-অরুণ একদল পুলিশ নিয়ে বেরিয়ে গেল। পুলকেশবাবু পুরো ব্যাপারটা জানতে চাইলেন। সবই বললাম। শোনার পর উনি হাসতে হাসতে বললেন, –কিন্তু অমন ধূর্ত তারকবাবু আপনার কাছে গিয়েই ধরা পড়ছেন। যেচে বিপদ ডাকতে গেলেন কেন বলুন তো?
চুরুট ধরিয়ে বললাম, -একটা সহজ কারণ পুলকেশবাবু। তারকবাবু ভালোমানুষ সাজতে চেয়েছিলেন এবং সেই সুযোগ আমাকে দিয়ে বুঝতে চেয়েছিলেন, এ ব্যাপারে দৈবাৎ তার ধরা পড়ার মতো কোনও সূত্র থেকে গেছে কি না। তার ইচ্ছে ছিল, আমি তার বাড়িতে উঠি। তিনি তাহলে আমার সঙ্গে থেকে সূত্রগুলো জানতে পারবেন এবং সেগুলো ম্যানেজ করবেন। কিন্তু আমি তার ফাঁদে পড়িনি। তাকে জানাইনি কবে আমি আসছি কোথায় উঠছি।
–কিন্তু ওঁকে দেখে আপনার সন্দেহ হয়েছিল কেন?
–যে একজন রহস্যভেদীর সাহায্য নিতে এসেছে, সে তাকে নিজের বাড়িতে ওঠার জন্য সাধবে কেন? তাতে তো প্রতিপক্ষ সতর্ক হয়ে যাবে। তাই তারকবাবু নিজের বাড়িতে আমাকে ওঠার জন্য বারবার সাধাসাধি করায় আমার সন্দেহ হয়েছিল, ভদ্রলোকের কোনও অন্য উদ্দেশ্য আছে।
পুলকেশবাবু বললেন, আপনি সত্যি অনন্যসাধারণ।
২.১৪ কর্নেলের জার্নাল থেকে-২
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় এলাকায় একরকম অদ্ভুত রোগ দেখা দিয়েছিল। এই রোগের নাম দেওয়া হয়েছিল অট্টহাস। কোনও কারণ ঘটেনি, অথচ লোকে আচমকা হা-হা করে বিকট হাসতে শুরু করত এবং হাসির চোটে কিছুক্ষণের মধ্যে দম ফেটে মারা পড়ত।
বীভৎস রোগ বলা যায়। ভারতে তখনও ব্রিটিশ রাজত্ব। বাঘা-বাঘা বিলিতি ডাক্তারের একটা দল গিয়ে এই রোগের কারণ আবিষ্কার করতে পারেননি। কোনও রোগীকে বাঁচানো তো দুরের কথা। ওই সময় আমি সামরিক দফতর থেকে ছাঁটাই হয়েছি। যুদ্ধ থেমে আসছে। তরুণ বয়সে বেকার হয়ে বসে থাকতে মন চাইছিল না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন খুঁজে দরখাস্ত করে যাচ্ছিলাম একনাগাড়ে। অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল। কিন্তু চাকরিটা পেলাম সেই আজমগড়ে। অর্থাৎ যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।
বন্ধু ও হিতৈষীরা নিষেধ করলেন। অট্টহাস রোগের ভয় দেখালেন। কিন্তু আমি কারুর কথায় কান দিলাম না। কারণ চাকরিটা ছিল আমার পক্ষে ভারি লোভনীয়। আজমগড় তখন দেশীয় রাজার। স্টেট। বন, পাহাড় এবং প্রচুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। আমার চাকরি মহারাজার গেম ওয়ার্ডেনের। মহারাজার একটি সংরক্ষিত জঙ্গল ছিল। সেখানে প্রচুর শিকারের প্রাণীর সমাবেশ। মহারাজা মাঝে মাঝে শিকারে যেতেন বন্ধুবান্ধব নিয়ে। কখনও লাট-বড়লাটের শিকারের খেয়াল হতো। তাদেরও নিয়ে যেতেন মহারাজ প্রতাপ সিং বাহাদুর। আমার কাজ হল ওঁদের শিকারের ব্যবস্থা করা। সেইসঙ্গে এই সংরক্ষিত জঙ্গলে চোরা শিকারিরা যাতে ঢুকে জীবজন্তু না মারতে পারে, সেদিকেও। কড়া নজর রাখতে হতো।
অট্টহাস লোগ যখন শুধু মানুষকেই ধরছে, তখন মানুষের বসতির বাইরে ঘোর জঙ্গলে থাকাটা নিরাপদ ভেবেই ওই চাকরি নিতে দ্বিধা করিনি। আজমগড় শহর থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দূরে ধারি নামে সুন্দর একটা পাহাড়ি নদীর ধারে জঙ্গলের ভেতরে আমার ডেরা হল। ডেরাও ভারি রোমাঞ্চকর। কাছাকাছি কয়েকটা গাছের প্রকাণ্ড সব ডালের ওপর মাটি থেকে অন্তত বিশ ফুট ওপরে একটা সবুজ রঙের কাঠের বাড়ি। দূর থেকে চোখে পড়া কঠিন ছিল। বাড়িটার ছাউনিও সবুজ রঙের করোগেট শিটের। একটু হাওয়া দিলে কিংবা বৃষ্টি হলে ভীষণ শব্দ হতো, এটাই যা বিরক্তিকর। কিন্তু ক্রমশ সেটা কানে সয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে তিনটে ঘর। একটা ড্রয়িংরুমে–মহারাজা কিংবা তার অতিথি শিকারিরা এলে ওখানেই বসতেন। অন্যটা আমার বেডরুম। বাকিটা কিচেন। সে ঘরে আমার ভৃত্য ও রাঁধুনি মুহব্বত খাঁ থাকত।
.
০২.
তখন মার্চ মাস। জঙ্গলে বসন্ত এসেছে। কত রকমের বুনো ফুল ফুটেছে। সারাক্ষণ মিঠে গন্ধে জঙ্গল মউ-মউ করে। কাঁধে রাইফেল নিয়ে জঙ্গলের ভেতর চক্কর দিতে বেরোই সকাল-বিকেল দুদফা। জনাচার ফরেস্টগার্ডও ছিল। তারা পঞ্চাশ বর্গমাইল এলাকায় চার সীমানায় ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে চার। জায়গায় থাকত। সেই ঘরগুলোও ছিল গাছের মাথায়। চোরাশিকারি দেখলে বা কিছু ঘটলে গার্ডের হুইসল বাজানোর নিয়ম ছিল। উঁচুতে হুইসল বাজালে তার তীক্ষ্ণ শিস আরেকজন শুনতে পেত। আমিও পেতাম। তখন আমার কুকুর জিমকে নিয়ে ছুটে যেতাম।
দিন পনেরো কেটে গেল। তারপর একদিন জঙ্গলের ভেতর এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে ডেরায় ফিরছি, হঠাৎ কার বিকট হাসি শুনে চমকে উঠলাম। প্রথমে ভাবলাম হায়েনার ডাক। কিন্তু দিনদুপুরে হায়েনা ডাকে না। তাছাড়া হা-হা-হা-হা বিকট শব্দটা থামছে না।
শব্দ লক্ষ করে দ্রুত এগিয়ে গেলাম। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এগুতে পোশাক প্রায় ফর্দাফাই হবার উপক্রম। আমার প্রিয় কুকুর জিম আমার আগে আগে যাচ্ছিল। শব্দটা থেমে গেল একটা আঁ-আঁ-আঁ আর্ত চিৎকার। অমনি অমন সাহসী মারমুখী কুকুরটাও ভয় পেয়ে আমার দুপায়ের ফাঁকে এসে লেজ গুটিয়ে ফেলল।
তাকে ধমক দিয়েও নড়ানো যাচ্ছিল না। অগত্যা আমি পা বাড়ালাম। জিম তখন আমার পেছন পেছন কাঁচুমাচু মুখে হাঁটতে থাকল। উঁচু গাছের একটা জটলা, তার পাশে একটা প্রকাণ্ড বাড়ির মতো ন্যাড়া পাথর। সেই পাথরের নিচে ছায়ার ভেতর কী একটা পড়ে থাকতে দেখলাম। কাছে গিয়ে হকচকিয়ে গেলাম।
