মিস্টার সিনহার আদেশে রামভগত আরও দুটো চেয়ার ওঁদের ঘরের সামনে বারান্দায় নিয়ে এল।
ওঁদের এই ব্যবহারে আমার অস্বস্তিটা কেটে গেল। লোকদুটোকে কেন যে ভিলেন মার্কা ভেবেছিলাম কে জানে।
কর্নেল বললেন, –মিঃ শর্মা আপনি এই জঙ্গলে কি কোনও বিরল প্রজাতির অর্কিডের খোঁজ পেয়েছেন?
রাকেশ শর্মা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, –অর্কিড। হিমালয় ছাড়া আর কোথাও দেখার মতো অর্কিড আছে নাকি?
কর্নেল হাসলেন, –হিমালয়, সে তো বিশাল ব্যাপার। একজন মানুষের পক্ষে হিমালয় পর্বতের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত যেতে হয়তো জীবন ফুরিয়ে যাবে।
-কেন? সোজা গ্যাংটকে গিয়ে আশেপাশে ঘোরাফেরা করলেই তো কত সব আশ্চর্য অর্কিড।
–আপনি সিকিমে প্রায়ই যান, তাই না?
–তা যাই। কারণ আমাদের ব্যবসার কাজে সেখানে যেতে হয়।
–আপনাদের ব্যবসা কীসের?
মিস্টার সিনহা বলে উঠলেন, লাক্ষা। আমরা লাক্ষার কারবার করি ধরমপুরের পশ্চিম এলাকায় বুনো ফুলের বিস্তীর্ণ জঙ্গল আছে। সেখান থেকে আদিবাসীরা লাক্ষা সংগ্রহ করে আমাদের বিক্রি করে। রামপুরে সরকার একটা ল্যাক রিসার্চ সেন্টার খুলেছেন। এতে আমাদের খুব সুবিধা হয়েছে।
কর্নেল বললেন, আপনারা কদিন থাকছেন?
–দু-তিনটে দিন থাকব। এখন ধারিয়া নদীতে খুব মাছ হয়। আপনারা আর কদিন আছেন?
আমাকে অবাক করে কর্নেল বললেন, –আছি। যতদিন না আমি সেই বিশেষ প্রজাতির অর্কিড খুঁজে পাচ্ছি।
রাকেশ শর্মা কথার ওপর বললেন, –বৃথা চেষ্টা। আর তাছাড়া শুনে এলাম কী একটা ভয়ংকর কুকুর জাতীয় প্রাণী এই জঙ্গলে এসে জুটেছে। ধরমপুর আদিবাসী বস্তির তিন-তিনটে লোককে সেই জন্তুটা তুলে নিয়ে গেছে। পরে তাদের হাড়গোড় ওরা খুঁজে পায়।
আমি সেই কুকুরটার কথা বলতে সবে ঠোঁট ফাঁক করেছিলাম, কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনারা তাহলে কোন সাহসে এখানে নদীতে মাছ ধরতে এসেছেন?
লক্ষ করলাম মিস্টার সিনহা তার সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। তিনিই বললেন, –কর্নেল সাহেব, আমরা এখানে নিরস্ত্র হয়ে আসিনি। আপনারা কি সঙ্গে অস্ত্র-টস্ত্র এনেছেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আমরাও অবশ্য নিরস্ত্র হয়ে জঙ্গলে আসিনি।
-রাইফেল এনেছেন নাকি?
–নাঃ! পিস্তল-টিস্তল আছে।
রাকেশ শর্মা বাঁকা হেসে বললেন, যদি সেই হিংস্র জন্তুটা আক্রমণ করে তাহলে পিস্তল দিয়ে আত্মরক্ষা করা যাবে না।
মিস্টার সিনহা বললেন, –এসব কথা থাক। রামভগতকে চা আনতে বলি।
কর্নেল বললেন, -ধন্যবাদ। আপনারা চা খান, আমরা কিছুক্ষণ আগে কফি খেয়েছি।
মিস্টার সিনহা ডাকলেন, -রামভগত, এখানে এসো।
ততক্ষণে সন্ধ্যার ধূসরতা মুছে গিয়ে হালকা জ্যোৎস্নার ছটা দেখা দিয়েছে। চারদিকে গাছপালার আলোছায়াই আজ আমার চোখে পড়ছে। সেই সঙ্গে ভেসে উঠছে লকলকে লাল জিভ বের করা একটা কালো কুকুরের মুখ এবং সাদা হিংস্র দাঁত।
কর্নেল বললেন, -নমস্কার মিস্টার সিনহা। নমস্কার মিস্টার শর্মা। আমরা এবার উঠি।
মিস্টার সিনহা রামভগতকে চায়ের হুকুম দিচ্ছিলেন। রাকেশ শর্মা প্রতি-নমস্কার করে চাপা স্বরে বললেন, -কর্নেল সাহেব, একটু সাবধানে থাকবেন।
নিশ্চয়ই থাকব। -বলে কর্নেল আমাদের ঘরের সামনে এসে চাপাস্বরে বললেন : জয়ন্ত তোমার অস্বস্তিটা দেখছি ঠিকই ছিল।
এই বনবাংলোয় বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। আমরা চেয়ারে বসার পর রামভগতের বদলে আজ সন্ধ্যায় তার বউ একটা হ্যারিকেন এনে টেবিলে রাখল। তার মাথায় ঘোমটা ছিল। কর্নেল খুব চাপাস্বরে তাকে দেহাতি হিন্দিতে জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী?
সে বলল, -সুশীলা।
–ওই সাহেব দুজন প্রায়ই এখানে আসেন–তাই না?
সুশীলা ফিসফিস করে বলল, -হুজুর, ওরা লোক ভালো নয়।
কথাটা বলেই সে হনহন করে চলে গেল।
রাত নটার সময়েই রামভগত আমাদের খাবার দিয়ে গিয়েছিল। খাওয়ার পর হ্যারিকেনের আলোয় কর্নেল একটা বই পড়ছিলেন। তিনদিকের তিনটে জানলাই খুলে দিয়েছিলাম। পর্দাও সরিয়ে দিয়েছিলাম। দক্ষিণের ঘর বলে এই ঘরটা মোটামুটি আরামদায়ক। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে জ্যোৎস্না ঢুকেছে। কর্নেলের নাক ডাকছে। কেন ঘুম ভাঙল ভাবছি, হঠাৎ আমাদের পাশের ঘরটায় ঝনঝন শব্দ করে কে যেন থালাবাসন ছুঁড়ে ফেলল। তারপরই ক্রমাগত কাচ ভাঙার শব্দ। সেইসঙ্গে অদ্ভুত জান্তব গরর-গরর গর্জন। ব্যস্তভাবে ডাকলাম, -কর্নেল! কর্নেল!
কর্নেলের নাক ডাকা থেমে গেল। জড়ানো গলায় বললেন, কী হয়েছে?
বললাম, -শুনতে পাচ্ছেন না, পাশের ঘরে কী হচ্ছে?
কর্নেল নির্লিপ্তভাবে বললেন, –ও কিছু না। চুপচাপ শুয়ে থাকো।
কর্নেলের কথায় খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ততক্ষণে সব শব্দ থেমে গেছে। শুধু জ্যোৎস্নামাখা গাছপালা আর বাতাসের এলোমেলো শব্দ। আমার লাইসেন্সড রিভলবারটা বালিশের পাশেই ছিল। এসময় জানলায় কোনও মুখ দেখলে নিশ্চয়ই তাকে গুলি করতাম।
.
০২.
ঘুম ভেঙে দেখি কর্নেল যথারীতি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। অন্যদিনের মতো কপাটে কেউ টোকা দিচ্ছিল। উঠে বসে বললাম, -রামভগত নাকি?
রামভগত ভেজানো দরজার কপাট ঠেলে বেড-টি নিয়ে ঘরে ঢুকল। তার হাত থেকে চায়ের। পেয়ালা নিয়ে বললাম, -আচ্ছা রামভগত, তোমার ওই গেস্ট দুজন কি মদ খান?
