আর বজ্ৰকান্ত মণি? মহারাজা তা আবার গোপনে কোথাও লুকিয়ে ফেলেন। তার হদিশ আমার জানা নেই।
২.১৫ আফগান হাউন্ড রহস্য
০১.
এবার অক্টোবর মাসে কর্নেলের সঙ্গে ধরমপুর রিজার্ভ ফরেস্ট বেড়াতে গিয়েছিলাম। অবশ্য কর্নেলের উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ এক প্রজাতির অর্কিড সংগ্রহ। দিন তিনেক পরে কি হল কে জানে, কর্নেল বললেন, -অর্কিডের যে খবর আমার এক বন্ধুর কাছে পেয়েছিলাম, সম্ভবত তা ঠিক নয়। কারণ এ বনাঞ্চলে আদৌ দুর্লভ কোনও প্রজাতির অর্কিড গজায় কি না সন্দেহ।
আমি বললাম, –এমনও হতে পারে, অর্কিডের বদলে আপনি এখানে কোনও রহস্যের দেখা পেয়ে গেলেন!
কর্নেল তাঁর প্রখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন–জয়ন্ত, অনেক রহস্যের পেছনেই এতদিন ধরে ছোটাছুটি করেছি, কাজেই রহস্য আমাকে আর তত টানে না। অবশ্য দৈবাৎ যদি কিছু পেয়ে যাই। অর্কিড খুঁজে না পাওয়ার দুঃখটা ঘুচে যাবে।
–তাহলে আর এখানে থাকতে চাইছেন না?
–ঠিক তাই। কাল সকালে আমরা বেরিয়ে পড়ব। বরং রাজগড়ের ওদিকে পাহাড়ি জঙ্গলে দু-একটা বিরল প্রজাতির অর্কিড পেলেও পেতে পারি। কারণ রাজগড় ছোটনাগপুর পর্বতমালার খুব কাছাকাছি।
আমরা যখন এইসব কথা আলোচনা করছিলাম, তখন বিকেল। বাংলোর চৌকিদার রামভগত আমাদের জন্য সবে কফি এনে দিয়েছে। বনবাংলোটা একটা টিলা পাহাড়ের গায়ে। চারদিকে অন্তত ছফুট উঁচু পাঁচিল। তার ওপর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল দুজন তাগড়াই চেহারার ভদ্রলোক নিচের রাস্তা থেকে বাংলোর গেটের দিকে উঠে আসছেন।
চৌকিদার রামভগত তাদের দেখামাত্র হনহন করে এগিয়ে গিয়ে সেলাম ঠুকল। তার মানে, ওঁরা তার পরিচিত। আস্তে বললাম, -কর্নেল, কাল চৌকিদার বলছিল, ধরমপুর ফরেস্টে দেখার মতো কিছু নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে তবুও এখানে মানুষ আসে। কী দেখতে আসে কে জানে।
কর্নেল বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে সবে কফি শেষ করেছেন, চুরুট ধরিয়ে আমেজে টানছেন। আমার কথায় তিনি চোখ খুলে আগন্তুকদের একবার দেখে নিলেন মাত্র। কোনও মন্তব্য করলেন না।
আগন্তুকদের একজন বয়েসে প্রৌঢ়, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, হাতে একটা পুরু ব্যাগ। অন্যজন বয়েসে তার চেয়ে একটু ছোট। কারণ তার গোঁফ এবং চুল দুটোই কুচকুচে কালো। তার হাতে একটা সুটকেস। রামভগত দুজনের হাত থেকে ব্যাগ এবং সুটকেসটা নিয়ে বাংলোর দিকে এগিয়ে এল। তারপর বারন্দা দিয়ে এগিয়ে গিয়ে উত্তরপ্রান্তের শেষ ঘরটার তালা খুলল।
বাংলোয় তিনটে ঘর। আমরা আছি দক্ষিণ প্রান্তের ঘরে।
আগন্তুক দুজনেই আমাদের দিকে কেমন দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে রামভগতকে অনুসরণ করছিলেন। কেন কে জানে তাদের দৃষ্টিটা আমার কাছে অস্বস্তিকর মনে হল। কর্নেলের দিকে তাকালাম। তিনি তেমনি চোখ বুজে চুরুট টানছেন।
এরপর স্বভাবতই রামভগত তার নতুন অতিথিদের সেবায় কিছুক্ষণের জন্য ব্যস্ত হয়ে রইল। তারপর যখন সে আমাদের টেবিল থেকে কফির ট্রে নিতে এল তখন তাকে চুপি-চুপি জিগ্যেস করলাম, –ওঁরা তোমার চেনা নাকি?
রামভগত আস্তে বলল, -হ্যাঁ স্যার। ওই যে বড়াসাব আছেন, তার নাম বিক্রমজিৎ সিনহা, আর ছোটাসায়েবের নাম রাকেশ শর্মা। ওঁরা থাকেন রামপুর টাউনে।
সঙ্গে-সঙ্গে আমার মনে পড়ল, আমরা তো রামপুর রেলস্টেশন হয়েই এসেছি। স্টেশনে রেঞ্জার সুরজিৎ নায়েকের জিপ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি জিগ্যেস করলাম, –ওঁরা দুজন পায়ে হেঁটে এতদূর আসতে পারলেন?
রামভগত একটু হেসে বলল, এখান থেকে সামান্য দূরে একটা আদিবাসী বসতি আছে। যেখানে সিনহা সাব আর শর্মা সায়েবের একটা রেস্ট হাউস আছে। রেস্ট হাউসে গাড়ি রেখে ওঁরা পায়ে হেঁটেই চলে আসেন।
–আচ্ছা রামভগত, তুমি তো বলছিলে ধরমপুর ফরেস্টে দেখার মতো কিছু নেই। তা রেস্ট হাউস থেকে ওঁরা এই বাংলোয় কেন আসেন?
আমার চোখ এড়াল না, রামভগতের মুখটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠল। সে এবার আরও আস্তে বলল, -আমি স্যার, গরিব লোক। বড়লোকরা কী খেয়ালে এখানে ঘুরতে আসেন, আমি বুঝি না।
-এই জঙ্গলে তো হাতি, ভালুক বা বাঘও আছে শুনেছি। কিন্তু ওঁরা সঙ্গে বন্দুক আনেন না?
কখনও-সখনও আনেন। -বলে রামভগত বাংলোর উত্তরদিকে তার ডেরায় চলে গেল। সেখানে তার বউ মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়েছিল। এই মেয়েটিকে আজ তিন দিন ধরে দেখে মনে হয়েছিল, সে বোবা কালা। কিন্তু শেষ বিকেলের আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখলাম ঐ কুঁচকে স্বামীকে কিছু বলল। তার উত্তরে রামভগত যেন তাকে ধমক দিল।
এই কথাটা কর্নেলকে বললাম। কর্নেল চোখ না খুলেই বললেন, তুমি আমি দুজনেই অবিবাহিত। কাজেই রামভগত আর তার বৌ-এর মধ্যে কী নিয়ে কথা হল তা আমরা বুঝব না।
বললাম, আমার মনে হল মেয়েটি কোনও কারণে হঠাৎ একটু চটে গেছে। নতুন অতিথিরা কি তার অবাঞ্ছিত লোক?
কর্নেল চোখ খুলে একটু হেসে বললেন, -বাঃ, বাঃ! এই তো তুমি রহস্যের লেজ দেখতে পেয়েছ।
তখনও সন্ধ্যা নামতে কিছু দেরি আছে। চারদিকের গাছপালা থেকে পাখিদের তুমুল কলরব শোনা যাচ্ছে। কর্নেলের কথা শুনে আমি বললাম-কে জানে কেন, ওই লোকদুটোকে দেখে আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে।
কর্নেল কোনও জবাব দিলেন না। ঘড়ি দেখে নিয়ে বললেন, -বরং এক কাজ করা যাক। নদীর ব্রিজ অবধি একটু ঘুরে আসি চলো।
