সেলিম বলল, গদাই যে বলল জুতো চুরি করে একটু তামাশা করবে। বলল, এসো না, আমরা জুতো লুকিয়ে রাখব সাতবুড়ুয়ার। ওরা আমাদের খুঁজে হন্যে হোক না, পরে দুজনে টুকি দেব। ব্যস! লুকোচুরি খেলাটা দারুণ জমে উঠবে। তুইতো জানিস, গদাইদা আবদুলের চাইতেও মজার লোক।
মজার লোক শানু বিরক্ত হয়ে বলল। চোর তা জানিস না?
সেলিম বলল, কে জানে যে ওখানে গিয়ে হঠাৎ কালো জিনের পাল্লায় পড়ব।
শানু হাসল, তুই তাহলে এতক্ষণ কী শুনলি? ও তো গোখরো-পাঠান।
এইসময় কর্নেল বেরিয়ে এসে ডাকলেন, সেলিম, শানু আজও কী তোমাদের স্কুলের ছুটি?
সেলিম বলল, আজ আমাকে স্কুলে যেতে বারণ করেছেন দাদু।
শানু বলল, আজ আমারও স্কুল যেতে ইচ্ছে করছে না।
কর্নেল বললেন, তাহলে চলে এসো। আজ বরং সাতবুড়ুয়ার জঙ্গলেই প্রজাপতি ধরতে যাই। চাই কী, গুপ্তধনও আবিষ্কার করে ফেলতে পারি। চলে এসো, ডার্লিংস! ·
দুই বন্ধু কর্নেলের সঙ্গে গল্প করতে করতে সাতবুড়ুয়ার জঙ্গলের দিকে চলল।
২.১৩ কর্নেলের জার্নাল থেকে-১
ভোর ছটায় ছাদের শূন্যোদ্যানে গিয়ে দেখলাম, অ্যারিজোনা থেকে আনা ক্যাক্টিতে সুন্দর কিছু ফুল ফুটেছে। আনন্দে অস্থির হয়ে উঠলাম। প্রায় চার মাসের সাধনার সিদ্ধি। বুড়ো না হলে ধেই-ধেই করে না হোক, ব্রেড্যান্স শুরু করে দিতাম। এই প্রজাতির ক্যাকটাসের নাম একিনোক্যাকটাস গ্রুসিনি। দেখতে কতকটা গোল কাঁঠালের মতো। গ্রীষ্মে একছিটে বৃষ্টি হলে ফুল শিগগির ফুটে ওঠে। লাল টুকটুকে পাপড়ির মধ্যে হলুদ শীষ। শীষের মাথায় কালচে টুপি। হাঁটু মুড়ে বসে আতসকাচ দিয়ে পাপড়ির কিনারা পরীক্ষা করতে থাকলাম। অ্যারিজোনার রাজধানী ফিনিক্সে হর্টিকালচার ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর ডাঃ মিডলটন বলেছিলেন–পাপড়ির কিনারায় যদি সূক্ষ্ম ভাজ পড়ে, তা হলে জানবেন ভাইরাস সংক্রামিত হয়েছে।
অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে তেমন কিছু দেখতে পেলাম না। মনটা আরও খুশিতে ভরে উঠল। সূর্য। উঠলেই কয়েকটা ফোটো নিতে হবে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ। সূর্য উঠলেও পূর্বের কয়েকটা হাইরাইজ বাড়ির জন্য বরাদুর পৌঁছুতে দেরি হয়। বিষদৃষ্টিতে বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি,
এমন সময় ষষ্ঠী এসে বলল, -বাবামশাই! ফোং!
বিরক্ত হয়ে বললাম, -হতভাগা! তোকে কতদিন না বলেছি, দুটো থেকে আটটার মধ্যে কেউ টেলিফোন করলে বলবি আমি বাড়ি নেই?
ষষ্ঠী কাঁচুমাচু মুখে বলল-সে ফোং নয় বাবামশাই, জয়ন্ত দাদাবাবু ফোং।
-ওকে আসতে বলে দে।
বললাম তো। কিন্তু দাদাবাবু ফোং।
এই সাতসকালে কার মৃত্যু সংবাদ দিতে জয়ন্ত ফোন করেছে? নিছক মৃত্যু হলে কেনই বা ফোন করবে। খুনখারাপি নয় তো?
ড্রয়িংরুমে নেমে এসে ফোন ধরে বললাম, -গুড মর্নিং, ডার্লিং।
-ব্যাড মনিং, ওল্ড বস!
–সরি জয়ন্ত। সকালবেলাটা ব্যাড করে দিও না। তুমি কোথা থেকে ফোন করছ?
-আর্মেনিয়ান চার্চের কাছে এক বন্ধুর বাড়ি থেকে। আপনি এখনই চলে আসুন। পুলিশ এসে গেছে। পুলিশকে এখনই বডি না নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছি
-বডি? কার বডি?
–আমাদের কাগজের একজন ফোটোগ্রাফার ছিলেন। নাম শুনে থাকবেন। প্রচেত রায়। বয়সে খোকা বললেই চলে।
-তা খোকাটির বডি পড়ল কী করে?
-ওঃ কর্নেল। হি ওয়াজ সিরিয়াস। গত রাত্তিরে দশটা নাগাদ প্রচেত দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিস থেকে বের হয়। রাত্তিরে বাড়ি ফেরেনি। ভোরবেলা চার্চের পেছন দিকে একটা পোড়ো বাড়ির ভেতর ওকে মরে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকেরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ ওর পকেটে আইডেন্টিটি কার্ড দেখে অফিসে ফোন করে। অফিসের দারোয়ান আমাকে ফোন করে। কারণ ক্রাইম স্টোরি আমি কভার করি। তো—
প্রচেত রায়ের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে কী?
হয়েছে। তবে প্রচেতের দাদা-বউদি ছাড়া আর কেউ নেই। ও দাদার কাছে থাকত।
–জয়ন্ত, আমি গিয়ে কী করব?
–কর্নেল! আপনি এলেই বুঝতে পারবেন, ব্যাপারটা রহস্যজনক।
–একটু আভাস দাও।
–বডিতে কোনও ক্ষতচিহ্ন নেই।
–তাহলে হার্ট অ্যাটাক।
–ঠিক আছে। আপনাকে আসতে হবে না।
জয়ন্ত ফোন ছেড়ে দিল। বুঝলাম, আমার ওপর চটে গেছে। কিন্তু ও তো জানে, আমি নিছক শখের গোয়েন্দা নই। যততত্র কারও লাশ পড়লেই আমি নাক গলাতে যাই না। আসলে জয়ন্ত তার অফিসের লোকের এরকম হেলাফেলায় মৃত্যুর ঘটনা বরদাস্ত করতে পারছে না।
কিন্তু সমস্যা হল, জয়ন্তকে আমি পুত্ৰাধিক স্নেহ করি, যদিও আমরা পরস্পর বন্ধু। যুবকের সঙ্গে বৃদ্ধের বন্ধুত্ব হতে তো বাধা নেই। এযাবৎ অসংখ্য রহস্যময় ঘটনায় জয়ন্ত আমার সহকারীর ভূমিকা পালন করেছে। কাজটা বোধহয় ঠিক করলাম না। অন্তত আমার স্নেহ এবং বন্ধুত্বের খাতিরে ওর ডাকে সাড়া দেওয়া উচিত ছিল।
দোনমনায় পড়ে গেলাম। একটু পরে না যাওয়াই সাব্যস্ত করলাম। সবখানে গোয়েন্দাগিরি করার মানে হয় না। ইতিমধ্যে এদিককার খবরের কাগজগুলো এসে গেল। ষষ্ঠীকে বললাম, –ছাদে যাচ্ছি। কফি দিয়ে আসবি।
কাগজগুলো নিয়ে ছাদে গেলাম। প্রথমেই দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। প্রথম পাতার একটা বড় খবরে চোখ গেল। ফ্লাগ লাইনে ছাপা হয়েছে :
চন্দ্রপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচন বাতিল।
পাগলের গুলিতে নির্দল প্রার্থী হত।
আততায়ীর গুলিতে পাগলও হত।
