মির্জাসায়েব বলে উঠলেন, তাজ্জব!
.
০৪.
শানু সপ্তশিবের ভাঙা মন্দিরের ওখানে একা দাঁড়িয়ে ছিল। সেলিমের বিপদ সে চুপ করে বসে থাকতে পারেনি। নবাবগঞ্জ হাইস্কুলে ক্লাস এইটে দুজনেই পড়ে। শানু ফার্স্ট বয়, সেলিম সেকেন্ড বয়। প্রতি বছর দুজনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে ফাস্ট হওয়া নিয়ে। কিন্তু সেলিম ফাস্ট হতে পারে না। তবু এ জন্য শানুর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা জাগে না, মুখে যতই ঠাট্টাতামাশা করুক। তারা বরাবর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পুজোয় বা ঈদের পরবে শানু বা সেলিমদের বাড়িতে পরস্পরের খাওয়াদাওয়ার ডাক পড়ে। দুটি পরিবারেও খুব হৃদ্যতার সম্পর্ক। তাই সেলিমের এই বিপদে শানু মরিয়া হয়ে উঠেছিল তাকে উদ্ধারের জন্য।
চাষি মকবুল বলেছে, সেলিম একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সপ্তশিব বা সাতবুড়য়ার মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। তাই শানু এখানে চলে এসেছে। দুপুরে ভালো করে খেতেও পারেনি। ছুটে গিয়েছিল সেলিমদের বাড়িতে কর্নেলের খোঁজে। কিন্তু তখন কর্নেল দুই পুলিশ কর্তাকে নিয়ে অন্দরমহলে গোপনে আলোচনারত। তাই শানুকে বাড়ির কেউ কর্নেলের খবর দেয়নি। করিম বলেছিল, কর্নেলসাহেবকে খুঁজছে? উনিও তো এক আবদুলখ্যাপা। পাখ-পাখালির পেছনে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছেন কোথায় দেখো গে।
সপ্তশিবের মন্দির বলতে আর কিছু টিকে নেই। ঘন জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপ অনেকটা জায়গা জুড়ে। মধ্যিখানে বিশাল এক বটগাছ চারদিকে অজস্র ঝুরি নামিয়েছে। দিনদুপুরেই জায়গাটা নিঝুম আঁধার হয়ে থাকে। তাছাড়া জায়গাটার এমন বদনাম যে, দিনদুপুরেও একাদোকা কেউ পারতপক্ষে এদিকে পা বাড়ায় না। কারণ শিবের চেলারা যে ভূত-পেরেত। শিবের মন্দির ধ্বংস হয়েছে; কিন্তু তার চেলারা পাহারা দিচ্ছে না বুঝি? একাদোকা পা বাড়ালেই ঘাড়টি মটকে দেবে।
শানুর তাই মাঝে-মাঝে গা ছমছম করছিল। হেমন্তের বিকেলে গাছপালা জুড়ে অজস্র পাখি চেঁচামেচি করছিল। এখনই দূরের গাছপালা ঘিরে কুয়াশার নীল আস্তরণ ঘনিয়ে উঠেছে। বিকেলের হলুদ রোদ গায়ে মেখে উড়ে চলেছে বুনো হাঁসের ঝক। নদীর ওপারে বিলের জলে এখনই তাদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। হাঁসের ঝাকটাকে শানু পেছনে ফিরে মুখ তুলে দেখছিল। আবদুলচাচা তার এ অভ্যাসের মূলে। আবদুল বলত, রাতের বেলা জোস্না হলে হাঁসগুলোর ভেতর থেকে। পরিরা আপন রূপ ধরে। কেন জানো তো? অনেক পরি যে হাঁসের রূপ ধরে দুনিয়ার নেমে আসে। দুনিয়ার নদী-খালবিলের পানিতে সাঁতার না কাটলে আসমানের পরিদের ঘুম হয় না পরিস্তানে। এসব কথা শোনার পর শানু হাঁসের ঝাঁক দেখলেই মুখ তুলে তাদের দেখতে দেখতে ভাবত, কোন হাঁস পরি, আবদুলচাচা নিশ্চয় চিনতে পারে। কেন তাকে চিনিয়ে দেয় না আবদুলচাচা? আজ আর সেই আবদুলচাচা নেই। শানু দুঃখে শ্বাস ফেলল।
একটু অনামনা হয়ে পড়েছিল শানু। হঠাৎ কোথাও শুকনো পাতায় মস-মস শব্দ আর কাদের চাপা গলার কথাবার্তা শুনে সে চমকে উঠল। তারপর একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইল। একটু পরে সে দেখল, দুটো লোক কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে।
একজনের চেহারা দেখে শানু শিউরে উঠল। ও কি মানুষ না ভূত? জীবনে অমন কালো-কুচ্ছিত চেহারার মানুষ দ্যাখেনি শানু। থ্যাবড়া নাক, কুতকুতে চোখ, মাথায় একরাশ চুল। তার পরনে নীলচে আঁটো প্যান্ট আর জ্যাকেট। কাঁধে একটা কীটব্যাগ। আকারে বেঁটে হলেও সে বেশ মজবুত গড়নের লোক। মুহূর্তে শানুর মনে হল, একেই কি আবদুলচাচা কালো জিন বলেছিল?
তার সঙ্গীটি ঢ্যাঙা গড়নের লোক। তার পরনে প্যান্ট আর গলাবদ্ধ সোয়েটার। এখনও তত শীত পড়েনি। কিন্তু শানুর মনে হল, রাত কাটানোর জন্যই গায়ে সোয়েটার চড়িয়েছে লোকটা। তার নাকটা চোখে পড়ার মতো লম্বা।
হঠাৎ শানুর মনে হল, এই ঢ্যাঙা লোকটিকে কোথায় দেখেছে। মুখটা খুব চেনা। অথচ কিছুতেই মনে করতে পারছে না।
কালো কুচ্ছিত লোকটা বলল, হুঁশিয়ার থাকবে। এখানে পুলিশ দেখলেই জানবে, মির্জাব্যাটা পুলিশকে সব জানিয়েছে। আর সঙ্গে-সঙ্গে মির্জার নাতিকে জবাই করে ফেলবে।
ঢ্যাঙা লোকটা খি-খি করে হেসে বলল, ছোঁড়াটা যে ওষুধ খেয়ে ঘুমোচ্ছে। শ্বাসনালি কাটার কষ্টও টের পাবে না।
কালো লোকটা ধমক দিয়ে বলল, পুলিশ দেখেও যদি ছোঁড়াটাকে জবাই না করো, তোমার কী হবে বুঝতে পারছ? বলে সে জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে কী একটা যন্ত্র বের করল। খুব ছোট্ট যন্ত্র।
দেখামাত্র ঢ্যাঙা লোকটা ভয়পেয়ে বলল, আরে, রসিকতা বোঝো না কেন? সবতাতেই ফোঁস করে ওঠো। এজন্যই লোকে তোমাকে গোখরো-পাঠান বলে।
কালো লোকটা জিনিসটা ঢুকিয়ে রেখে বলল, মোহরটা যদি পাই, তাহলে আমরা দুজনেই রাজা হয়ে যাব। বুঝলে তো?
মাথা দুলিয়ে সায় দিয়ে ঢ্যাঙা লোকটা বলল, তা হলে যাও। গিয়ে দেখ নবাবি মসজিদের চত্বরে মোহরটা রেখে গেছে নাকি। হাতে আর মোটে কয়েক ঘন্টা টাইম।
কালো লোকটা বলল, মুশকিল হয়েছে কী জানো? মির্জার ওই কলকাতার বন্ধু কর্নেল না ফর্নেল, সে একজন ঘুঘু। আমার ধারণা, সে একজন পুলিশের গোয়েন্দা। যাই হোক, আমিও বাবা গোখরো-পাঠান। বিস্তর ঘুঘু আমি টিট করেছি। নবাবি মসজিদের ধারে কাছে তাকে দেখলেই গোখরোর ছোবল কী জিনিস টের পাইয়ে দেব।
