আমি একটা জিনিস খুঁজছিলাম ড্রেনে। চমকে উঠে দেখলাম সেটা আছে। এঁটো শালপাতার স্কুপের পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে। পেছন দিকে খেলার মাঠ। সেই মুহূর্তে একটা ফুটবল এসে পড়ল সেখানে। চমৎকার সুযোগ পেলাম কুড়িয়ে নেওয়ার। ছেলেগুলো আসার আগেই ফুটবলটা তুলে ছুঁড়ে দিলাম ওদের দিকে। সেই ফাঁকে জিনিসটাও তুলে নিলাম।
জিনিসটা একটা খেলনার রিভলবার। শালপাতায় জড়িয়ে নিলাম। যেন পাশের মাছের বাজার থেকে মাছ কিনেছি।
এবার রিকশা করে বাংলোয় ফিরে টয় রিভলবারটা বেসিনে রগড়ে ধুয়ে ফেললাম। জানতাম, এমন একটা জিনিস ঘটনাস্থলের আশেপাশে পড়ে থাকার কথা। ওটা কিটব্যাগে রেখে চৌকিদারকে কফি করতে বললাম। গঙ্গার ধারের লনের চেয়ারে বসে গঙ্গা দেখতে থাকলাম। সূর্যাস্তকালে গঙ্গার জলে শেষ আলোর খেলার কোনও তুলনা হয় না। একটু পরে চৌকিদার কফি আনল।
সে কফির পট পেয়ালাসমেত ট্রেতে বেতের টেবিলের ওপর বিনীতভাবে রাখল! তারপর একটু তফাতে দাঁড়িয়ে রইল। বললাম, কিছু বলবে তুমি?
চৌকিদার কাঁচুমাচু হেসে বলল, না স্যার। কফি কেমন হয়েছে দেখুন। খারাপ হলে আবার তৈরি করব।
চুমুক দিয়ে বললাম, ফার্স্টক্লাস হয়েছে। তোমার নাম কী?
–আজ্ঞে মঙ্গল।
–গতকাল নাকি চন্দ্রপুরে একটা খুনোখুনি হয়েছে?
মঙ্গল গল্পটা বলার জন্য ঘাসে বসল। সে ইনিয়েবিনিয়ে পরমেশবাবুর বোকামির কথা শোনাল। তার মতে, অভয় হাজরার দলবল আছে। তিনি ট্রেড ইউনিয়নও করেন। তিনি এখানকার কলকারখানা বন্ধের মূলে। তার বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়ানো ঠিক হয়নি পরমেশবাবুর। ওঁর বালবের কারখানাও তত বন্ধ করতে বাধ্য করেছেন অভয় হাজরা। আসলে ভোটে জিতে অভয়বাবু মন্ত্রী হবেন সম্ভবত। তারপর সব কারখানা খোলার ব্যবস্থা করবেন। কলকাঠিটা তারই হাতে। তার মতো লোকের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাধ্য কার? পুলিশও তো তার কেনা।
বললাম, -শুনলাম কে এক কিনু পাগলা পরমেশবাবুকে গুলি করেছে?
মঙ্গল খিকখিক করে হাসল, -এ স্যার পরের হাতে হুঁকো খাওয়া। পাগলা লোক। তাকে বন্দুকপিস্তল দিয়ে যাকে গুলি করতে বলবে, সে তাকেই গুলি করবে। পাগলের কি জ্ঞানবুদ্ধি আছে?
–কিন্তু কিনু পাগলাকেও কে গুলি করে মারল?
মঙ্গল এদিক ওদিক দেখে চাপা গলায় বলল, -পাগলা মুখ ফসকে যদি বলে ফেলে কে তাকে পিস্তল দিয়েছে, তা-ই তাকেও ভিড়ের হট্টগোলের ফাঁকে মেরে ফেলেছে।
-পিস্তল না রিভলবার?
–ওই হল স্যার। মানুষ মারা কল তো বটেই।
–আচ্ছা মঙ্গল, সভায় তখন নাকি কারা হাঙ্গামা হইচই বাধিয়েছিল। ধরো, কথার কথাই বলছি, সেই সুযোগে কিনুর বদলে কিনুর খুনিই তো পরমেশবাবুকে মারতে পারত। কিনুকে খুন করার দরকারই হতো না।
মঙ্গল একটু ভেবে নিয়ে বলল, -তা ঠিক স্যার। তবে
সে হঠাৎ চুপ করলে বললাম, -তবে?
মঙ্গল চাপাস্বরে বলল, ফোটো তুলছিলেন এক ভদ্রলোক। ফোটোতে খুনির ছবি উঠে যেত।
-তুমি ছিলে সভায়?
–ছিলাম স্যার।
–ফোটো তুলতে দেখেছিলে?
হ্যাঁ। বার বার ঝিলিক মেরে ফটো তুলছিলেন। কিন্তু পাগলাকে পিস্তল তুলে গুলি ছুঁড়তেও দেখেছিলাম।
সন্ধ্যায় আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। মঙ্গল আলো জ্বালতে চলে গেল। আমার থিওরির সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়ে যাচ্ছে ঘটনাগুলো। ফোটোতে খুনির ছবি উঠেছে, এই আশঙ্কায় ফোটোগ্রাফার প্রচেতকে ওইভাবে মারতে হয়েছে। তাকে অনুসরণ করে কলকাতা গেছে খুনি। তার সঙ্গে ভাব জমিয়েছে। তাকে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে। কিন্তু ক্যামেরা ছিনতাই করলেই তো হতো। কেন ক্যামেরা ছিনতাই করেনি? এদিকে চৌকিদার মঙ্গল কিনু পাগলাকে গুলি ছুঁড়তে দেখেছে। ….
চন্দ্রপুর থানার ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর অরুণ মজুমদার আমার পরিচিত। বাংলো থেকে তাকে টেলিফোন করলাম। অরুণবাবু বললেন, -হাই ওল্ড বস! সত্যিই কি আপনি নাকি কোনও
ডার্লিং! আমিই বটে।
-হাঃহাঃহাঃ। দ্যাটস রাইট। ডার্লিং সম্ভাষণ এই সমগ্র পৃথিবীতে একজনের মুখেই মানায়। তা হঠাৎ এখানে আপনি কি নিছক প্রজাপতি ধরতে ছুটে এসেছেন?
-বলতে পার। তবে এখানকার প্রজাপতি বর্ণচোরা।
–কর্নেল। আপনার কথায় রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।
–রহস্য একটু আছে। তুমি চলে এসো।
মিনিট পনেরো পরে অরুণের জিপের আলোয় সেচবাংলো ঝলসে উঠল। তাকে আসতে দেখে মঙ্গল চৌকিদারের মুখে বিস্ময় ও উদ্বেগ ফুটে উঠল। বললাম, মঙ্গল। পটভর্তি কফি আনো শিগগির।
লনে বেতের চেয়ারে বসে অরুণ বলল, -বর্ণচোরা প্রজাপতির কথা শুনেই সন্দেহ হল, আপনি সম্ভবত পরমেশ চক্রবর্তীর মৃত্যুর কেস হাতে নিয়েছেন?
নিয়েছি।
অরুণ একটু হাসল–কিন্তু পরমেশবাবুকে গুলি করে মেরেছে এক বদ্ধ পাগল। আপনি তো জানেন, পাগল অবস্থায় লোকে খুনখারাপি করে। কাজেই পরমেশবাবুকে খুন করা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি না। বরং কিনু পাগলাকে ভিড়ের ভেতর কে গুলি করল সেটাই আসল রহস্য।
-তোমার থিওরি কী এ সম্পর্কে?
-খুনি ভিড়ের ভেতর থেকে গুলি ছুঁড়েছে মঞ্চে পরমেশবাবুকে লক্ষ্য করে। একটা গুলিতে মৃত্যু না হতেও পারে। তাই ভেবে দ্বিতীয়বার গুলি ছুঁড়েছে। দ্বিতীয় গুলিটা লেগেছে কিনু পাগলার মাথার পেছনে।
–কিন্তু লোকে কিনু পাগলাকে রিভলবার তুলে গুলি ছুঁড়তে দেখেছে।
অরুণ আবার হাসতে লাগল, একটা গণ্ডগোল বাধলে লোকেরা তা নিয়ে নানারকম গল্প বানায়। ঘটনার আকস্মিকতায় কী দেখতে কী দেখে।
