একজন আদিবাসী চিত হয়ে পড়ে রয়েছে। তার হাতের পাশে একটা দিশি গাদা বন্দুক। নিশ্চয় লুকিয়ে জঙ্গলে হরিণ মারতে এসেছিল। তার মুখ থেকে গলগল করে তখনও রক্ত বেরুচ্ছে। দেখামাত্র মনে পড়ে গেল অট্টহাসের কথা। ভয়ে সারা শরীর শিউরে উঠল। তাহলে এই লোকটি জঙ্গলের ভেতর এসেও সেই মারাত্মক রোগ থেকে রেহাই পায়নি দেখছি।
হুইসল বাজিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজন গার্ড এল। সে ব্যাপারটা দেখে চমকে উঠে বলল, সর্বনাশ-এ যে দেখছি কাঠুয়াগড়ের সেই রঙ্গলাল। গতমাসে এর দাদা আজিরলালও এভাবে মারা পড়েছে।
বললাম, জঙ্গলের ভেতর নাকি?
গার্ড বুধ সিং গম্ভীর মুখে বলল, না স্যার। ওদের বস্তিতে। যাই হোক, এখানে আর থাকা উচিত নয়। চলুন।
মড়াটার কী হবে?
জানোয়ার খেয়ে ফেলবে। আর কী হবে?
বুধ সিংয়ের নির্বিকার মনোভাব খারাপ লাগল। বললাম, তুমি বরং ওদের বাড়িতে খবর দিয়ে এসো। আমি ততক্ষণ পাহারায় থাকছি। একজন মানুষ তো বটে!
বুধ সিং যেন পলায়নের তালে ছিল। সে গোমড়া মুখে বলল, তা যাচ্ছি। কিন্তু আপনি আর এখানে থাকবেন না স্যার। এ বড় ভয়ংকর রোগ। কিছু বলা যায় না।
বলে সে লম্বা পা ফেলে হনহন করে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। বললাম, কী হল, বুধ সিং?
বুধ সিংয়ের চেহারা দেখে একটু অবাক হলাম। ওখানে ফাঁকা জায়গা বলে যথেষ্ট রোদ পড়েছে। তার মুখের রঙটা হঠাৎ কেমন যেন লাল দেখাচ্ছে। তার চোখ দুটো বড় হয়ে যাচ্ছে। তারপর মনে হল, চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। চেঁচিয়ে ফের বললাম, কী হল বুধ সিং?
অমনি বুধ সিং নিঝুম জঙ্গল কাঁপিয়ে হা-হা-হা-হা করে বিকট হেসে উঠল। তার হাত থেকে বন্দুকটা পড়ে গেল, তারপর দুহাত শূন্যে তুলে সে ভয়ংকর অট্টহাসি হাসতে হাসতে ধপাস করে পড়ে গেল। সে সমানে হাসছিল আর গড়াগড়ি খাচ্ছিল ঘাসের ওপর। তারপর তার মুখে রক্ত দেখতে পেলাম।
এই বীভৎস দৃশ্য দেখার পর আর স্থির থাকতে পারলাম না। এবার আমার অট্টহাসের পালা ভেবে পড়ি কী মরি করে ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটতে শুরু করলাম। জিমের কথা ভুলে গেলাম যেন। ধারি নদীর ধারে আমার ডেরায় পৌঁছে জিমের খোঁজ করলাম। দেখলাম সে আমার আগেই পৌঁছে গেছে। কুটিরের তলার আগাছা থেকে বেরিয়ে লেজ নাড়তে লাগল। তাকে আদর করে মুহব্বত খাকে ডাকলাম সিঁড়ি নামিয়ে দিতে। কিন্তু কোনও সাড়া পেলাম না। বারকতক ডেকে অবাক হয়ে কুটিরের চারদিকে ঘুরে তাকে খুঁজলাম। বিশ ফুট উঁচুতে কুটির। দরজা-জানলা খোলা। অথচ মুহব্বতের পাত্তা নেই। নদীতে স্নান করতে গেলে তো কাঠের সিঁড়িটা নামানো থাকত। আশংকা গা ছমছম করছিল। সাহস করে আরও কয়েকবার ডাকলাম। কিন্তু তবু কোনও সাড়া পেলাম না। তাই হুইসল বাজাতে শুরু করলাম। এই হুইসলগুলো মহারাজা বিদেশ থেকে বিশেষভাবে তৈরি করে আনিয়েছিলেন। এতে ফুঁ দিলে তীক্ষ্ণ আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে-হতে বহু দুর অবধি শোনা। যায়। প্রয়োজনে এর ক্ষমতা টের পেয়েছি। এদিকে বাকি তিনজন গার্ডের একজনেরও সাড়া মিলল না।
কুটিরে ওঠা অসম্ভব হতো না আমার পক্ষে। কিন্তু আর সে চেষ্টা না করে জিমকে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ধারি পেরিয়ে ছুটে চললাম আজমগড়ের উদ্দেশে। পাকা রাস্তায় কোনও মোটর গাড়ি পেয়ে যাব….।
.
০৩.
হ্যাঁ, মুহব্বত খাঁও অট্টহাস রোগে মারা পড়েছিল। শুধু তাই নয়, একই দিনে বাকি তিনজন ফরেস্টগার্ডের একই মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছিল। এরপর জঙ্গলে গিয়ে থাকার সাহস ছিল না। মহারাজা প্রতাপ সিং বাহাদুর বলেছিলেন, আমার জঙ্গলের প্রাণীদের চেয়ে মানুষের প্রাণ আমি বেশি মূল্যবান মনে করি। আপনি কিছুদিন প্রাসাদে বিশ্রাম করুন। অবস্থা বুঝে একটা ব্যবস্থা করা যাবে। বিশ্রাম করা আমার ধাতে নেই। প্রাসাদের বিশাল চিড়িয়াখানার তদারকিতে মন দিয়েছিলাম। কিন্তু খোঁজ রাখতাম, জঙ্গল এলাকায় আর কেউ মারা পড়েছে কি না। এদিকে মহারাজা আবার ইউরোপের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, যদি কোনও বিশেষজ্ঞ অট্টহাস রোগের কারণ আবিষ্কার ও প্রতিকার করতে পারেন, তাকে মোটা টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
আমি ডাক্তারি পড়িনি। রোগ বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা তীব্র জেদ কাজ করছিল। তাছাড়া একটা আশ্চর্য ব্যাপার আমার মাথায় এসেছিল। আদিবাসী চোরাশিকারি রঙ্গলালের অট্টহাসে মৃত্যু দেখে ফরেস্টগার্ড বুধ সিং আক্রান্ত হল সঙ্গে সঙ্গে। অথচ আমার কোনও কিছু হল না? এমনকী মুহব্বত খাঁ এবং আমি একই সঙ্গে থেকেছি। মুহব্বত খাঁ আক্রান্ত হল, আমি হলাম না। এ কি আমার শরীরের বিশেষ ক্ষমতায়? কী ক্ষমতা? বুধ সিং আমার চেয়ে স্বাস্থ্যবান জোয়ান ছিল।
অট্টহাসে যেখানে সেখানে প্রথমে লোক মারা পড়েছে, সেখানে গিয়ে খোঁজখবর শুরু করলাম। তখনও কোনও কোনও গ্রামে একটা করে লোক মারা পড়েছিল। কিন্তু আশ্চর্য, তাদের মারা পড়তে যারা দেখেছে বা দেখছে, তাদের কিন্তু কিছু হচ্ছে না। কেন?
হাতিপুরা বলে একটা গাঁয়ে সর্বশেষ যে লোকটি অট্টহাসে মারা গেল, তার বাড়ি হাজির হলাম। তার বউকে অনেক জিগ্যেস করে পয়সাকড়ি সাহায্যের লোভ দেখিয়ে একটা মূল্যবান সূত্র বেরিয়ে এল। হ্যাঁ, এটাই আমার সন্দেহ হয়েছিল। লোকটা ছিল ওই জঙ্গলের নিয়মিত চোরাশিকারি। এরপর অন্তত গোটাদশেক অট্টহাসে মৃত্যুর পুরনো কেস তদন্ত করে একই সূত্র মিলে গেল। কেউ ছিল চোরাশিকারি, কেউ জঙ্গলে গিয়েছিল কাঠ ভাঙতে বা গরু চরাতে। তাহলে কি ওই জঙ্গলেই অট্টহাসের বীজাণু আছে?
