সে বুঝতে পারছিল, লোকটা নিশ্চয়ই তাদের সেই চুরি করা জুতোগুলো পুঁততে গেছে। জুতোগুলো কেন সে চুরি করেছিল, শানুর মাথায় আসছে না। তবে এ মুহূর্তে শানুর তা নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসতও নেই। সে সেলিমকে কীভাবে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে তাই নিয়ে ভেবে আকুল।
হঠাৎ তার চোখ গেল জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরোটার দিকে।
প্রচুর শুকনো পাতা পড়ে আছে সুড়ঙ্গের মতো রাস্তাটাকে। শানু একরাশ শুকনো পাতা কুড়িয়ে সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোর ওপর রেখে জোরে ফুঁ দিতে থাকল। কয়েকবার ফুঁ দেওয়ার পর আগুন ধরল পাতাগুলোতে। তখন সে শুকনো কয়েকটা ডাল কুড়িয়ে ধরিয়ে নিল আগুনে। তারপর সেলিমের পা দুটোর মাঝখানের দড়িতে সাবধানে আগুন ধরাল।
দড়িতে আগুন জ্বলতেই ঝটপট নিভিয়ে ফেলল শানু। এর ফলে সেলিমের দুটো পা মুক্ত হল। তবে প্রত্যেকটা পায়ে খানিকটা দড়ি জড়ানো থেকে গেল।
কিন্তু হাত দুটো পেটের কাছে বাঁধা অবস্থায় আছে। সেলিমকে কাত করে একইভাবে ওর হাতের বাঁধন পোড়োনার চেষ্টা করল শানু।
ততক্ষণে আর এক কাণ্ড ঘটে গেছে। শুকনো পাতার আগুন ক্রমশ চারদিকে ছড়িয়ে গেছে এবং ঝোপঝাড় জ্বলতে শুরু করেছে। ধোঁয়ায় দম আটকে যাচ্ছে। শানু কাশতে শুরু করল। সেলিম আর সে দুজনেই যে এবার ধোঁয়ায় দম আটকে শুধু নয়, আগুনেও জ্যান্ত পুড়ে মরবে।
সেলিমের হাতের বাঁধন পোড়াতে গিয়ে শানুর ততক্ষণে নিজের প্রাণ বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। আগুন থেকে বাঁচার জন্য সে মরিয়া হয়ে কাঁটাঝোপের যে দিকটায় তখনও আগুন ধরেনি, সেদিকটায় সেলিমকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। কাঁটায় দুজনেরই শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল।
কিন্তু সামান্য একটু ফাঁকা জায়গায় পৌঁছতেই হঠাৎ তাদের ওপর এক ঝলক টর্চের আলো এসে পড়ল। অমনি শানু আতঙ্কে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার পায়ের কাছে সেলিম পড়ে রইল। আর প্রতি মুহূর্তে শানু অপেক্ষা করতে থাকল একটা ধারালো ছোরা এসে তার গলায় বসবে এবং…
শানু চোখ বুজে ফেলল। …
.
০৫.
তারপর শানুর কানে এল, কেউ বলছে, ব্রেভো ডার্লিং! এই তো চাই!
শানু চোখ খুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। টর্চের আলো নিভে গেছে। কিন্তু জঙ্গলের ছায়ার ভেতর হেমন্তের দিন শেষের কুয়াশা ভরা ধূসরতায় তার সামনে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি, পরনে জ্যাকেট আর প্যান্ট, কাঁধে ঝুলন্ত ক্যামেরা এবং বুকে ঝুলন্ত বাইনোকুলার।
শানু বিশ্বাস করতে পারল না নিজের চোখকে। সে স্বপ্ন দেখছে না তো? সে তেমনি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল।
তখন কর্নেল এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে ডাকলেন, শানু। শানু।
শানুর হুঁশ ফিরল। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠল কনের্ল! আপনি?
কর্নেল বললেন, এখন আর কোনও কথা নয়। চলে এসো এখান থেকে, বলে শানুর হাতে টর্চটা গুঁজে দিলেন। তারপর সেলিমকে অনায়াসে দুহাতে তুলে কাঁধে চাপিয়ে পা বাড়ালেন।
ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে অনেকটা চলার পর সেই বটগাছের তলায় পৌঁছে কর্নেল ডাকলেন, করিম। করিম!
করিমের সাড়া পাওয়া গেল গুঁড়ির আড়াল থেকে, আছি স্যার।
কর্নেল বললেন, তোমার আসামিকে নিয়ে এখানে এসো।
শানু অবাক হয়ে দেখল, করিম সেই ঢ্যাঙা লোকটাকে পিছমোড়া করে বেঁধে তার সোয়েটারের কার খামচে ধরে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে আসছে। করিমের হাতে লোকটার সেই ভোজালি গড়নের ছোরা।
কর্নেল বললেন, আসামিকে আমার জিম্মায় রেখে তুমি এখনই সেলিমকে সোজা হেলথ-সেন্টারে নিয়ে যাও। তারপর বাড়িতে খবর দেবে। যাও, দেরি কোরো না।
করিম ছোরাটা শানুর হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, নাও বাপধন। বেগতিক দেখলেই এই পাজি গদাইচন্দরের পেটে দেবে গোটাকতক খোঁচা মেরে। কেমন? বলে সে সেলিমকে কর্নেলের কাঁধ থেকে নিজের কাঁধে নিল। তারপর দ্রুত এগিয়ে চলল গ্রামের হেলথ-সেন্টারের দিকে।
কর্নেল চেঁচিয়ে তাকে বলে দিলেন, দরকার হলে হেলথ-সেন্টার থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে সদরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বুঝলে তো করিম?
করিম চেঁচিয়ে জবাব দিল, বুঝেছি স্যা-অ্যা অ্যার!
এবার কর্নেল ঢ্যাঙা লোকটা অর্থাৎ গদাইচন্দ্রের সোয়েটারের কলার ধরে বললেন, চলো হে গদাইচন্দর, দেখি, নবাবি মসজিদে তোমার স্যাঙাতের কী অবস্থা হল।
গদাই হাউমাউ করে কেঁদে বলল, আমার কোনও দোষ নেই স্যার। গোখরো পাঠানই আমাকে লোভ দেখিয়ে
কর্নেল তার গালে থাপ্পড় কষে বললেন, চুপ। যা বলার থানায় বলবে।
খোলা জায়গায় পৌঁছে কর্নেল বললেন, শানু। বলল, কীভাবে তুমি সেলিমের খোঁজ পেলে।
শানু সংক্ষেপে সবটা বলল। তারপর জিগ্যেস করল, আপনি বলুন এবার।
কর্নেল বললেন, জঙ্গলের ভেতর ধোঁয়া দেখে আমি ছুটে গিয়েছিলুম। গিয়ে দেখি তুমি পঁড়িয়ে আছ আর সেলিম তোমার পায়ের কাছে পড়ে আছে।
শানু বলল, তার আগের ব্যাপারটা বলুন, কর্নেল।
কর্নেল গদাইকে নিয়ে যেতে-যেতে বললেন, মকবুল হচ্ছে করিমের পিসতুতো দাদা। করিম খুব চালাক লোক। মকবুলের কাছে এই লোকটার চেহারার বিবরণ শুনেই বুঝতে পেরেছিল, লোকটা কে। সেলিম গদাইকে চিনত বলেই তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সাতবুড়ুয়ার জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিল। তবে মকবুল একে চেনে না।
শানু অবাক হয়ে বল, সেলিমের কাণ্ড দেখে অবাক লাগছে। কেন সে
