কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, সেলিম সুস্থ হলে সেটা জানা যাবে তার মুখ থেকে। তবে গদাইকে তোমারও চেনা উচিত।
শানু দিন শেষের ধূসর আলোয় ঢ্যাঙা লোকটার মুখের দিকে তাকাল। তারপরই সে লাফিয়ে উঠল। মনে পড়েছে, মনে পড়েছে কর্নেল। এ তো সেই গদাই-চোর। রায়বাবুদের বাড়িতে থাকত। টাকা চুরি করে নিপাত্তা হয়েছিল। সম্পর্কে নাকি নুটু রায়মশাইয়ের ভাগ্নে। একবার আমাদের বাড়িও চুরি করতে ঢুকেছিল। ধরা পড়ে—
বাধা দিয়ে গদাই বলল, বাজে কথা বোলো না। আমি গিয়েছিলাম তোমার বাবার কাছে একটা কাজে। খামোকা সন্দেহ করে আমাকে চোর বলে মেরেছিলে তোমরা।
শানু ভেংচি কেটে বলল, শাট আপ। রাত দুটোয় পাঁচিল ডিঙিয়ে বাবার কাছে কাজে গিয়েছিলে? দেব এক খোঁচা পেটে।
শানু সেই বাঁকা ছোরাটা বাগিয়ে খোঁচা মারার ভান করলে গদাই বলল, ওরে বাবা। এ যে দেখছি মহাবিচ্ছু। স্যার, স্যার। দেখছেন আমাকে স্ট্যাব করতে আসছে?
কর্নেল বললেন, চুপ। একটা কথা বললে সত্যি শানু তোমার পেট ফাঁসাবে।
শানু হাসতে হাসতে বলল, আচ্ছা কর্নেল, আপনি করিমদার সঙ্গে সাতবুড়ুয়ার জঙ্গলে কেন এসেছিলেন বললেন না কিন্তু।
কর্নেল বললেন, আমিই একা আসছিলাম ওদিকে। হঠাৎ করিম পিছু ডাকল। ঘুরে দেখি, সে দৌড়ে আসছে। সে এসে তার মামাতো ভাই মকবুলের কাছে শোনা কথাটা বলতে এসেছিল আমাকে। যাই হোক, ওর কথা শোনার পর ভাবলাম, অচেনা জায়গায় যাচ্ছি। করিমকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো। সে স্থানীয় লোক।
শানু কথার ওপর বলল, কিন্তু হঠাৎ সাতবুড়ুয়ায় কেন আসছিলেন?
কর্নেল বললেন, তুমি যেজন্য এসেছিলে, সেজন্যও বটে, তবে তার চেয়ে জরুরি একটা কারণও ছিল। পরে জানতে পারবে। তো, আমি আর করিম বটতলায় পৌঁছে শুনি, খসখস ধুপধুপ শব্দ হচ্ছে কোথায়। দুজনে চুপি-চুপি এগিয়ে গিয়ে দেখি বটগাছটার গুঁড়ির কোটরে পিছু ফিরে এই গদাইচন্দ্র ওই ছোরাটা দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। তার পাশে আমাদের সেই হারানো তিন জোড়া জুতো। বুঝলুম, জুতোগুলো লুকিয়ে ফেলতে চায়। আমি কিছু করার আগেই করিম পা টিপেটিপে এগিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল গদাইয়ের ওপর। তারপর ওর পিঠে বসে বলল, একটা দড়ি হলে ভালো হতো। আমার পকেটে নাইলনের দড়ি থাকে, যখনই জঙ্গলে যাই। গাছ থেকে অর্কিড সংগ্রহ আমার হবি। ফস ছুঁড়ে অর্কিডের ঝাড় টেনে উপড়ে নামাই। এ বয়সে আর যাই পারি, গাছে চড়াটা বরদাস্ত হয় না।
শানু হাসতে লাগল, বুঝেছি। করিমদা একে বেঁধে ফেলল। তারপর আপনি ধোঁয়া দেখতে পেয়ে ওদিকে দৌড়ে গিয়েছিলেন।
কথা বলতে বলতে চষা জমি পেরিয়ে ওঁরা খেলার মাঠে পৌঁছলেন। তখন একদল ছেলে ক্রিকেট খেলে সবে চলে যাচ্ছে। আবছা আঁধার জমে উঠেছে। ছেলেগুলো এদিকে তাকাল না। তারা চলে গেলে কর্নেল গদাইকে নিয়ে খেলার মাঠের পূর্বপ্রান্তে গেলেন। শানুও গেল। তারপর কর্নেল শিস দিলেন তিনবার। অমনি জঙ্গলের দিক থেকে তিনবার শিস শোনা গেল।
তারপর একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে এল। শানু দেখল, আর কেউ নয়, থানার দারোগা মহিউদ্দিন। তিনি এসে টর্চের আলো জ্বেলে গদাইকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, এ আবার কে?
কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, গোখরো-পাঠানের সঙ্গী। কিন্তু আপনাদের খবর কী বলুন?
মহিউদ্দিন বললেন, ও মহা ধড়িবাজ। জাল মোহরটা নবাবি মসজিদের ভেতর কাগজে মুড়ে রেখেছিলাম। গোখরো-পাঠান এল। ভেতরে ঢুকল। অমনি আমরা গিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়লাম। কিন্তু আশ্চর্য। গোখরো-পাঠান যেন সত্যিই একটা সাপ। সে যেন কোনও গর্তে বা ফাটলে ঢুকে পড়েছে। তাকে আর খুঁজেই পেলাম না।
কর্নেল বললেন, মসজিদের চারদিক ঘিরে রাখা উচিত ছিল।
রেখেছিলাম। চারদিকে ঝোপের ভেতর আর্মড কনস্টেবলরা লুকিয়ে ছিল। তারা ওকে আসতে দেখেছে। কিন্তু যেতে দেখেনি। মহিউদ্দিন ক্ষোভের সুরে বললেন, বোকামি হয়ে গেছে। ওকে আসতে দেখামাত্র ঘিরে ধরাই উচিত ছিল। আসলে ভয় ছিল জঙ্গুলে জায়গা তো। সাড়া পেলেই সহজে গা-ঢাকা দেবার চান্স পাবে। কিন্তু মসজিদের ভেতর ঢুকলে তাকে সহজেই কোণঠাসা করা যাবে।
কর্নেল বললেন, জিতেনবাবু কোথায়?
মহিউদ্দিন বললেন, মসজিদের ভেতর সুড়ঙ্গ বা গুপ্তপথ আছে কি না খুঁজছেন।
কর্নেল বললেন, আপনি এক কাজ করুন। দুজন কনস্টেবলকে ডেকে এই আসামিকে থানায় লক-আপে রাখার ব্যবস্থা করুন শিগগির।
মহিউদ্দিন হুইসল বাজালেন। কয়েকজন পুলিশ ঝোপঝাড়ের ভেতর দৌড়ে এল ধুপধুপ শব্দ তুলে। দুজনের হাতে গদাইচন্দ্রের ভার দিয়ে মহিউদ্দিন বললেন, তোমরা একে থানায় নিয়ে যাও। সাবধান। লকআপে ঢুকিয়ে রাখবে।
ওরা গদাইকে নিয়ে চলে গেলে কর্নেল বললেন, চলুন। জিতেনবাবু কদ্দূর এগোলেন দেখা যাক। …..
পোড়ো মসজিদের ভেতর টর্চের আলোয় জিতেন্দ্রনাথ এরূ আরও দুজন পুলিশ অফিসার তখনও গোখরো-পাঠানের পালানোর পথ খুঁজে হন্যে হচ্ছেন।
কর্নেলকে দেখে জিতেন্দ্রনাথ বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার কর্নেল। লোকটা যেন মন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে গেছে। চারদিকের দেয়াল তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলাম একটা ফাটল পর্যন্ত নেই। দক্ষিণ দিকটা তো দেখছেন। ভেঙে পড়ে নিরেট দেওয়াল হয়ে আছে। ওপরে সামান্য ফাটল আছে, ওই দেখুন। ওখান দিয়ে ভেতরে দিনের আলো ঢোকে মনে হচ্ছে। কিন্তু ওই ফাটল দিয়ে বড়জোর একটা সাপ বা ছুঁচো ঢুকে যেতে পারে। মানুষের পক্ষে অসম্ভব নয় কি?
