-কিনুর হাতে রিভলবারটাও তোমরা পেয়েছ, অরুণ।
ভিড়ের গণ্ডগোলের সুযোগে ওর হাতে খুনি গুঁজে দিয়েছে।
–তোমার এই পয়েন্টটা ঠিক আছে অরুণ।
–কোন পয়েন্টটা ঠিক নেই?
একটু বসো, দেখাচ্ছি–বলে বাংলোর ভেতর গেলাম। কিটব্যাগ থেকে সেই ড্রেনে কুড়িয়ে পাওয়া খেলনা রিভলবারটা এনে অরুণকে দেখালাম।
অরুণ অবাক হয়ে বলল, -এটা তো টয় রিভলবার। কোথায় পেলেন?
বললাম, –যেখানে সভা হয়েছিল, তার কাছে ড্রেনের মধ্যে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম এমন একটা জিনিস কাছাকাছি কোথাও লোকের চোখে পড়ার বাইরে পড়ে থাকবে।
-কী অদ্ভুত। আপনি কি মন্ত্রবলে জানতে পেরেছিলেন, কর্নেল?
হাসতে হাসতে বললাম, -নাহ ডার্লিং। সহজ বুদ্ধিতে। আসলে সত্যিকার রিভলবার চালানো কোনও পাগলের সাধ্য নয়। অটোমেটিক রিভলবারের ট্রিগার টানলে গুলি বেরুবে। কিন্তু কোনও পাগলের ট্রিগার টেনে নির্দিষ্ট স্থানে লক্ষ্যভেদ একেবারে অসম্ভব। তাছাড়া ছটা গুলির মধ্যে তোমরা নাকি দুটো গুলি পেয়েছ রিভলবারে। তাই না?
-হ্যাঁ। চারটে খরচ হয়েছে।
–তা হলে দুটো খরচ হয়েছে গোপনে টার্গেট প্র্যাকটিসে। একটা খরচ হয়েছে পরমেশবাবুকে মারতে। আরেকটা কিনুকে মারতে। কিনু পাগলার মুখ বন্ধ করার জন্য তাকে মারা হয়েছে।
অরুণ টয় রিভলবারটা দেখতে দেখতে বলল, -কী আশ্চর্য। এটা ঠিক ওই আসল অস্ত্রটার হুবহু নকল।
–হ্যাঁ, নকল। লোকেরা এই টয় অস্ত্রটায় দেখেছে কিনু পাগলার হাতে। তার মানে, খুনি তাকে এটা দিয়ে বলেছিল, হট্টগোল বাধলে সে যেন এটা তুলে গুলি ছোঁড়ার ভান করে। পাগলা মানুষ। তাই খুব মজা পেয়েছিল কাজটা করতে। কিন্তু সে জানত না, এটা একটা বিপজ্জনক ফাঁদ। খুনি তার চেনা। তাই তার মুখ বন্ধ করতে তাকে মারা হয়েছে। পয়েন্টটা তুমি বুঝে দ্যাখো অরুণ। একজন পাগলের গুলিতে পরমেশবাবু মারা পড়তে পারেন, এটা তোমরা সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না। খুঁটিয়ে তদন্ত করবে। তাই ধূর্ত খুনি পাগলকেও মেরেছে।
অরুণ গম্ভীর মুখে বলল, -হ্যাঁ। মেরে ভিড়ের সুযোগে খুনি কিনু পাগলের হাতের টয় রিভলবারটা নিয়ে আসল রিভলবারটা গুঁজে দিয়েছে। টয় রিভলবারটা ড্রেনে ফেলে দিয়েছে।
এবার দৈনিক সত্যসেবকের ফোটোগ্রাফার প্রচেত রায়ের মৃত্যুর ঘটনাটা বললাম অরুণকে। শুনে অরুণ খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল। তাকে পরমেশবাবুর পি. এ. তারকবাবুর কথাও বললাম।
মঙ্গল চৌকিদার এতক্ষণে কফি আনল। সে দাঁড়িয়ে কথা শুনবে ভাবছিল হয়তো। অরুণ তাকে। ধমক দিয়ে চলে যেতে বলল। সে উদ্বিগ্ন মুখে বাংলোর কিচেনে চলে গেল।
অরুণ বলল, –আমোনিয়ান গির্জা আমি দেখেছি। পাশে একটা কবরখানা আছে। ওখানে প্রচেতবাবু অত রাত্রে গেলেন কেন?
খুনি তার চেনা। খুনি তাকে কোনও অজুহাত দেখিয়ে ওই নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া কোনও ব্যাখ্যা হয় না। কারণ অচেনা লোকের সঙ্গে প্রচেত ওখানে যাবে কেন? তাছাড়া চেনা বলেই প্রচেতের ক্যামেরা ছিনতাই করতে পারেনি খুনি।
-তার মানে, খুনি চন্দ্রপুর থেকে প্রচেতবাবুর সঙ্গে কলকাতা গিয়েছিল।
–দ্যাটস রাইট ডার্লিং।
অরুণ কিছুক্ষণ কফিপানের পর বলল, -হাতুড়ি দিয়ে মেরে খুন করেছে প্রচেতবাবুকে?
-হ্যাঁ। সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীকে তো তুমি চেনো। সে তা-ই জানাল। মর্গের রিপোর্টে নাকি বলা হয়েছে।
অরুণ আবার বলল, -হাতুড়ি?
মাথা দোলালাম। বললাম, -কোনও সূত্র খুঁজে পাচ্ছ কী?
পাচ্ছি। -বলে অরুণ উঠে দাঁড়াল : আমার সঙ্গে বেরুতে আপত্তি আছে?
–নাহ।
তা হলে আসুন। ….
অরুণের জিপ থানাচত্বরে ঢুকল।
অফিসার-ইন-চার্জ পুলকেশ দে-র সঙ্গে অরুণ আমার পরিচয় করিয়ে দিল। পুলকেশবাবু গোগ্রাসে এবং বিস্ময়ে বললেন, আপনার মতো প্রখ্যাত মানুষের পায়ের ধুলো পড়বে এখানে, কল্পনাও করিনি কর্নেলসায়েব। আশা করি, পরমেশবাবুর হত্যারহস্য সমাধান আপনার আগমন? তা যদি হয়, আপনার সঙ্গে সহযোগিতায় আমরা তৈরি।
অরুণ বলল, -মি. দে আজ সকালে আমার সামনে বস্তির এক বুড়িমা একটা ডায়রি করতে এসেছিল। তাকে কোনও দজ্জাল গিন্নি নাকি ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে।
-পুলকেশবাবু হাসলেন, -সামান্য একটা কয়লাভাঙা হাতুড়ি হারিয়ে গণ্ডগোল। তো এই তুচ্ছ। ব্যাপারে ডায়রি কী হবে? গিন্নি মহিলাকে ডেকে পাঠিয়ে একটু বকাবকি করলাম। মহিলা বললেন, –ভুল হয়েছে। মিটমাট করে দিন। বরং পঞ্চাশ টাকা ওকে দিচ্ছি, ওটাই ওর মাইনে। তা-ই দিচ্ছি। আমি টাকাটা দিয়ে বুড়িকে দিলাম। মিটে গেল। কিন্তু কেন
অরুণ বলল, -কারণ আছে। গিন্নি মহিলার নাম কী?
ডায়রি বইয়ের পাতা উলটে দেখে পুলকেশবাবু বললেন, -সুপ্রভা রায়। স্টেশনের কাছে তিলেপাড়ায় বাড়ি। স্বামীর নাম
আমি বললাম, -তারক রায় কি?
পুলকেশবাবু অবাক হয়ে বললেন, -হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটা কী?
বললাম, এখনই তারক রায়কে পরমেশবাবু এবং কিনু পাগলাকে খুনের দায়ে গ্রেফতার করুন। তারপর গ্রেফতার করুন অভয় হাজরাকে। তার প্ররোচনায় এই হত্যাকাণ্ড।
অরুণ উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়াল।
বলল, -পরমেশবাবুর কারখানা বন্ধ হওয়ায় তারক রায় ঠিকমতো মাইনে পাচ্ছিলেন না শুনেছি। পরমেশবাবু জনপ্রিয় লোক। অভয় হাজরাই তার কারখানা বন্ধের জন্য দায়ী। তাই মরিয়া হয়ে তাকে ঢিট করতে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, অভয় হাজরার টাকা খেয়ে তারক রায় এই খুনখারাপি করেছেন।
