বললাম, টার্গেট প্র্যাকটিস করে তিনটে গুলি খরচ করে থাকতে পারে আততায়ী।
-তা পারে। কিন্তু স্যার, আততায়ী লোকটা যে একটা বদ্ধ পাগল।
–পাগল?
–হ্যাঁ স্যার। কিনু পাগলা বলে জানি ওকে। বাসটার্মিনাসে থাকত। রোগা পাঁকাটি শরীর।
–তাকেই তো লোকেরা দেখেছে গুলি ছুঁড়তে?
তারকবাবু শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, -হ্যাঁ। কিন্তু কিনু পাগলাকেই বা কে গুলি করে মারল?
পরমেশবাবুর বডিগার্ড ছিল?
তারকবাবু মাথা নেড়ে বললেন, না স্যার। পরমেশদা জেদি লোক ছিলেন বটে, তবে ওঁর আত্মবিশ্বাস ছিল প্রচণ্ড। নীতিবাগীশ ছিলেন তা-ও বলেছি।
–রিভলবারটা কি কিনু পাগলের হাতে বা হাতের কাছাকাছি পাওয়া গেছে?
তার হাতেই ধরা ছিল স্যার। –
-হাতে ধরা ছিল?
হ্যাঁ। –তারকবাবু আস্তে বললেন, তখন সভায় হইচই বাধিয়েছিল অভয় হাজরার লোকেরা। ভিড় আর হট্টগোলের মধ্যে হঠাৎ খুনোখুনি। কাজেই
তারকবাবু হঠাৎ চুপ করলে বললাম, –তখন সময় কটা?
–বিকেল পাঁচটা সওয়া পাঁচটা। জায়গাটা একটা চৌমাথা। এমনিতেই ভিড় থাকে সারাক্ষণ।
–মঞ্চে কে-কে ছিলেন মনে পড়ছে?
–আমি, পরমেশদা, প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার রমেশবাবু এবং জনা দুই সাংবাদিক। একজন স্থানীয়, অন্যজন কলকাতার। পরমেশদা আমাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। ওঁদের যাতায়াতের ভাড়াও দিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতার কোনও কাগজ পাত্তা দেয়নি। শুধু
দ্রুত বললাম, -দৈনিক সত্যসেবক।
–আজ্ঞে হ্যাঁ। তা-ও যাঁর যাওয়ার কথা তিনি যাননি। গিয়েছিলেন একজন ফোটোগ্রাফার। পরমেশদা তাতেই খুশি। ছবি বেরুলে বেশি পাবলিসিটি হবে খবরের চেয়ে।
ষষ্ঠী কফি এনে দিল। বললাম, -কফি খান। আমি যাব চন্দ্রপুরে। তবে কখন যাব, তা বলতে পারছি না।
কফি খেয়ে তারকবাবু ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, আপনি আমার সঙ্গে চলুন। আমার বাড়িতে থাকবেন।
উনি অনেকক্ষণ ধরে খুব সাধাসাধি করতে থাকলেন। বিরক্ত হয়ে বললাম, -সময়মতো যাব। ভাববেন না। …
দুপুরে জয়ন্তকে ফোন করলাম দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসে। ফোন ধরে প্রথমে সে একচোট নিল আমাকে, –আপনার সত্যি ভীমরতি ধরেছে। আপনি এমন একটা সাংঘাতিক রহস্যের কিনারা করলেন না। আর আমার মুখ আপনি দেখতে পারেন না। …ইত্যাদি….।
তাকে মিষ্টি কথায় শান্ত করে বললাম, -তোমার বন্ধু প্রচেতের মর্গের রিপোর্ট পাওয়া গেছে?
-হ্যাঁ। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ফলে মৃত্যু। ক্ষতচিহ্ন চুলের ভেতর পাওয়া গেছে। হাতুড়ির ঘা। বলে সন্দেহ করা হয়েছে।
–ডার্লিং! আজ তোমাদের কাগজে চন্দ্রপুরের খুনোখুনির খবর পড়েছ?
-পড়েছি। মাই গুডনেস! প্রচেত গতকাল চন্দ্রপুরে নিউজ ফোটো আনতে গিয়েছিল। রিপোর্টার অশনির যাওয়ার কথা ছিল। যায়নি।
-অশনি আছে? ওকে ফোন দাও।
–কী ব্যাপার?
–আহা, দাও না ওকে।
একটু পরে অশনি গুপ্তের সাড়া পেলাম, হ্যালো ওল্ড ডাভ। আমাকে ফাঁসাবেন নাকি?
-না, না। শোনো অশনি। চন্দ্রপুরে পরমেশবাবুর সভার নেমন্তন্ন মিস করলে কেন? তোমাকে। তো রাহাখরচ দিয়েছিলেন ওঁর পি. এ তারকবাবু।
সর্বনাশ! সর্বনাশ! আপনি সত্যিই দেখছি অন্তর্যামী।
-প্লিজ আনসার মাই কোয়েশ্চন, ডার্লিং।
–আসলে শেষ মুহূর্তে চিফ রিপোর্টার আমাকে অন্য একটা অ্যাসাইনমেন্টে পাঠিয়েছিলেন। এদিকে চন্দ্রপুরে কয়েকটা কল-কারখানা বন্ধের খবর আছে। ক্লোজার নামে একটা ফিচার বেরুবে সত্যসেবক পত্রিকা। তাই চিফ রিপোর্টার প্রচেতকেই যেতে বলেছিলেন। বন্ধ কলকারখানার ছবি তুলে আনাই ওকে পাঠানোর আসল উদ্দেশ্য ছিল। আপনি চিফ রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন।
-থাক। তুমি জয়ন্তকে দাও।
জয়ন্ত ফোন ধরে বলল, -বস! আপনি হঠাৎ ইন্টারেস্টেড হয়ে উঠলেন যে?
–জয়ন্ত, আমার সঙ্গে চন্দ্রপুর যেতে হবে তোমাকে।
–মাথা খারাপ? আমাকে ইভনিং ফ্লাইটে দিল্লি যেতে হচ্ছে। সরি কর্নেল!
–আর কিছু ইনফরমেশন পুলিশের কাছে জেনেছ?
–আর কিছু-হ্যাঁ, চেতের ক্যামেরা হারায়নি। কিন্তু ভেতরে ফিল্ম রোলটা নেই। অফিসে বলেছিল, রোলটা শেষ হয়নি।
–ফিল্ম রোল নেই?
-নাহ। ক্যামেরা খালি। আপনাকে অত করে অনুরোধ করলাম, আপনি গেলেন না। কী মিস্ট্রি হেলায় হারালেন বুঝুন।
ফোনে কলকাতার সেচ দপ্তরের এক কর্তাব্যক্তিকে বলে চন্দ্রপুরে ওঁদের বাংলো বুক করেছিলাম। বিকেল পাঁচটা নাগাদ ট্রেনে পৌঁছে পোঁছে সাইকেল রিকশায় বাংলোয় পৌঁছলাম। খুশি হলাম দেখে যে, ট্রাংককলে চৌকিদারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি আসছি। গঙ্গার ধারে একটা খালের মুখে বাংলো। নিসর্গদৃশ্য সুন্দর। চন্দ্রপুরের বসতি এলাকার বাইরে হওয়ায় নিরিবিলি পরিবেশ। জানলা থেকে কিছুক্ষণ বাইনোকুলারে পাখি দেখলাম। গঙ্গার ধারে ঝোপেঝাড়ে প্রজাপতি খুঁজলাম। মোটে দুটো দেখা গেল। তা-ও নিছক সাধারণ প্রজাতির প্রজাপতি।
কফি খেয়ে পায়ে হেঁটে বেরোলাম। চন্দ্রপুরের বাজারে সেই চৌমাথায় পৌঁছেছি, তখনও যথেষ্ট আলো আছে দিনের। ভিড়-ভাট্টা, রকমারি যানবাহন, খুব হই-হট্টগোল।
রাস্তার ওধারে একটা ড্রেন। আবর্জনা আর পচা পাঁক থিকথিক করছে।
আমার স্বভাব হল, সব রহস্যের ক্ষেত্রে একটা থিওরি খাড়া করে নিই। তারপর তথ্য সংগ্রহে পা বাড়াই। তথ্য না পেলে থিওরিটা বাতিল করে আরেকটা থিওরি সাজাই।
