কথা না বাড়িয়ে তাকে অনুসরণ করলাম। একফালি লাল মাটির পথ। কখনও চড়াই, কখনও উতরাই হয়ে বাঁক নিতে-নিতে জঙ্গলে উধাও হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর একটা খোলা ঘাসে ঢাকা মাঠ দেখতে পেলাম। আমাদের ডান দিকে একটা খাড়াই টিলা দেখে চিনতে পারলাম, এটাই সেই হর-পার্বতীর মন্দির। আগের দিন টিলাটা পশ্চিমদিকের নদীর ধার থেকে দেখেছিলাম। কর্নেল বাইনোকুলারে হরপার্বতীর টিলা এবং চারদিক খুঁটিয়ে দেখার পর এগিয়ে গেলেন।
এদিকটায় টিলার নিচে একটা শালবন। শালবনের নিচে তত বেশি বাড়ি নেই। এলোমেলো বাতাস বইছিল। এতক্ষণে নীল আকাশে সাদা মেঘের টুকরো চোখে পড়ল। শালবন পেরিয়ে কোনও পুরনো আমলের পাথরের সিঁড়ি বেয়ে আমাদের পাহাড়ে চড়া শুরু হল। বলছি পাহাড় বা টিলা, কিন্তু এটা অনেকটা মিশরের পিরামিডের মতোই দেখতে। মাঝে-মাঝে মেঘের ছায়া ছাড়া এদিকটায় কোনও গাছের ছায়া পাওয়ার আশা নেই।
কর্নেল মাঝে-মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পাথরের সিঁড়ি কোথাও-কোথাও পিছল হয়ে আছে। তাই আধঘণ্টা পরে যখন চুড়োয় পৌঁছুলাম তখন আমি হাঁফাচ্ছি। একটা কোণে বটগাছ হরপার্বতীর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে মাথা তুলেছে। তার ছায়ায় একটা পাথরে কর্নেল বসলেন। আমি তার পাশাপাশি আর একটা পাথরে বসলাম। সত্যি, আমার এই বৃদ্ধ বন্ধুর কোনও তুলনা হয় না। তিনি যে ক্লান্ত তাও বোঝা যাচ্ছে না। বাইনোকুলারে চোখ রেখে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কিছু দেখছিলেন।
জিগ্যেস করলাম, জলপ্রপাতটা ওইদিকেই আছে, তাই না?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ, গাছপালার আড়ালে ঢাকা পড়েছে। তবে মৎস্যশিকারি দুই লাক্ষা ব্যবসায়ীকে দেখতে পেলাম না। ওঁরা হয়তো ইচ্ছেমতো মাছ ধরে বাংলোয় ফিরে গেছেন।
-সেই গুহাটা কোথায়?
আমাদের নিচে। চলো, গুহায় বসে চুরুট টানা যাবে।
তাকে অনুসরণ করে দেখলাম ঝোপঝাড়ের ফাঁকে পাথরের সিঁড়ির মতো কয়েকটা ধাপ। সাবধানে কর্নেলের পিছনে নেমে গেলাম। গুহার সামনে একটা পাথরের চাতাল। গুহার দরজাটা প্রায় ফুট ছয়েক উঁচু, ফুট তিনেক চওড়া। চাতালে দাঁড়িয়ে বললাম, -কর্নেল, গুহাবাসী এখন নেই রক্ষে! থাকলে এতক্ষণ লড়াই বেধে যেত।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, –লোকটা দিনে থাকে না।
-কেমন করে জানলেন আপনি?
কর্নেল বললেন, –আজ ভোরে ওই পিচ রাস্তায় সম্ভবত তারই সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।
-কী আশ্চর্য! আপনি আগে বলেননি কেন?
–এই তো বললাম। তুমি জানতে চাইলে, তাই বললাম।
–কী করে বুঝলেন, সেই এই গুহায় রাত কাটায়?
–তার হাতে একটা টিফিন কেরিয়ার ছিল। নাঃ–সে কোনও সাধু-সন্ন্যাসী নয়। দস্তুরমতো ভদ্রলোক।
–কিন্তু সে-ই যে এই গুহায় থাকে, তার কী প্রমাণ পেয়েছেন?
–তার মুখে ফিলটার টিপড সিগারেট ছিল। পিঠে আঁটা ছিল একটা বন্দুক।
–আপনি তাকে কিছু জিগ্যেস করলেন না?
-না। কারণ সে নিজেই বলল, এভাবে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ঠিক নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের জঙ্গলে একটা অজানা মানুষখেকো জন্তুর উৎপাত আছে। সাবধান! আমি তাকে বললাম, আপনি কি ওই জন্তুটাকে মারবার জন্যেই বন্দুক নিয়ে গিয়েছিলেন? সে আমার কথার কোনও জবাব না দিয়ে চলে গেল। এবার জয়ন্ত, তাহলে অঙ্ক কষে দেখো। ১।
অবাক হয়ে কর্নেলের কথা শুনছিলাম। বললাম, -লোকটা তাহলে এলাকার কোনও বড়োনোক। ওই বন্দুক তার প্রমাণ। আর স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, লোকটা বদ্ধ পাগল।
কর্নেল গুহায় ঢুকে গুটিয়ে রাখা ক্যাম্বিসের খাট খুললেন। অবাক হয়ে দেখলাম, বিছানার উপর হিন্দিতে ছাপানো খানচারেক পুরনো বই। জিগ্যেস করলাম, -ওগুলো কিসের বই? গল্প উপন্যাস নাকি?
কর্নেল বললেন, -না। এগুলো মন্ত্রতন্ত্রের বই। ওই কোণে দেখো একটা হ্যারিকেন আছে। হ্যারিকেনটা রাখার জন্যে ওই দেখো, একটা উঁচু টুল।
হাসতে-হাসতে বললাম, -যা বলেছি তাই! বদ্ধ পাগল!
কর্নেল কোনও মন্তব্য করলেন না। তিনি বইগুলোর পাতা একটা-একটা করে ওলটাতে থাকলেন। তারপর একটা ভাঁজ করা কাগজ খুঁজে বের করে সেটা খুলে চোখ বুলিয়ে নিলেন। জিগ্যেস করলাম, ওটা কী?
কর্নেল ভাজ করা কাগজটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে ক্যাম্বিসের খাটটা আগের মতো গুটিয়ে রাখলেন। বললেন, –চলল, এখান থেকে কেটে পড়ি।
কিছুক্ষণ পরে যখন হরপার্বতীর চূড়া থেকে নেমে আসছি, তখন বললাম, আপনি কি জানতেন ওই ভাঁজ করা কাগজটা এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে? তাই এখানে এসেছিলেন?
কর্নেল বললেন, -গুহাটা তো আজ সকালেই আবিষ্কার করেছি।
-তাহলে আবার এলেন কেন?
–তোমাকে দেখানোর জন্য।
–না কর্নেল, আপনি যেভাবেই হোক, খুব সম্ভবত জানতেন ওই ভাঁজ করা কাগজটা এখানে পাওয়া যাবে।
-কাগজে কী আছে বলে তুমি ভাবছ?
একটু হেসে বললাম, -কোনও গুপ্তধনের ঠিকানা।
কর্নেলও হাসলেন, –ঠিক বলেছ ডার্লিং। তবে এখন কোনও কথা নয়। চলো, এখান থেকে জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া যাক।
চূড়া থেকে নেমে আবার একটা শালবন পেরিয়ে ধারিয়া নদীর দেখা পেলাম এক ঝলক। এতক্ষণে জলপ্রপাতের গর্জন শোনা গেল। নদীর ধারে ধারে হাঁটতে-হাঁটতে একসময় জলপ্রপাতের। দেখা পাওয়া গেল। এই জলপ্রপাতটা আমি আগেই দেখেছি। তবে নদীর পশ্চিম পাড় থেকে। জলপ্রপাতের নিচে বিস্তীর্ণ একটা জলাশয়। কর্নেল বাইনোকুলারে জলাশয়টা দেখে নিয়ে বললেন, –কিছু জলচর পাখি সবসময়েই হয়তো এখানে থাকে। তাদের বন্দুকে শিকার করা হয়তো সোজা কিন্তু শিকারকে করতলগত করা কঠিন। কারণ দৈবাৎ এই জলাশয়ের শেষ প্রান্তে গেলেই আর। একটা ছোটো প্রপাতের পাল্লায় পড়ে নৌকো গুঁড়ো-গুড়ো হয়ে যাবে। তাই দেখছ না, এখানে কোনও জেলে নৌকা নেই।
