বলে তিনি আমাদের ঘরের দরজায় তালা, এঁটে দিলেন। দুজনে লনের সুদৃশ্য ফুলবাগিচা পেরিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ করলাম রামভগতের কোয়ার্টারের বারান্দায় বাংলোর মালি নবচন্দ্র রামভগতের বৌয়ের সঙ্গে কথা বলছে।
গেট খুলে আমরা ঢালু পথে নেমে নিচের রাস্তায় পৌঁছুলাম। রাস্তাটা বেজায় এবড়ো-খেবড়ো। দুধারে ঝোপঝাড় আর কদাচিৎ কয়েকটা উঁচু গাছ। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর আমরা নদীটার দেখা পেলাম। নদীটার নাম ধারিয়া।
এর উপর যে ব্রিজটা আছে তা সঙ্কীর্ণ। সম্ভবত ব্রিটিশ আমলে তৈরি। নদী এখন পুরোটাই ঘোলাটে জলে ভরা এবং স্রোতও খুব তীব্র। জলের ভেতর পাথর থাকায় নদীটা বড্ড বেশি গর্জন করছে যেন। কর্নেল ব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে চারদিকটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। আমি ব্রিজের রেলিংয়ে ঝুঁকে স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
একটু পরে যেদিক থেকে এসেছিল, সেইদিকে নদীতীরের ঝোপঝাড়ের ভিতর একটা লম্বা লাল জিভ বের করা কালো কুকুরের মাথা কয়েকমুহূর্তের জন্য চোখে পড়ল। উত্তেজিতভাবে ডাকলাম, -কর্নেল, কর্নেল, ওটা কী কুকুর?
কর্নেল ঘুরে দাঁড়াতেই কুকুরটা ঝোপের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। কর্নেল বললেন, কোথায়
-ওই ঝোপটার ভেতর মুখ বের করেছিল। লাল জিভ। যেটুকু দেখেছি, তাতে আমার ধারণা ওটা একটা অ্যালসেশিয়ান।
কর্নেল সেইদিকে বাইনোকুলার তাক করে খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, তোমার দেখার ভুল হয়নি তো?
-না। আমি স্পষ্ট দেখেছি কুকুরটা হিংস্র চোখে যেন আমাদেরই দেখছিল।
এবার কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, -এ তো ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। গতকাল আমরা যখন এই নদীর জলপ্রপাতের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আমিও কয়েক সেকেন্ডের জন্য এমনি কুকুরের মুখ দেখেছিলাম। কথাটা তোমাকে বলিনি, কারণ তাহলে তুমি ভয় পেতে।
আমি একটু আমতা-আমতা করে বললেন, -না, আসলে আমি ভেবেছিলাম আদিবাসীরা অনেকে শিকারি কুকুর পোষে। সেইসব শিকারি কুকুরকে বলা হয় আফগান হাউন্ড। কারণ এইজাতের কুকুর শেরশাহের আমলেই এদেশে আনা হয়েছিল। আর শেরশাহ ছিলেন একজন আফগান।
আদিবাসীদের শিকারি কুকুর হোক আর যাই হোক, আমার মনে আবার একটা অস্বস্তি জেগে উঠল। বললাম, -চলুন, বরং সন্ধ্যার আগেই বাংলোয় ফেরা যাক।
কর্নেল কোনও কথা বললেন না কিন্তু। আমাকে অনুসরণ করলেন। লক্ষ করলাম, তার মুখে এখন গাম্ভীর্যের ছাপ পড়েছে।
এবার দুজনে একটু দ্রুত হাঁটছিলাম। বাংলোর নিচে পৌঁছে হঠাৎ কর্নেল হেসে উঠলেন।
জিগ্যেস করলাম, -কী ব্যাপার। হঠাৎ হাসছেন যে?
–যাই বলল জয়ন্ত, একটা কুকুরের জন্যে ধারিয়া নদীর ব্রিজে দাঁড়িয়ে আমাদের চাঁদ ওঠা এবং জ্যোৎস্না দেখা হল না। কাল সন্ধ্যাতেই তো আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না উপভোগ করেছি। জ্যোৎস্নায় পাহাড়ি নদীর স্রোত কী সুন্দর দেখায়। সেই সৌন্দর্য থেকে আমাদের বঞ্চিত করল একটা তুচ্ছ কুকুর।
-কুকুরটার মুখ দেখে আমার কিছু তুচ্ছ মনে হয়নি। সাংঘাতিক হিংস্র মুখ।
কথা বলতে বলতে বাংলোর লনে পৌঁছে দেখি, নতুন অতিথিরা বারান্দায় টেবিল চেয়ার পেতে বসে কথা বলছেন। আমরা গিয়ে বারান্দায় উঠতেই প্রৌঢ় ভদ্রলোক চেয়ার থেকে উঠে এগিয়ে এলেন। বললেন, -রামভগতের কাছে শুনলাম, আপনারা নাকি কলকাতা থেকে এসেছেন?
কর্নেল বললেন, -হ্যাঁ। আপনারা?
–আমরা থাকি রামপুর টাউনে। ধরমপুর আদিবাসী বসতিতে আমাদের একটা রেস্ট হাউস আছে। সেখানে মাঝে মাঝে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যাই। তারপর যদি হঠাৎ খেয়াল হয় তো চলে আসি এই বনবাংলোতে। এখান থেকে ধারিয়া নদী খুব কাছেই। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন। বিশেষ করে এই অক্টোবরে আমরা আসি ছিপ ফেলে মাছ ধরতে।
আমি বলে ফেললাম, আপনাদের সঙ্গে তো কোনও ছিপ দেখলাম না।
ভদ্রলোক একটু হাসলেন, -ছিপ রামভগতের ঘরে আছে। তারও ছিপ ফেলে মাছ ধরার খুব নেশা। যাই হোক-
বলে তিনি কর্নেলের দিকে ঘুরলেন, –রামভগতের কাছে শুনলাম, আপনি নাকি একজন কর্নেল সাহেব।
কর্নেল পকেট থেকে তার একটা নেম কার্ড বের করে ভদ্রলোককে দিলেন। তিনি সেটা দেখার পর জিগ্যেস করলেন, এখানে নেচারোলজিস্ট লেখা আছে। এটা কী?
কর্নেল সহাস্যে বললেন, আসলে আমি দুর্লভ প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি, অর্কিড, ক্যাকটাস ইত্যাদির খোঁজে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। এখানে এসেছিলাম বিশেষ একজাতের অর্কিডের খোঁজে। দুঃখের বিষয় আজ দুপুর অবধি তা খুঁজে পাইনি।
ভদ্রলোক তার সঙ্গীকে ডাকলেন, -রাকেশ, এখানে এসো। আলাপ করিয়ে দিই। উনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, তোমার মতো এই কর্নেল সাহেবেরও অর্কিডের নেশা আছে।
কর্নেল বললেন, -এখনও আপনাদের নাম জানতে পারিনি।
–দুঃখিত। আগেই আমাদের পরিচয় দেওয়া উচিত ছিল। আমার নাম বিক্রমজিৎ সিনহা, আর এ হল আমার ব্যবসার পার্টনার রাকেশ শর্মা।
কর্নেল বললেন, আমার পরিচয় তো পেয়েছেন। আমার এই তরুণ বন্ধুর নাম, জয়ন্ত চৌধুরি। পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রচারিত দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার একজন সাংবাদিক।
মিস্টার সিনহা বললেন, –আসুন আমাদের ঘরের সামনে বসে একটু আড্ডা দেওয়া যাক। বুঝতেই পারছেন, ব্যবসা নিয়ে জীবনটা বড্ড একঘেয়ে লাগে। রাকেশের তো আপনার মতো কিছু-কিছু হবি আছে, আমার হবি বলতে শুধু ফিশিং।
