হ্যাঁ, অসম্ভব। তবে–কর্নেল থেমে গেলেন।
জিতেন্দ্রলাল বললেন, তবে কী কর্নেল?
কর্নেল শানুর হাত থেকে তার টর্চটা নিয়ে মাথার ওপর গম্বুজের খোঁদলে আলো ফেললেন। অমনি সবাই চমকে উঠে দেখতে পেলেন, প্রকাণ্ড একটা বাদুড়ের মতো গম্বুজের খোঁদলের একটা খাঁজে দুই পা রেখে ভেতরে ফুঁড়ে আসা একগুচ্ছ শেকড় আঁকড়ে ধরে ঠিক বাদুড়ের মতোই ঝুলে আছে একটা লোক।
দেখামাত্র শানু চেঁচিয়ে উঠল, গোখরো-পাঠান। গোখা-পাঠান।
জিতেন্দ্রনাথ রিভলভার তাক করে বললেন, এই পাজি। নেমে আয়। নইলে গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলব তোকে।
মহিউদ্দিন হাসতে-হাসতে বললেন, ব্যাটাচ্ছেলের বুদ্ধি আছে বটে। আমরা ভাবতেই পারিনি মাথার ওপর
তার কথা শেষ হল না। ধপাস করে প্রচণ্ড শব্দে গোখরা-পাঠান মেঝেয় পড়ে গেল। টর্চের আলোয় দেখা গেল তার মুখের দুপাশে গেঁজলা বেরোচ্ছে। ছটফট করতে করতে বেঁকে গেল তার শরীর। তারপর এক ঝলক রক্ত বেরিয়ে এল নাক-মুখ থেকে। তার শরীরটা আবদুলের মতোই স্থির হয়ে গেল। কর্নেল বললেন, সুইসাইড করল গফুর-ঠান, বলেই ঝুঁকে ওর পায়ের কাছে কী একটা কুড়িয়ে নিলে। শানু জিনিসটা দেখেছিল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই কর্নেল বললেন, হু এটা এক ধরনের ইঞ্জেকশান সিরিঞ্জ। এই দেখুন, দুটো সূক্ষ্ম সূচ আছে যন্ত্রটার মুখে। ভেতরে আছে মারাত্মক সাপের বিষ। আফ্রিকার জঙ্গলে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপ ব্ল্যাক মাম্বার বিষ। ঠিক এরকম একটি সিরিঞ্জ আমি কোডো আইল্যান্ডে দেখেছিলাম। সেও ছিল এক মারাত্মক শপি ক্রিমিনাল। তাকে সবাই বলত ব্ল্যাক মাম্বা!
সি. আই. ডি ইন্সপেক্টর জিতেন্দ্রনাথ আস্তে বললেন, আর একে সবাই বলত, গোখরো-পাঠান।
.
০৬.
পরদিন সকালে মির্জাসায়েবের ড্রইংরুমে বসে কফি খেতে খেতে কথা বলছিলেন মির্জাসায়েব এবং কর্নেল। সেলিমকে সদর হাসপাতালে পাঠানোর দরকার হয়নি। নবাবগঞ্জ হেলথ-সেন্টারেই সে সুস্থ হয়ে উঠেছে। রাত্রেই তাকে বাড়ি আনা হয়েছে। সকালে সে আগের মতো চাঙ্গা। লনে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সে শানুর সঙ্গে গল্প করছে। তবে তার হাতের কবজি আর পায়ের গোড়ালির ওপর দড়ির দাগগুলো এখনও স্পষ্ট।
কর্নেল বললেন, আবদুল মরার সময় সা-সা বলেছিল। আমরা ভেবেছিলাম সে সাপের কামড়ের কথা বলছে। আসলে সে সাতবুড়ুয়ার কথাই বলতে চেয়েছিল। স্মিথের বইতে দেখলাম, ওটা সপ্তশিবের মন্দির নয়। সপ্তবুদ্ধ মন্দির। অন্তত তেরো-চোদ্দশ বছর আগে ওখানে ছিল সপ্তবুদ্ধ মন্দির। ওই সপ্তযুদ্ধ শব্দ পরবর্তী যুগে লোকের মুখে সপ্তযুদ্ধ থেকে অপভ্রংশে সাতবুড়ো বা স্থানীয় ভাষারীতিতে সাতবুড়ুয়া হয়ে গেছে।
মির্জাসায়েব বললেন, হ্যাঁ। বুদ্ধমন্দিরকে শিবমন্দির বলে পরবর্তী যুগে মনে করা হতো-ইতিহাসের কেতাবে পড়েছি। বুদ্ধমূর্তিকেও শিবমূর্তি মনে করা হয় বহু জায়গায়। কিন্তু আপনি কেমন করে জানলেন?-কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, মকবুল ও শানুর মুখে সাতবুড়ুয়া কথাটা শুনেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়েছিল, আবদুলের এই মোহরের উলটো পিঠে ফার্সিতে লেখা আছে :
সাত বৃদ্ধ যেখানে/মানিক ফলে সেখানে।
তখনই সন্দেহ হয়েছিল এটা একটা সংকেতবাক্য। সাতবুড়ুয়ার ওখানেই কোথাও পনেরো শতকের ঐতিহাসিক তুর্কি আমলের শাসক খানখানান লতিফ খান বহু ধনরত্ন লুকিয়ে রেখেছিলেন। কী? আতশকাচে মোহরটা পরীক্ষা করার সময় ফার্সি প্রবচনের নিচে সাতটা গোল চিহ্ন চোখে পড়েছিল। একটা গোল চিহ্ন কেন্দ্রে খোদাই করা। তার মধ্যে একটা ক্রসের চিহ্ন। লতিফ খান। গৌড়ের বাদশাহের অধীনে শাসনকর্তা ছিলেন। পাছে বাদশাহ তার ধনরত্ন আটক করেন, সেই ভয়ে তিনি স্তূপাকৃতি সপ্তবুদ্ধস্তূপের মূল স্তূপটির তলায় সেগুলি পুঁতে রেখেছিলেন বলেই আমার ধারণা।
মির্জাসায়েব বললেন, কিন্তু সেখানে তো এখন বটগাছ। স্তূপের চিহ্নই নেই।
কর্নেল বললেন, কলকাতায় ফিরে কেন্দ্রীয় প্রত্ন দফতরের কর্তাদের খবরটা দেব। তারা গাছটা কেটে খোঁড়াখুঁড়ি করে খুঁজে দেখুন সত্যি মাটির তলায় গুপ্তধন আছে না কি।
মির্জাসায়েব নড়ে বসলেন, বুড়ো হয়ে স্মৃতিভ্রংশ ঘটেছে। ওখানে নাকি অনেকে মোহর কুড়িয়ে পেত শুনেছি। কিন্তু আবদুল কোথায় পেল এই মোহর?
কর্নেল বললেন এটাই মূল মোহর, যাতে লতিফ খান বংশধরদের জন্য সংকেতবাক্য আর সংকেতচিহ্ন খোদাই করেছিলেন। আমার ধারণা, আবদুল সম্ভবত লতিফ খানেরই বংশধর।
মির্জাসায়েব গম্ভীর হয়ে বললেন, আমরাই নাকি তার বংশধর। আবদুল কেমন করে–উহঁ। অসম্ভব।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, মির্জাসায়েব। একই মানুষের বংশধর কত জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ক্রমশ। আপনি কি জানেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার মেয়ের বংশধরদের একজন ছিলেন হাওড়া রেলস্টেশনের সাধারণ কর্মী, আর একজন খাটালের গোরু-মোষের দুধ বেচতেন, অন্য একজন। ঘোড়াগাড়ির কোচোয়ান ছিলেন? এ গল্প নয়, গবেষকরাই খুঁজে বের করে গেছেন। কাজেই আপনার মতো আবদুল বেচারাও খানখানান লতিফ খানের বংশধর হবে, তাতে অসম্ভব কিছু নেই।
মির্জাসায়েব শুধু বললেন, আপশোস। হতভাগা আবদুল। তাঁর চোখের কোনায় একফোঁটা জল দেখা যাচ্ছিল।
শানু বলল, তুই কী বোকা বল তো সেলিম। গদাইকে দেখেই তুই আমাদের কথা ভুলে, এমনকী জুতোর কথা ভুলে ওর সঙ্গে সাতবুড়ুয়ার জঙ্গলে গিয়ে ঢুকলি!
