ঢ্যাঙা বলল, তুমিও সাবধানে থেকো কিন্তু। আর শোনো, জুতোগুলো আমি বটগাছের কোটরে লুকিয়ে রেখেছি। ওগুলো পুঁতে ফেললে ভালো হতো। পুলিশ যদি
ওকে বাধা দিয়ে কালো লোকটা বলল, পরে পুঁতে ফেলো বরং। এখন গিয়ে দ্যাখো ছোঁড়াটার আবার ঘুম ভেঙে গেল নাকি। ঘুম ভেঙেছে দেখলে আর এক ডোজ ওষুধ খাইয়ে দেবে। ….
শুনতে শুনতে শানু বারবার শিউরে উঠছিল আতঙ্কে। তার বুক এমন ঢিপঢিপ করছিল যে এখনই বুঝি সে মারা পড়বে। কালো লোকটার হাতের খুদে যন্ত্রটাই বা কী, যা দেখে ঢ্যাঙা লোকটা এমন ভয় পেল, সে বুঝতে পারছিল না। তাছাড়া আরও দুটো ব্যাপার সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। চাষি মকবুল দেখেছে, সেলিম একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সাতবুড়ুয়ার দিকে যাচ্ছিল। সেলিম তবে রে জুতোচোর বলে ছুটে গিয়ে কেন আবার সেই জুতোচোরের সঙ্গেই কথা বলতে বলতে এদিকে আসছিল?
আর, মাত্র একটা সোনার মোহর পেয়ে এরা দুজনে রাজা হয়ে যাবে কীভাবে? একটা সোনার মোহরের আর কতই বা দাম? ঐতিহাসিক মোহরের দাম থাকতে পারে। কিন্তু তাতে কি রাজা হওয়া যায় এ যুগে? তবে বোঝা গেল, এই গোখরো পাঠান লোকটাকেই কালো জিন বলেছিল আবদুলচাচা। গোখরো-পাঠান যাওয়ার সময় শানুর প্রায় মিটার দুই তফাত দিয়ে বলতে গেলে নাকের ডগা দিয়েই শুকনো পাতায় জুতোর মসমস শব্দ করতে করতে চলে গেল।
ঢ্যাঙা লোকটি হাই তুলে তুড়ি বাজাল। অনেকের এ অভ্যাস থাকে, শানু দেখেছে। ঢ্যাঙা এবার পকেট থেকে সিগারেট বের করে সিগারেট ধরাল। তারপর শিস দিয়ে একটা হিন্দি হিট গানের সুর তুলতে তুলতে যেদিক থেকে এসেছিল, সেইদিকে পা বাড়াল। তখন শানু সাবধানে তাকে অনুসরণ করল।
প্রাচীন যুগে এখানে একটা বড় মন্দিরকে কেন্দ্র করে ছটা মন্দির ছিল। মূল মন্দিরটা ভেঙে এই প্রকাণ্ড বটগাছ গজিয়েছে। বিশাল গুঁড়ির সঙ্গে এখনও চাপ-চাপ ইট-পাথরের চাঙড় আটকে আছে। বাকি মন্দিরগুলোর ধ্বংসস্তূপ ঘিরে ঘন জঙ্গল গজিয়েছে। একচিলতে রোদ্র ঢোকে না, এমন ছায়াভরা সুড়ঙ্গ পথের মতো একফালি রাস্তায় ঢ্যাঙা লোকটা এবার গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলেছে। শানু দুরত্ব রেখে তাকে অনুসরণ করছিল। মাথার ওপর দুপাশ থেকে ঝুঁকে পড়া লতাপাতায় লোকটার মাথা ঠেকে গেলে সে রেগে গেল। চাপা গলায় বিরক্তি প্রকাশ করে সে পকেট থেকে একটা ভোজালি গড়নের ছোরা বের করল। তারপর লতাপাতাগুলো কেটে ফেলল। তখন শানু দেখতে পেল, সামনে একটা গোলাকার স্তূপ বা মাটিতে বসে যাওয়া গম্বুজের মতো টিবি রয়েছে। টিবির সামনে দরজার মতো ফোকর।
সঙ্গে-সঙ্গে শানুর মনে পড়ে গেল, ইতিহাসের বইতে এমন গড়নের স্থাপত্য সে ছবিতে দেখেছে। এ কী তা হলে কোনও প্রাচীন বৌদ্ধস্তপ? সাঁচি, ভারত এবং আরও বহু জায়গার যে সব প্রাচীন বৌদ্ধস্তূপ আছে, এটা যেন তাদেরই একটা খুদে প্রতিরূপ।
স্তূপের ফোকরের ভেতরটা আঁধার হয়ে আছে। লোকটা টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকে গেল। সেই সুযোগে শানু পা টিপে টিপে এগিয়ে স্তূপের ফোকরের একপাশে সেঁটে রইল। ভেতরে লোকটা গুঁড়ি মেরে বসে টর্চের আলো ফেলেছে। সে এদিকে পেছন ফিরে আছে। কিন্তু টর্চের আলোয় শানু যা দেখল, তার বুক ফেটে কান্না জাগল। অতি কষ্টে সে আত্মসম্বরণ করল।
সেলিমের দুটো হাত এবং দুটো পা দড়িতে বাঁধা। সে চিত হয়ে পড়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ।
লোকটা তাকে কাতুকুতু দিয়ে পরীক্ষা করল, সে সত্যি ঘুমিয়ে আছে, নাকি ঘুমের ভান করে আছে। ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর কথা শানু কিছুক্ষণ আগে শুনেছে। সে বুঝল, সেলিম সত্যিই ওষুধের প্রভাবে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
লোকটা নিশ্চিন্ত হয়ে এবার এদিকে ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে শানু স্কুপের অন্যপাশে ঘন আগাছা আর লতাপাতায় ঠাসা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে পড়ল।
কিন্তু তার ফলে বেশ খানিকটা শব্দও হল। অমনি লোকটা সেদিকে তাকাল। তার চোখে সন্দেহ ঝিলিক দিচ্ছে। সে টর্চের আলো ফেলল।
ভাগ্যিস শানু লতাপাতার আড়ালে ঢুকে পড়তে পেরেছিল। তাই একটুর জন্য বেঁচে গেল। লোকটা নিশ্চয় তাকে শেয়াল বা অন্য কোনও জন্তু ভেবে এদিকে খুঁজতে এল না। নইলে কী হতো, ভেবে শানুর দম আটকে যাওয়ার অবস্থা একেবারে।
লোকটা আগের মতো গুঁড়ি মেরে এবং শিস দিতে দিতে হিট হিন্দি ফিল্মের সুর বাজাতে বাজাতে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই শানু আড়াল থেকে বেরিয়ে স্তূপের ফোকরের সামনে এল। দেখল, লোকটা সেই সিগারেটের টুকরোটা ফেলে গেছে এবং তা থেকে তখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ছায়া প্রগাঢ় বলেই আগুনটুকু জ্বলজ্বল করছে। শানু ঢুকে গেল ফোকরের মধ্য দিয়ে।
স্তূপের ভেতরটা আঁধার হয়ে আছে। ঠাহর করে পা বাড়িয়ে বেচারা সেলিমকে ছুঁয়েই বসে পড়ল। আন্দাজ করে প্রথমে সে তার পায়ের বাঁধন খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। হাতের বাঁধনও তেমনি মজবুত। খোলা গেল না। তখন সে সেলিমকে দুহাতে ওঠানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু সেলিম তার চেয়ে শক্তসমর্থ এবং ওজনেও ভারী। শানু রোগাটে গড়নের ছেলে। সেলিমকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সাধ্য তার নেই। টানাটানি করে শানু তাকে ফোকরের বাইরে আনতে পারল। কিন্তু অতি কষ্টে বাইরে আনল বটে, এবার কীভাবে ঘন লতাপাতা ভরা ঝোপের ভেতর দিকে তাকে নিয়ে যাবে ভেবে পেল না শানু। তাছাড়া ঝোপগুলো শেয়াকুল-বৈঁচি-নাটাকাটায় ঠাসা। শানুরই শরীরের খোলা জায়গাগুলো কাটায় ছড়ে রক্তারক্তি হয়ে গেছে। সেলিমকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে হলে সেলিমের শরীরের কী অবস্থা হবে?
