কিন্তু তাহলে আমি রেহাই পেলাম কেন?
মহারাজার কাছে ফের জঙ্গলে গিয়ে থাকার অনুমতি চাইলাম। উনি আঁতকে উঠে বললেন, না না। জঙ্গল ফতুর হয়ে যাক। আমার ওই শখে আর কাজ নেই। আপনি যা করছেন, তাই করুন। অগত্যা একদিন গোপনে জিমকে নিয়ে মহারাজার অগোচরে জঙ্গলের দিকে পাড়ি জমালাম।
.
০৪.
ফরেস্টগার্ড চতুষ্টয়, আজীরলাল এবং মুহব্বত খাঁয়ের জঙ্গলে অট্টহাসে মৃত্যু হওয়ায় ওদিকে কোনও মানুষ আর ভুলেও পা বাড়াবে না জানতাম। কাঠের কুটিরের অবস্থা যেমন ছিল, তেমনি আছে দেখলাম। দুপুর পর্যন্ত বেশ কয়েক মাইল চক্কর দিয়ে এলাম। বিকেলে ধারি নদীর ধারে ঘঘারাঘুরি করলাম। অনেক ভাবলাম। কোনও খেই পেলাম না।
এ রাতে জ্যোৎস্না ছিল। জঙ্গলে মাঝে মাঝে বন্য প্রাণীর চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। রাতচরা পাখি ডাকছিল। সারাক্ষণ উত্তাল বাতাসের শব্দও ছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল জিমের গর গর গর্জনে। উঠে দেখি, জিম জানলার তারের জালিতে মুখ ঘষে নিচে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। জানলা আস্তে খুলে নিচে একটু তাকাতে খোলামেলা জায়গায় কালো একটা মূর্তির নড়াচড়া চোখে পড়ল। চোরাশিকারি না কি? যেই হোক, সাহস তো কম নয়।
টর্চ ও রাইফেল নিয়ে চুপি চুপি বেরুলাম। জিমকে ইশরায় বুঝিয়ে দিলাম, তাকে চুপ করে থাকতে হবে। কাঠের সিঁড়ি ছায়ার ভেতর নিঃশব্দে নামিয়ে নেমে গেলাম দুজনে। তলার প্রচুর ঘাস আর আগাছা। ঘন ছায়ায় একটা গাছের আড়ালে দাঁড়ালাম ছায়ামূর্তিটা মুখ তুলে কুটির দেখছে। একটু পরে সে ওপাশের গাছ বেয়ে উঠতে শুরু করল। তারপর গেছো জন্তুর দক্ষতায় ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে কুটিরের দেয়াল আঁকড়ে ধরল। ওদিকে তারের জালঘেরা বারান্দা আছে। চাপা ঘষ-ঘষ শব্দ শুনতে পেলাম। সে কি তারের জালটা কাটছে?
ইচ্ছে করলে তো সে পরিত্যক্ত নির্জন কুটিরে এতদিন ঢুকতে পারত। এখন যখন ঢুকছে, তখন তার লক্ষ আমি ছাড়া আর কী হতে পারে?
জিমকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে পা টিপেটিপে উলটো দিকে সিঁড়িতে চলে গেলাম। ওপরে উঠে টের পেলাম শ্রীমান ছায়ামূর্তি কিচেনের দিকে বারান্দায় সমানে ঘষ ঘষ চাপা শব্দ তুলে তারের জাল কেটে চলেছে। কিচেনে নিঃশব্দে ঢুকে তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।
জাল কাটা হলে সে বারান্দায় উঠল। তারপর ওপাশ ঘুরে ড্রয়িংরুমের দরজার সামনে দাঁড়াল। ওই দরজা দিয়ে আমরা দুটিতে সদ্য ঢুকেছি। খোলাই আছে। বন্ধ করার কথা খেয়াল করিনি। একটু ইতস্তত করে সে ভেতরে যেই ঢুকেছে, অমনি কিচেনের দরজা থেকে আমি টর্চ জ্বেলেছি এবং জিমও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
সে এক বীভত্স কদাকার প্রাণী। কতকটা মানুষের মতো দেখতে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ শরীর। সারা গায়ে লোম। একমাথা জটাপাকানো চুল। একরাশ জঙ্গুলে দাড়িগোঁফ। বিকট দুর্গন্ধ টের পেলাম এতক্ষণে।
কিন্তু তার গায়ে অসুরের মতো জোর। জিমকে দুহাতে ধরে দরজা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। জিমের আর্তনাদে বুঝলাম মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। আমি রাইফেল বাগিয়ে গুলি করলাম। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। সেই মুহূর্তে সম্ভবত গুলির প্রচণ্ড শব্দে ভয় পেয়ে ভয়ংকর প্রাণীটা এক লাফে বেরুল এবং যে পথে এসেছিল সেই পথেই চলে গেল। দৌড়ে গিয়ে তাকে আর খুঁজে পেলাম না। নিচে ধপাস করে একটা শব্দ হল বটে, তাকে দেখতেই পেলাম না।
এখন আহত জিমের শুশ্রূষা জরুরি। তার দিকেই মন দিলাম।
.
০৫.
সকালে ড্রইংরুমের ভেতর এক টুকরো মধুভরা মৌচাক আবিষ্কার করে অবাক হয়েছিলাম। ওই প্রাণীটিই কী এই মৌচাক নিয়ে হানা দিয়েছিল?
ভাগ্যিস, মৌচাকটুকু থেকে মধু নিঙড়ে খাওয়ার লোভ করিনি। তাহলে এই গল্প বলার জন্য বেঁচে থাকতাম না।
কিন্তু মৌচাক উপহারের উদ্দেশ্য কী? মেঝের দিকে তাকিয়ে সেইকথা ভাবছি, সেই সময় ধারি নদীর ওদিকে জিমের শব্দ শুনলাম। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম, মহারাজা দুজন সাহেব সঙ্গে নিয়ে আসছেন। তক্ষুনি নেমে গিয়ে তাদের অভ্যর্থনা করলাম। মহারাজা আলাপ করিয়ে দিলেন। অস্ট্রিয়ার প্রখ্যাত জীবাণু বিশেষজ্ঞ হ্যারিস বার্ডনট এবং তার এক শিকারি বন্ধু ফ্রাঙ্ক জিওট্রাস। ফ্রাঙ্ক প্রাণীতত্ত্ববিদও। আমি এভাবে ফের এসেছি বলে মহারাজা একটু ভর্ৎসনা করলেন আমাকে।
হ্যারিস মৌচাকটা দেখেই চমকে উঠেছিলেন। বললেন, সর্বনাশ? এত এক মারাত্মক বিষাক্ত মৌমাছির মধু। অবশ্য সব মৌমাছিই বিষাক্ত। কিন্তু এ জাতের মৌমাছির মধুও বিষাক্ত। এরা আফ্রিকার জঙ্গলে বাস করে। এদেশে এল কীভাবে?
মহারাজা হাঁ করে শুনছিলেন। বললেন, আফ্রিকার মৌমাছি? তাহলে কী…
ওঁকে চুপ করতে দেখে বললাম, কী মহারাজা বাহাদুর?
মহারাজা গম্ভীর মুখে বললেন, আমার পিসতুতো ভাই দুর্জয় সিং আফ্রিকায় ছিল। মাস ছয়েক হল সে ফিরেছে। আমার সঙ্গে তার শত্রুর সম্পর্ক। কিন্তু ব্যাপারটা কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাছাড়া সে একজন ডাক্তারও বটে।
বললাম, একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে। দুর্জয় সিং এ জঙ্গলে কাউকেও ঢুকতে দিতে চান না।
মহারাজা বললেন, ঠিক, ঠিক, তাই বটে। কিন্তু কেন? আমার জঙ্গলে তার এরকম খবরদারির কারণ তো বোঝা যায় না।
ফ্রাঙ্ক বললেন, মৌচাক ফেলতে এসেছিল যে প্রাণীটি, বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছে, এ একজাতের আফ্রিকান বাঁদর। গরিলা ও বেলুনের মাঝামাছি প্রজাতির প্রাণী। মানুষের মতো উঁচু। গড়নও সেরকম। দুপায়ে হাঁটতে পারে। কোনও কাজ শেখালে করতে পারে। আফ্রিকায় তাদের বলা হয় জুমোজুমো।
