রামভগত বলল, -না স্যার।
–তাহলে কাল রাতে কারা পাশের ঘরে জিনিসপত্র ভাঙচুর করছিল? তাছাড়া কুকুরে ডাকও শুনেছি। ব্যাপারটা কী?
রামভগত নিজের কপালে থাপ্পড় মেরে ভয়ার্ত মুখে বলল, -মাপ করবেন স্যার, আমারই বলা উচিত ছিল। কোনও-কোনও রাতে পাশের ঘরে ওইরকম আজগুবি সব আওয়াজ শোনা যায়।
-বলো কী?
-হ্যাঁ স্যার। ওই ঘরে পুরনো আসবাবপত্র আর নানারকম জিনিস আছে। আমার আপনাদের বলে দেওয়া উচিত ছিল।
-তাহলে তুমি বলতে চাও ওঘরে ভূত আছে? কোনও-কোনও রাতে তারা হানা দেয়?
-হ্যাঁ স্যার। সিনহা সাব আর শর্মা সাব বছরে অনেকবার করে এখানে আসেন তো, তাই তারা ও নিয়ে মাথা ঘামান না। তা স্যার, আজ সকালেই তো আপনাদের চলে যাওয়ার কথা ছিল। কর্নেল সাহেব বলেছিলেন সকালেই রেঞ্জার সাহেবের জিপ গাড়ি আসবে আপনাদের নিতে।
-হ্যাঁ তাই কথা ছিল। তবে কর্নেল সাহেব বলেছেন আরও দু-চার দিন থাকতেও পারেন। এ জঙ্গলে তার খুব ভালো লেগেছে।
আপনাদের ইচ্ছা স্যার। -বলে সে চলে গেল।
কর্নেল ফিরে এলেন, তখন প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। অভ্যাসমতো কর্নেল টুপি খুলে সম্ভাষণ করলেন, -মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
বললাম, -মাঝখানের ঘরটায় ভূতেরা যা উপদ্রব করল, তাতে সুনিদ্রা আশা করা যায় না।
কর্নেল হাসতে-হাসতে পিঠের কিটব্যাগ খুলে টেবিলে রাখলেন। গলা থেকে ঝুলন্ত বাইনোকুলার ও ক্যামেরাও খুলে রাখলেন। রামভগত তাঁকে ফিরতে দেখেছিল। ট্রেতে কফি এবং স্ন্যাক্স নিয়ে এল। কর্নেল বললেন, রামভগত, রেঞ্জার সাহেব জিপ পাঠিয়েছিলেন কথামতো। পথে আমার সঙ্গে ড্রাইভার ইসমাইলের দেখা হয়েছে। তাকে বলে দিয়েছি, আমরা এখনও দু-তিনটে দিন হয়তো থাকব। কবে ফিরব সে খবর যথাসময়েই তোমার সাহেবকে জানিয়ে দেব।
রামভগত সেলাম ঠুকে চলে গেল। আমি জিগ্যেস করলাম, -আপনি তো নদীর দিক থেকেই এলেন। লাক্ষা ব্যবসায়ীদের নদীতে ছিপ ফেলে বসে থাকতে দেখেছেন নিশ্চয়ই?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। তবে বাইনোকুলারে, দূর থেকে। এঁরা দুজনে ধারিয়া জলপ্রপাতের নিচে যে জলাশয় আছে, সেখানে ছিপ ফেলে বসে আছেন।
বললাম, -কাল রাতের ঘটনাটা রামভগত ভূতুড়ে উপদ্রব বলে ব্যাখ্যা করল।
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, -এই ভূতুড়ে উৎপাতের কথা আমাকে রেঞ্জারসাহেব বলেছিলেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, -কী আশ্চর্য! কথাটা আপনি আমাকে বলেননি?
-বলিনি। তার কারণ আমার সঙ্গে তুমি এতকাল ঘুরছ, তোমার কতখানি সাহস বেড়েছে তা মেপে নিতে চেয়েছিলাম।
হাসতে-হাসতে বললাম, তা সাহস কিছুটা বেড়েছে বইকী! না বাড়লে জানলাগুলো বন্ধ করে দিতাম। আপনি কতদুর ঘুরলেন?
–হরপার্বতীর সেই মন্দিরে আজ উঠতে পেরেছি। চিন্তা করো জয়ন্ত। এই বুড়ো বয়েসে প্রায়। তিনশ ফুট পর্বতারোহণ কম কথা নয়!
-ওখানে কেন উঠেছিলেন? মন্দির তো নেই, ভেঙে গেছে।
-হ্যাঁ। মন্দির নেই, হরপার্বতীও নেই, কিন্তু ওখানে একটা ছোটো গুহা আবিষ্কার করেছি। তুমি শুনলে অবাক হবে, গুহাতে কোনও মানুষ বাস করে। যদিও তার দেখা পাইনি। একটা ভাজ করা ক্যাম্বিসের খাটিয়া আছে। তার মানে কেউ ওখানে শুয়ে রাত কাটায়। অনেকগুলো সিগারেটের ফিলটার টিপ পড়ে থাকতে দেখেছি। তাহলে বোঝ সে যেই হোক, প্রচুর সিগারেট খায়।
–ফিলটার টিপ সিগারেট যে খায়, নিশ্চয়ই তার পয়সাকড়ি ভালোই আছে। কিন্তু সে ওখানে কী করে তা কি টের পেয়েছেন?
কর্নেল থামলেন, আর যাই করুক, তপস্যা করে না।
–অদ্ভুত লোক তো! কর্নেল, নিশ্চয়ই লোকটার কোনও অভিসন্ধি আছে। নাহলে অমন জায়গায় কেন সে রাত কাটাবে?
কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন। এক রাশ ধোঁয়ার সঙ্গে বললেন, -জয়ন্ত, তুমি কাল বলছিলে, আমি যেখানেই যাই রহস্য খুঁজে পাই। কিন্তু সমস্যা কী জানো? বরাবর দেখে আসছি। রহস্যের আড়াল থেকে কোনও চিরন্তন খুনি আমার সামনে একটা করে রক্তাক্ত মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলে আমাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
চমকে উঠে বললাম, -কী সর্বনাশ! ওই অলুক্ষুণে কথা আর বলবেন না কর্নেল। এই বনবাদাড়ে ওইসব লাশ-টাশ নিয়ে জড়িয়ে পড়া ঠিক নয়। ধরুন এমনও তো হতে পারে, যে কুকুরটাকে আপনি আফগান হাউন্ড বলেছেন, তার আক্রমণে কেউ রক্তাক্ত লাশ হয়ে গেল। তখন কি আপনি কুকুরটাকে মারতে এই বিশাল জঙ্গল এলাকায় ছোটোছুটি করে বেড়াবেন?
কর্নেল আমার কথার উত্তর দিলেন না। চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে রামভগত কফির ট্রে নিতে এল। সে বলল, -ব্রেকফাস্ট কি নটায় খাবেন স্যার?
কর্নেল শুধু বললেন, হ্যাঁ।
ব্রেকফাস্টের পর কর্নেলের সঙ্গী হতে হল আমাকে। নিচের পিচ রাস্তায় অবশ্য গাছপালার গাঢ় ছায়া পড়েছে। আমরা নদীর ব্রিজের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে এবার দুধারে ঘন জঙ্গল। কোথাও-কোথাও নিবিড় ঝোপঝাড়। শরৎকালের জঙ্গলে এটা স্বাভাবিক। কিছুটা চলার পর জিগ্যেস করলাম, –আজও কি আপনার লক্ষ সেই বিরল প্রজাতির অর্কিড?
কর্নেল বললেন, -দৈবাৎ তার দেখা পেতেও তো পারি। তবে আপাতত তোমাকে সেই হরপার্বতীর মন্দিরের নিচের গুহা দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি।
বললাম, -সর্বনাশ! তিনশ ফুট পাহাড়ে চড়াবেন আমাকে? এই রোদ্দুরে?
–ডার্লিং! এক সময়ে তুমি মাউন্টেনিয়ারিংয়ে ট্রেনিং নিয়েছিলে। মাঝে-মাঝে তোমাকে পাহাড়ে চড়াই বলেই তোমার শক্তি বাড়ে।
