কর্নেল জলাশয়ের অন্য পাড়ে বাইনোকুলারে কিছু দেখছিলেন। জিগ্যেস করলাম, -অর্কিড দেখতে পাচ্ছেন নাকি?
–এসব জায়গায় অর্কিড জন্মায় না।
–তাহলে কী দেখছিলেন?
কর্নেল উত্তর না দিয়ে, উত্তর নদীর ওপর সেই ব্রিজের দিকে, অর্থাৎ উজানের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। মনে হল উত্তেজিত হওয়ার মতো কিছু দেখেছেন। তাকে চুপচাপ অনুসরণ করলাম।
ব্রিজ পেরিয়ে নদীর পশ্চিম পাড়ে অসমতল মাটিতে পাথর আর উঁচু-নিচু গাছপালার ভেতর দিয়ে কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছিলেন। আমি হতবাক হয়ে তাকে অনুসরণ করছিলাম।
জলপ্রপাতের ডান দিকে নদীর পাড় খানিকটা ঢালু। আর ওই ঢালু মাটি পুরোটাই ঘাসে ঢাকা। জলাশয়ের কিনারায় বড়-বড় পাথরের টুকরো পড়ে আছে। সেখানে নেমে গিয়ে কর্নেল একটা মাছধরা ছিপের গোড়ার দিকটা পাথরের ফঁক থেকে তুলে নিলেন। দেখলাম ছিপটার গোড়ায় পেতলের হুইল বাঁধা আছে। কিন্তু সুতো ছিঁড়ে গেছে। কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, -এই হুইলটা রোদে চকচক করছিল। কিন্তু ভেবে পাচ্ছি না, ছিপের গোড়ার দিক ভেঙে ফেলে রেখে লাক্ষা ব্যবসায়ীরা উধাও হলেন কেন? চলো, বাংলোয় ফিরে গিয়ে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।
বাংলোয় ফিরে গিয়ে রামভগতের মুখে যা শুনলাম, তা সাংঘাতিক ঘটনা। সেই হিংস্র জন্তুটা নাকি ছোটো সাহেব, অর্থাৎ রাকেশ শর্মার গলা কামড়ে ধরে জঙ্গলে উধাও হয়েছে। বড় সাহেব তাই ধরমপুরে চলে গেছেন। রামপুর টাউন থেকে পুলিশ নিয়ে আসবেন।
.
০৩.
ঘটনাটা শোনার পর কর্নেল গম্ভীর মুখে আমাদের ঘরের তালা খুলে ভিতরে ঢুকলেন। তারপর পিঠ থেকে কিটব্যাগ বাইনোকুলার ক্যামেরা টেবিলে রেখে চুরুট ধরালেন।
আমি হতচকিত হয়ে পড়েছিলাম। প্রপাতের জলাশয়ের ধারে মাছধরা ছিপটা ভাঙা অবস্থায় দেখে এসেছি। আফগান হাউন্ডের অতর্কিত আক্রমণের সময় রাকেশ শর্মা কি ছিপের গোড়ার দিকটা দিয়ে জন্তুটাকে আঘাত করেছিলেন? কিন্তু একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে। ওখানে তো কোনও রক্তের চিহ্ন দেখিনি। একটু পরে কর্নেলকে বললাম, -আচ্ছা কর্নেল, হিংস্র কুকুরটা যদি মিস্টার শর্মার গলা কামড়ে বাঘের মতোই জঙ্গলে উধাও হয়ে থাকে তাহলে ঢালু ঘাসের জমিতে প্রচুর রক্ত পড়ার কথা। কিন্তু আমরা রক্ত দেখিনি।
কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, রক্ত আমারও চোখে পড়েনি। অবশ্য অনেক সময়েই কোনও হিংস্র জন্তু গলা কামড়ে টেনে নিয়ে গেলে গলা থেকে কামড় না খোলা অবধি রক্ত ঝরে না। একথা আমি বিখ্যাত বাঘশিকারিদের কাছে শুনেছি। এখন আক্ষেপ হচ্ছে জলাশয়ের ওপরের পাড়ে ঝোপ-জঙ্গলগুলো খুঁজে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু আমি কেমন করে জানব, এমন কিছু ঘটেছে।
আমি একটু চুপ করে থাকার পর বললাম, -হরপার্বতী টিলার গুহা থেকে যে ভাজ করা কাগজটা নিয়ে এলেন, ওতে কী আছে? তাছাড়া আপনি কি আগে থেকেই জানতেন যে ওটা ওখানে পাওয়া যাবে?
কর্নেল বললেন, তোমাকে তো বলেছি, আজই ওই পাহাড়ের গুহা আবিষ্কার করে এলাম। আবিষ্কারের কথাটা ঠিকই। আসলে কাল দুপুরে তুমি যখন গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করছিলে আমি বাইনোকুলারে দেখতে পেয়েছিলাম হরপার্বতী মন্দিরের টিলা বেয়ে বাংলোর মালি নবচন্দ্র উঠে গেল। তারপর আর তাকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম ভক্তিমান নব হয়তো পুজো দিতে যাচ্ছে। কারণ তখনও আমি ওই টিলার চূড়ায় মন্দিরটা আস্ত আছে কিনা জানতাম না। তাই আজ প্রাতঃভ্রমণের সময় নিছক খেয়ালে টিলার চূড়ায় উঠেছিলাম।
দেখলাম কোনও মন্দির নেই। মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে একটা বেঁটে বটগাছ গজিয়েছে। তখন মনে প্রশ্ন জাগল, নবচন্দ্র এখানে কেন এসেছিল। তারপর খুঁজতে-খুঁজতে কয়েক মিটার নিচে ওই গুহাটা দেখতে পেয়েছিলাম।
বললাম, কিন্তু তখন আপনি গুহার ভিতর কিছু খোঁজেননি। আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তারপর খুঁজে ওই ভাঁজ করা কাগজটা পেলেন। ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না।
কর্নেল ঠোঁটের কোণে হেসে বললেন, –তখন ভেবেছিলাম গুহাবাসী লোকটার জন্য নব হয়তো খাবার নিয়ে গিয়েছিল। আমার এ ভুল কেন হল তা বুঝতেই পারছ। ভোরবেলা পিচরাস্তার মোড়ে বন্দুকওলা লোকটার হাতে একটা টিফিন কেরিয়ার দেখেছিলাম।
এই সময়ে রামভগত বারান্দা থেকে বললেন, এখন কি কফি খাবেন স্যার?
কর্নেল বললেন, -হ্যাঁ। যা হবার তা তো হয়েই গেছে, তুমি কফি আনো।
বাইরে রামভগতের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেলে বললাম, -প্লিজ কর্নেল, ওই কাগজটাতে কী লেখা আছে আমায় খুলে বলুন।
কর্নেল বললেন, –ওতে হিন্দিতে লেখা আছে, যোগিন্দর, ধরমপুর থেকে সিনহা সাব খবর পাঠিয়েছে কাল বিকেলের মধ্যে বাংলোয় আসছে। তোমার কথামতো আগাম জানিয়ে রাখলাম। চিঠির নিচে শুধু নব লেখা আছে।
-নব হিন্দি লিখতে জানে?
-কী আশ্চর্য! সে এতকাল বিহার মুলুকে বাস করছে, একটু-আধটু হিন্দি লেখাপড়া জানা তার পক্ষে অস্বাভাবিক নয়।
-ভারি গোলমেলে ব্যাপার। কিছু বোঝাই যাচ্ছে না।
কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, -হ্যাঁ, বড়ো জটিল রহস্য।
কথাটা বলে তিনি জ্বলন্ত চুরুট ঠোঁটে কামড়ে ধরে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। মাথার টুপিটা সম্ভবত খুলতে ভুলে গিয়েছিলেন। মুখ উঁচু করায় টুপিটাই খুলে পড়ে গেল। তবু তিনি ধ্যানস্থ। অগত্যা খালি টুপিটা কুড়িয়ে টেবিলে রাখলাম।
