একটু পরে রামভগত কফি নিয়ে এল। তাকে বললাম, -সিনহা সাহেব বলছিলেন, অস্ত্র ছাড়া জঙ্গলে কোথাও যাওয়া নিরাপদ নয়। তাহলে সেই জন্তুটা কী করে তোমাদের ছোটসাবকে তুলে নিয়ে গেল?
রামভগত করুণ মুখে বলল, –সিনহা সাব আর শর্মা সাবের কাছে রিভলবার আছে।
-তুমি কি কখনও দেখেছ?
-হ্যাঁ স্যার, কতবার দেখেছি। সিনহা সাব বলে গেলেন, আচমকা জানোয়ারটা ঝাঁপ দিয়েছিল। সিনহা সাব মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। ছিপ দিয়ে নাকি জানোয়ারটাকে মেরেছিলেন। তারপর খেয়াল হতেই রিভলবার থেকে পরপর দুটো গুলি ছুঁড়েছিলেন। কিন্তু জানোয়ারটা তখনই একলাফে নাকি উপরের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। স্যার, ওই জানোয়ার কোনও খারাপ আত্মা। এই মুলুকের লোকে বিশ্বাস করে, ওটা ভূত-প্রেত ছাড়া কিছু নয়।
ততক্ষণে কর্নেল সোজা হয়ে বসে কফিতে মন দিয়েছেন। গম্ভীর মুখে বললেন, -বুঝলে রামভগত, এবার বোঝা যাচ্ছে ওই হিংস্র ভূতটাই গত রাতে পাশের ঘরে অদ্ভুত সব শব্দ করছিল। শব্দ শুনে কেউ বেরুলেই সে নির্ঘাৎ তার গলা কামড়ে ধরে জঙ্গলে উধাও হয়ে যেত।
রামভগত ভয়ার্তমুখে চাপা স্বরে বলল, -সেইজন্যই তো আমরা ওই ঘর থেকে শব্দ শুনেও রাতে বেরোই না।
-ও ঘরের তালার চাবি কার কাছে থাকে?
–চাবি একটা আমার কাছে ছিল। আর একটা রেঞ্জারসাবের কাছে।
–তোমার কাছে ছিল মানে! এখন নেই?
-না স্যার, চাবিটা হারিয়ে গেছে। কী করে যে হারিয়ে গেল কে জানে! রেঞ্জার সাহেব ওই চাবিটা আমাকে আলাদা করে রাখতে বলেছিলেন। তাই আমি ওটা আমার ঘরের কুলুঙ্গিতে রুদ্রদেবের তলায় রেখেছিলাম। আমার বউকে পর্যন্ত একথা জানাইনি। কিছুদিন আগে রেঞ্জার সাহেব এসে ওই ঘরটা খুলতে বলেছিলেন। তিনি চাবিটা আনতে ভুলে গিয়েছিলেন। আমি রুদ্রদেবের মূর্তির তলায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও চাবিটা পাইনি। রেঞ্জার সাহেব আমাকে খুব বকাবকি করে বলেছিলেন, একটা নতুন তালার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত করেননি।
বাইরে কেউ ডাকছিল, রামভগত! রামভগত!
রামভগত তখনি বেরিয়ে গেল। দরজার পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, দুজন মেটে রঙের উর্দি পরা লোক। তাদের কাঁধে বন্দুক। বললাম, -কর্নেল, আপনি বলছিলেন এই রিজার্ভ ফরেস্টের গার্ডরা নিজের-নিজের বাড়িতে বসে ডিউটি করে। এখন দেখছি তাদের টনক নড়েছে।
কর্নেল বললেন, –ওদের দোষ নেই। রেঞ্জার সাহেবকে তো বলতে শুনেছ এই জঙ্গলটা সবে মাসচারেক আগে সরকার রিজার্ভ ঘোষণা করেছে। এই বাংলোটা ছিল ইংরেজ আমলের কোনও প্রকৃতিপ্রেমিক ইংরেজের বাংলো বাড়ি। দেওয়ালের অবস্থা দেখে তা বুঝতে পারছ না? এখানে শিগগিরই নাকি বিদ্যুতের লাইন এসে যাবে। তারপর বাংলোটা মেরামত করা হবে।
কফি শেষ করে বললাম, -বাংলোতে তিনটে মোটে ঘর। মধ্যের ঘরটা পুরনো আসবাবপত্র নাকি ভর্তি। আর ওই ঘরেই মাঝে-মাঝে কোনও প্রেতাত্মা হিংস্র আফগান হাউন্ডের বেশে দখল। করে নেয়। গতরাতে সে এসেছিল। ঘরটা খুলে দেখতে পেলে ব্যাপারটা বোঝা যেত।
কর্নেল অ্যাসট্রেতে রাখা চুরুটটা টেনে নিজেকে চাঙ্গা করলেন। তারপর বললেন, –জয়ন্ত, ওই ঘরে গত রাতে সত্যিই যে একটা আফগান হাউন্ড ঢুকেছিল এবং তার মালিকও সঙ্গে ছিল, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
অবাক হয়ে বললাম, -মালিক! মানে আফগান হাউন্ডটার কোনও মালিক আছে? তা যদি থাকে, তাহলে সে তার পোষা জন্তুটাকে ওভাবে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় কেন? সে নিশ্চয়ই জানে এই কুকুরটা বাঘের চেয়েও হিংস্র। বিশেষ করে বনে-জঙ্গলে ছেড়ে দিলে কুকুরটা তো ক্রমশ বন্য হয়ে উঠবে। তখন কারও বশ মানবে না।
কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় বাংলোর নিচের রাস্তায় গাড়ির শব্দ শোনা গেল। জানলার পর্দা তুলে দেখলাম, একটা পুলিশ জিপ, একটা পুলিশ ভ্যান এবং তার পেছনে রেঞ্জার সাহেবের সেই জিপটা এসে থামল। গাড়ি তিনটে থেকে দুজন পুলিশ অফিসার এবং কয়েকজন সশস্ত্র কনস্টেবল বেরিয়ে এল। পেছনের জিপ থেকে রেঞ্জার সুরজিৎ নায়েক এবং লাক্ষা ব্যবসায়ী সেই সিনহা সাহেব বেরিয়ে এলেন। সবাই এসে বাংলোর বারান্দায় ভিড় করলেন। এবার দরজার পর্দার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখলাম, বারান্দার চেয়ারগুলো দখল করে পুলিশ অফিসার আর মিস্টার সিনহা এবং আরও দুজন পুলিশ অফিসার বসে পড়লেন। শুধু রেঞ্জার সাহেব আমাদের ঘরের সামনে এসে আমায় দেখে নমস্কার করে বললেন, -মিস্টার চৌধুরি, কর্নেল সাহেব কি আবার অর্কিডের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন?
ভিতর থেকে কর্নেল সাড়া দিলেন, -না মিস্টার নায়েক, ঘরে বসে ঈশ্বরের নাম জপ করছি। আপনি আসুন, ভেতরে আসুন।
মিস্টার নায়েক ভেতরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর বললেন, -মিস্টার সিনহাকে আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম। ওভাবে যখন তখন-জঙ্গল এলাকায় যাবেন না। জানোয়ারটাকে এলাকার আদিবাসীও দেখেছে। তারা ভয়ে আর কাঠ সংগ্রহের জন্য জঙ্গলের বেশি ভেতরে ঢোকে না। এর আগেও কয়েকটা প্রাণ গেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, খোঁজাখুঁজি করে শুধু রক্ত আর হাড় ছাড়া ডেড বডির এতটুকু মাংসও দেখতে পাওয়া যায়নি! এমনকী মাথাটাও কে যেন ধারাল দাঁতে কড়মড় করে চিবিয়ে খেয়েছে!
কর্নেল বললেন, আপনি এই বাংলোর ভূতের কথা বলেছিলেন। গত রাতে সে তালাবন্ধ ঘরের ভেতর খুব লম্ফঝম্ফ করে গেছে।
