নিজস্ব সংবাদদাতার খবর খবরটা সংক্ষেপে এই :
শিল্পনগরী চন্দ্রপুর বিধাননগর আসনটি বিধায়ক রামহরি ব্যানার্জির মৃত্যুতে খালি হয়েছিল। তাই উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভোট গ্রহণের তারিখ দোসরা জুন। নির্দল প্রার্থী পরমেশ চক্রবর্তী গতকাল বিকেলে চৌমাথায় জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। তখন হঠাৎ কারা সভায় হইহল্লা শুরু করে। মাইকের তার কেটে দেয়। পটকা ফাটায়। এই বিশৃংখলার সময় এক বৃদ্ধ উন্মাদ ব্যক্তির রিভলভারের গুলিতে পরমেশবাবুর মৃত্যু হয়। কিন্তু তারপরই সেই উন্মাদ আততায়ীকে কেউ মাথার পিছনে গুলি করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা উন্মাদ লোকটিকে পরমেশবাবুকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়তে দেখেছেন। কিন্তু সেই উন্মাদের আততায়ীকে কেউ দেখেন নি। তাই প্রথমে সবার ধারণা হয়েছিল, পরমেশবাবুকে মেরে উন্মাদ আততায়ী আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু কেউ নিজের মাথার ঠিক পেছনে এভাবে গুলি ছুঁড়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। ঘটনাস্থলে পরপর দুবার গুলির শব্দ শোনা গেছে। ….
খবরটা পড়ে মনে হল, উন্মাদ আততায়ীকে যে মেরেছে সে পরমেশবাবুর বডিগার্ড হতেও তো পারে। কিন্তু সংবাদদাতা সে-কথা উল্লেখ করেননি। বিশেষ কোনও পয়েন্টও খবরে নেই। আসলে খবর লেখার কাজটা যেমন তেমন দায়সারাভাবে করা হয় আমাদের দেশে।
আবার খুঁটিয়ে পড়লাম। তারপর মনে হল, পরমেশবাবুর কোনও বডিগার্ড থাকলে এতে কোনও রহস্য নেই, কিন্তু বডিগার্ড না থাকলে?
না থাকলে যে লোকটি আততায়ীকে মেরেছে, সে যদি পরমেশবাবুর শত্রুপক্ষের লোক হয়, তাহলে সে নিজেই তো পরমেশবাবুকে মারতে পারত।
হ্যাঁ, মারতে পারত। কিন্তু তার ধরা পড়ার চান্স ছিল। মঞ্চে পরমেশবাবু ভাষণ দিচ্ছিলেন। তার আততায়ী মঞ্চে ওঠেনি। নিচে থেকে গুলি করে। হইচই বেধেছিল মঞ্চের নিচে।
উঁচু জায়গা এবং নিচু জায়গা এক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। নিচের কাউকে হট্টগোলের মধ্যে ভিড়ের ভেতর মাথার পেছনে আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঠেকিয়ে গুলি করলে দ্বিতীয় আততায়ীকে কারও দেখতে না পাওয়াই সম্ভব। এদিকে পরমেশবাবুর বডিগার্ড থাকলে সে পরমেশবাবুর কাছে মঞ্চের ওপরই থাকবে।
আর একটা কথা : পরপর দুবার গুলির শব্দ এবং দুটি মৃত্যু।
এতক্ষণে হাইরাইজ বাড়ির ওপর সুর্য উঁকি দিচ্ছে। ক্যামেরায় একিনোক্যাকটাস গ্রুসিনির অসামান্য সুন্দর ফুলগুলোর ছবি তুলতে মন দিলাম। …..
ব্রেকফাস্টের পর ড্রয়িং রুমে বসে প্রখ্যাত মার্কিন পত্রিকা নেচার-এর পাতা ওলটাচ্ছি এমন সময় এক ভদ্রলোক এলেন। নমস্কার করে বললেন, আপনিই কি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার?
বললাম, -আপনার সন্দেহের কোনও কারণ আছে?
ভদ্রলোক একটু বিব্রত হয়ে বললেন, -না-মানে, কাগজে আপনার অনেক কীর্তিকলাপ পড়েছি। তাই বলছিলাম
তার কথার ওপর হাসতে হাসতে বললাম, -ভেবেছিলেন আমি যুবক। কিন্তু চোখে দেখছেন আমিও নেহাত বুড়োমানুষ। মুখে সাদা দাড়ি এবং মাথায় টাক। তাই ভাবছেন, এই বুড়ো লোকটি কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ঠাকুর্দা!
আমার কৌতুকে ভদ্রলোক আরও বিব্রত হয়ে বললেন, -না মানে……
–আপনার পরিচয় দিন এবার। তারপর বলুন কেন এসেছেন?
ভদ্রলোক এতক্ষণে বসলেন। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। বেশ শক্তসমর্থ গড়নের মানুষ। হাতে একটা ব্রিফকেস। বললেন, –আমার নাম তারক রায়। আসছি চন্দ্রপুর থেকে।
–চন্দ্রপুর। মানে, গতকাল যেখানে ভোটের নির্দল প্রাথী পরমেশ চক্রবর্তী খুন হয়েছেন?
তারকবাবু বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি পরমেশবাবুর প্রাইভেট সেক্রেটারি। পরমেশবাবুর একটা ইলেকট্রিক বালব তৈরির কারখানা ছিল। কারখানা ভালো চলছিল না। ওঁর চন্দ্রা বালব মার্কেট পায়নি। তাই উনি রাজনীতি করতে নামেন। কিন্তু বড় স্পষ্টভাষী মানুষ। প্রচণ্ড নীতিবাগীশ। তাই কোনও রাজনৈতিক দলে পাত্তা পাননি। অগত্যা নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়ান।
কথা বাড়ছে দেখে বললাম- সংক্ষেপে বলুন, কেন এসেছেন আমার কাছে?
তারকবাবু কুণ্ঠিতভাবে বললেন, -ব্যাপারটা
একটু আশ্চর্য মনে হয়েছে আমার। গতকাল বিকেলে মিটিঙে ওঁকে গুলি করে মারা হয়েছে। কাগজে খবর দেখে থাকবেন। কিন্তু গতকাল সকালে উনি আমাকে কথায়-কথায় হঠাৎ বললেন, –তারক। আমার মনে হচ্ছে, আমার কোনও সাংঘাতিক বিপদ হতে পারে। কিন্তু ভোটে যখন দাঁড়িয়েছি এবং নমিনেশন প্রত্যাহারের তারিখ পেরিয়ে গেছে, তখন আর পিছু হটছি না। যা থাকে বরাতে লড়ব। তবে যদি আমার কোনও বিপদ হয়, তুমি জানবে তার জন্য দায়ী কিষান-মজদুর-পার্টির নেতা অভয় হাজরা। সে আমাকে শাসিয়েছে। তো বিকেলে পরমেশদা মারা পড়লেন। আমি পুলিশকে কথাটা বললাম। পুলিশ বলল, বিনা প্রমাণে অভয় হাজরার মতো ভি. আই. পি-কে আসামি করতে পারব না। বুঝতেই তো পারছেন স্যার, হাজরাবাবুর প্রতিপত্তি আছে। তাই আমি আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।
এ পর্যন্ত শুনে আমি বললাম, আমাকে কি প্রাইভেট গোয়েন্দা ভেবেছেন? দেখুন তারকবাবু আমি ঠিক সে রকম গোয়েন্দা নই। তবে হ্যাঁ, রহস্যের প্রতি আমার একটা আকর্ষণ আছে। কিন্তু আপনার এই কেসে আমি কোনও রহস্য দেখছি না।
তারকাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, -রহস্য যে একেবারে নেই, তা নয়। আততায়ীর রিভলবারটা পাওয়া গেছে ঘটনাস্থলে। পুলিশ দেখেছে তাতে মোটে দুটো গুলি ভরা আছে। চারটে গুলি খরচ হয়েছে। এর মধ্যে একটা গুলি পরমেশবাবুর হার্টে বিঁধেছে। আর তিনটে গুলি কী হল?
