-পরিচয় জানা গেল তিনিই অফিসার ইনচার্জ মিস্টার হরিহর প্রসাদ।
উনি বললেন, পুলিশ ফোর্স ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে এখনই বেরিয়ে গেল। আমাদের দুজন অফিসারও তাদের দলে আছেন।
মিস্টার সিনহা ওঁদের সঙ্গে যাননি?
-হ্যাঁ। উনিও গেছেন। জলপ্রপাতের নিচে যেখানে ওঁরা মাছ ধরছিলেন, সেখান থেকেই খোঁজা শুরু হবে। আমি আপনার সব পরিচয়ই আমাকে মিস্টার নায়েক দিয়েছেন, তাছাড়া আসতে-আসতে হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল হাথিয়াগড়ে আমার এক কলিগ সম্প্রতি ও.সি. হয়ে গেছেন। তার কাছে আপনার নাম শুনেছিলাম।
কর্নেল বললেন, -বলুন আমি কী করতে পারি?
বিশ্বস্তসূত্রে আমাদের কাছে খবর আছে, ধরমপুর ফরেস্ট এলাকায় নিষিদ্ধ মাদকের একটা চোরা ঘাঁটি আছে। কিন্তু সেটা কোথায় তা আমাদের সূত্রও জানে না। সে শুধু কোনও-কোনও রাত্রে। এই জঙ্গলের ভেতর মোটরগাড়ির আলো দেখতে পেয়েছে। যাই হোক, এর সত্যিমিথ্যে যে যাচাই করব, তার সুযোগ পাইনি। প্রথমত কিছুকাল যাবৎ এই জঙ্গলে একটা অজানা হিংস্র জানোয়ারের উৎপাত, দ্বিতীয়ত আমাদের হাতে তত বেশি ফোর্সও নেই যে জঙ্গলটাকে ঘিরে রাখব।
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, মিস্টার সিনহার কাছে তো বটেই, মিস্টার শর্মার কাছেও রিভলবার ছিল। মিস্টার সিনহা শুনলাম দু-রাউন্ড গুলিও ছুঁড়েছেন।
প্রসাদ বললেন, -পিছন থেকে জানোয়ারটা নাকি নিঃশব্দে মিস্টার শর্মার ওপর ঝাঁপ দিয়েছিল। তারপর
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, –জানোয়ারটার চেহারা কেমন তা কি মিস্টার সিনহা আপনাকে জানিয়েছেন?
-হ্যাঁ। কালো রঙের একটা প্ৰকাণ্ড কুকুরের মতো জন্তু। তিনি নাকি এত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন যে সময়মতো গুলি ছোঁড়ার বদলে ছিপের গোড়ার দিকটা দিয়ে জন্তুটাকে আঘাত করেন।
কর্নেল রেঞ্জার নায়েককে বললেন, আপনার সঙ্গে কি মাঝখানের ওই ঘরের তালার চাবি আছে?
নায়েক বললেন, –আছে।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, -মিস্টার প্রসাদ, মাঝখানের ঘরটাতে রাত্রে মাঝে-মাঝে ভূতের উপদ্রব হয়।
প্রসাদ একটু থেমে বললেন, -হ্যাঁ, মিস্টার নায়েকের কাছে শুনেছি।
কর্নেল বললেন, -চলুন, ওই ঘরটার তালা খুলে ভিতরে একটু খোঁজখবর নেওয়া যাক। ভূত কোন পথে আসে এবং পালায় তা জানা দরকার।
নায়েক আগে বেরিয়ে গিয়ে তালা খুলে কপাটে চাপ দিলেন। কিন্তু কপাট খুলল না। তিনি এবার সজোরে ধাক্কা দিলেন। দরজা একটু ফাঁক হল। তারপর দেখা গেল একটা ভাঙাচোরা কাঠের আলমারি দরজার সামনে দাঁড় করানো আছে। সুরজিৎ নায়েক খুব অবাক হয়ে বললেন, —আলমারিটা এখানে কে এনে রাখল? রামভগত! রামভগত!
রামভগত দৌড়ে এসে বলল, কী হয়েছে স্যার?
–এই আলমারিটা এখানে কেন?
রামভগত আমতা-আমতা করে বলল, আমার চাবি তো হারিয়ে গেছে। আপনি নতুন তালাচাবি দেবেন বলেছিলেন, এখনও দেননি।
কর্নেল এগিয়ে গিয়ে আলমারিটাকে টেনে সরিয়ে দিলেন। তারপরই দেখতে পেলাম ঘরের ভেতর ভাঙাচোরা একটা খাটে অনেকগুলো হাড়গোড় আর চাপচাপ রক্ত।
কর্নেল পকেট থেকে তার ছোটো টর্চটা বের করে ভিতরে ঢুকে খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, –হাড়গুলো দেখে বোঝাই যাচ্ছে, একটা কোনও ছোটো প্রাণীর হাড়। …হ্যাঁ, ওই দেখুন মিস্টার প্রসাদ, এগুলো ভেড়ার নোম বলে মনে হয় না আপনার?
ও.সি. মিস্টার প্রসাদ পরীক্ষা করে দেখে বললেন, –ওই মাই গড! ঘরে কেউ কি ভেড়া পুষে রেখেছিল?
মিস্টার নায়েক হতবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গম্ভীর মুখে রামভগতকে বললেন, -তোমার চাবি হারিয়ে গেছে। তাহলে এখানে একটা ভেড়া ঘুমোচ্ছিল কী করে?
রামভগত কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, -আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না স্যার।
ভিতর থেকে কর্নেল বললেন, -রামভগতের চাবিটা যে চুরি করেছে, সে কাল রাতে চুপি-চুপি এখানে একটা ভেড়া এনে এই খাটে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। ভেড়া কি সাধে বলে! ভেড়া মানেই নির্বোধ। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওদিকে চাবিচোর দরজা খুলে রেখেছিল।
মিস্টার প্রসাদ বললেন, -কেন?
–আমার অনুমান। কিন্তু যুক্তিপূর্ণ অনুমান। হিংস্র জানোয়ারটা কাছাকাছি কোথাও তার মালিকের সঙ্গে এসে অপেক্ষা করছিল। চাবিচোর সম্ভবত কোনও সঙ্কেত দিয়েই সরে পড়ে, আর মালিক তার পোয্য জানোয়ারটাকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়।
