সেবেলা আমরা ফরেস্টগার্ডদের কুটির খুঁজে একটা করে শুকনো মৌচাক পেলাম। রঙ্গলালের মৃত্যু হয়েছিল যেখানে, সেখানেও একটুকরো পেলাম। মুহব্বত খাঁ যে মৌচাকটার মধু খেয়েছিল, সেটা আবিষ্কৃত হল কিচেনের আবর্জনার ঝুড়িতে।
অট্টহাস রোগের কারণ খুঁজে পাওয়া গেল তাহলে। কিন্তু দুর্জয় সিং কেন কাউকে জঙ্গলে থাকতে দিতে চান না?
সেদিনই রাতে মহারাজা খবর পাঠিয়ে একশ সশস্ত্র সেপাই আনালেন জঙ্গলে। নিজেও সঙ্গে রইলেন। হ্যারিস, ফ্রাঙ্ক ও আমি একদলে রইলাম। সারা জঙ্গলে ছড়িয়ে রইল বাহিনী। জুমোজুমো নামে প্রাণীটি দেখামাত্র গুলি করা হবে।
তখন রাত প্রায় একটা। ফ্রাঙ্ক, আমি এবং হ্যারিস একটা টিলার ধারে বিরাট পাথরের আড়ালে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি, হঠাৎ সামনে টিলার গায়ে একখানা আলো জ্বলে উঠল। আলো লক্ষ করে পাথরের পেছনে গুঁড়ি মেরে তিনজন এগিয়ে গেলাম। একটু পরে খসখস মাটি কোপানোর শব্দ কানে এল। আলোর কাছেই শব্দটা হচ্ছে। কাছাকাছি গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম, একটা লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই বিকট প্রাণী জুমোজুমো প্রকাণ্ড কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। আমরা ওত পেতে বসে তাদের এই অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ দেখতে লাগলাম।
জুমোজুমো ক্রমাগত মাটি খুঁড়ছে। লোকটি চাপা গলায় তাকে কী নির্দেশ দিচ্ছে। একসময় আর আমি উত্তেজনা দমন করতে পারলাম না। একলাফে বেরিয়ে রাইফেল বাগিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, হ্যান্ডস আপ।
ফ্রাঙ্ক এবং হ্যারিস সম্ভবত আমার কাণ্ড দেখে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। তারাও বেরিয়ে এলেন রাইফেল তাক করে।
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে আলো নিবিয়ে দিল ফুঁ দিয়ে। ঘন অন্ধকারে কয়েক সেকেন্ড কিছু দেখতে পেলাম না। তারপর ফ্রাঙ্ক ও হ্যারিসের টর্চ জ্বলে উঠল। জুমোজুমোকে দেখলাম ডিগবাজি খেয়ে পড়েছে। গুলি ছুঁড়লাম। প্রাণীটি গর্জন করে টিলার গা বেয়ে গড়াতে গড়াতে নিচের দিকে চলে গেল।
হ্যারিস লোকটার বুকে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে বলল, নড়লেই মারা পড়বে!
টিলার নিচের দিকে সেইসময় মহারাজার সেপাইদের হইহই শোনা গেল। তারা প্রাণীটাকে দেখতে পেয়েছে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর চিৎকার চেঁচামেচিতে রাতের জঙ্গলে হুলস্থূল হচ্ছিল। তারপর মশাল জ্বলতেও দেখলাম।
লোকটার হাত থেকে লণ্ঠন কেড়ে নিয়ে ফ্রাঙ্ক জ্বেলে দিলেন। বেশ লম্বা-চওড়া লোক সে। পরনে বুশশার্ট আর ব্রিচেস। মাথায় ঘন চুল, কোমরে বাঁধা বেল্টে রিভলবার ঝুলছে চামড়ার খাপে। বললাম, আপনি কি মহারাজা বাহাদুরের ভাই দুর্জয় সিং?
সে কোনও জবাব দিল না। কিন্তু পেছন থেকে মহারাজার সাড়া পাওয়া গেল। হাওর নামই দুর্জয় সিং। ওকে ছাড়বেন না। সারাজীবন আমাকে ও বিপদে ফেলতে চেয়েছে। তাছাড়া ওর নামে ব্রিটিশ সরকার হুলিয়া করেছেন। ওকে কালেক্টরের হাতে তুলে দিতে হবে।
দুর্জয় সিং মহারাজার দিকে ক্রুদ্ধদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, তার আগে আমি সবার কাছে তোমার কীর্তি ফাঁস করে দেব।
মহারাজা বাঁকা হেঁসে বললেন, কীর্তি ফাঁস করবে? কেউ বিশ্বাস করবে না।
দুর্জয় সিং বললেন, দাদামশাই বেঁচে নেই তাই। তবে তাঁর উইল আছে ব্রিটিশ সরকারের কাছে। তাতে স্পষ্ট লেখা আছে, বজ্ৰকান্ত মণি আমাকেই দিয়ে গেছেন। অথচ তুমি তা লুকিয়ে রেখে আমাকে বঞ্চনা করেছ।
আমরা অবাক হয়ে শুনছিলাম। মহারাজা বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললেন, তাই উদ্ধার করার জন্য কি এখানে মাটি খুঁড়েছিলে দুর্জয়?
দুর্জয় সিং বললেন, আমি জানি তুমি বজ্ৰকান্ত মণি এই জঙ্গলের ভেতর এনে লুকিয়ে রেখেছ। আমার ভয়ে আজমগড় প্রাসাদে রাখতেও সাহস পাওনি। মহারাজা প্রতাপ সিং হুইসল বাজালেন। কয়েকজন দেহরক্ষী হন্তদন্ত দৌড়ে এল। তারা নিচে অপেক্ষা করছিল সম্ভবত। মহারাজা হুকুম দিলেন, একে বেঁধে নিয়ে এসে তোমরা। এখনই আজমগড়ে ফিরে যেতে হবে। ….
.
০৬.
পরে সব কথা জানতে পেরেছিলাম, প্রতাপ সিং আর তার পিসতুতো ভাই দুর্জয় সিংয়ের মধ্যে বিবাদ বহু মূল্যবান একটা মণি নিয়ে। দুর্জয় সিং কোনও বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছিলেন, মহারাজা তার সংরক্ষিত জঙ্গলের ভেতর একটা টিলায় বিশেষ চিহ্নিত স্থানে সেই মণি লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু জঙ্গলে এসে দুর্জয় সিংয়ের তা খোঁজাখুঁজি করায় বাধা ছিল। ফরেস্টগার্ডরা মহারাজার হুকুমে সবসময় নজর রেখে ঘুরত। তার ওপর আমাকে গেম ওয়ার্ডেনের চাকরি দিয়ে জঙ্গলে পাঠানো হল–যাতে আমিও নজর রাখি কেউ জঙ্গলে যেন ঢুকতে না পারে। দুর্জয় সিং ইতিমধ্যে গোপনে জঙ্গলে এসে আস্তানা করেছেন। পোষা জুমোজুমো নামে আফ্রিকার প্রাণীটিকে দিয়ে বিষাক্ত মৌচাকের সাহায্য জঙ্গলরক্ষীদের খতম করতে শুরু করেছেন। আমি এসে পড়ায় আমাকেও একই পদ্ধতিতে খতম করতে চেয়েছিলেন। কারণ জঙ্গলরক্ষীদের মতো আমারও দুর্জয় সিংকে দেখে ফেলার সম্ভবনা ছিল। নির্বিঘ্নে মণি অনুসন্ধানের কাজ করতে পারতেন না। যাইহোক, অট্টহাস। রোগের ফঁস হল এভাবে। দুর্জয় সিংয়ের গোপন আস্তানাও পাহাড়ের গুহায় আমরা আবিষ্কার করলাম।
গুহার ভেতর সার-সার বিষাক্ত মৌমাছির মৌচাক ছিল। গুহার মুখে শুকনো জ্বালানি ঠেসে আগুন ধরিয়ে পাথর চাপা দিলাম। আফ্রিকা থেকে দুর্জয় সিং ওই মৌমাছির একটা চাক এনেছিলেন। ক্রমশ তাদের বংশবৃদ্ধি হয়েছিল। সব পুড়ে মরল। আহত জুমোজুমোকে মৃত অবস্থায় জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছিল।
