কর্নেল মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। বললেন, হুঁ। মনে হচ্ছে এই ঐতিহাসিক সোনার মোহর নিয়েই দুজনের মধ্যে বিবাদ বেধেছিল।
জিতেন্দ্রনাথ বললেন, গোখরো পাঠানের নামে তিনটে খুন আর একডজন ডাকাতির অভিযোগে পরোয়ানা ঝুলছে। ব্যাটাচ্ছেলে গা-ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছে।
মহিউদ্দিন একটু হেসে বললেন, শেষ পর্যন্ত তা হলে কী গোখরো-পাঠানের পাল্লায় পড়েছিল আবদুল? অথচ তার মৃত্যু হল গোখরোর কামড়ে। অদ্ভুত যোগাযোগই বলতে হবে।
মির্জাসাহেব বললেন, নবাবগঞ্জের লোকে বলছে, সাপ মেরে পুড়িয়ে দেয়নি আবদুল। সেই সাপটাই তাকে নাকি কামড়েছে। তা হলে দেখছি ব্যাপারটা কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কর্নেল বললেন, না, মির্জাসায়েব। মর্গের রিপোর্টে গণ্ডগোল আছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, পরবর্তী ঘটনাগুলো বলে দিচ্ছে আবদুলের মৃত্যু সাপের কামড়ে হয়নি। বাই দা বাই, মহিউদ্দিনসায়েব, গোখরো-পাঠানের চেহারা বর্ণনা পেয়েছেন রেডিও মেসেজে?
জিতেন্দ্রনাথ বললেন, আমাদের রেকর্ডে আছে। দেখতে চাইলে ওর ফোটোও আপনাকে এনে দিতে পারি দফতর থেকে।
কর্নেল বললেন, তার গায়ের রং কালো এবং সে দেখতে কদাকার কি?
দুজন পুলিশ অফিসারই অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। তারপর জিতেন্দ্রনাথ মুচকি হেসে বললেন, ও-জন্যই পুলিশমহলে কর্নেলকে অন্তর্যামী বলা হয়।
কর্নেল হাসলেন, না জিতেনবাবু! আমি অন্তর্যামী নই। আবদুল বলেছিল গতকাল ওকে নদীর ওধারে একটা কালো জিন তাড়া করেছিল। বারো বছর পরে নাকি সেই কালো জিনটার সঙ্গে আবদুলের আবার দেখা। তাই আমার ধারণা হয়েছিল, আসলে সে তার শত্রুর গায়ের রং কালো ও চেহারা কদাকার, এটাই বলতে চেয়েছিল।
দুই পুলিশ অফিসারই সপ্রশংস ভঙ্গিতে সায় দিলেন। মির্জাসায়েব বললেন, এবার বলুন, আমার নাতি সেলিমের কী হবে? আগের মতো গায়ের তাকত থাকলে ওই গোখরা-পাঠানকে গুলি করে মারতাম। আমি এখন বুড়ো হয়েছি। তার চোখে জল এসেছিল। হাতের চেটোয় চোখ মুছে ফের বললেন, কত সাংঘাতিক মানুষখেকো বাঘকে সামনাসামনি গুলি করে মেরেছি। ও তো একটা মানুষের বেশধারী শয়তান!
কর্নেল আস্তে বললেন, ভাববেন না মির্জাসায়েব। এ পর্যন্ত কোথাও কোনওদিন আমি হারিনি। আমার বিশ্বাস, এবারও হারব না, বলে উনি মহিউদ্দিনের দিকে ঘুরলেন, মর্গের রিপোর্ট ঠিক নয় মহিউদ্দিনসায়েব। আপনি বরং
বাধা দিয়ে বিরক্তমুখে মহিউদ্দিন বললেন, কিন্তু আপনিও তো আবদুলের মৃত্যুর সময় তার। মুখে সাপ কথাটা শুনেছেন।
কর্নেল বললেন, সাপ শুনিনি। সে অতিকষ্টে সা-সা বলেছিল। আসলে সে কী বলতে চাইছিল, আমরা এখনও জানি না, বলে কর্নেল মির্জাসায়েবের দিকে ঘুরলেন, আপনি তো আমার মতো ইতিহাস প্রত্নবিদ্যার কেতাব পড়েন। আপনার কাছে স্থানীয় প্রাচীন ইতিহাস সংক্রান্ত কোনও বই আছে?
মির্জাসায়েব গম্ভীর মুখে বললেন, আছে। রবার্ট স্মিথের লেখা দা ডেকাডেন্স অফ দা টার্কি সুলতানেট অব বেঙ্গল। ওতে পুরনো নবাবগঞ্জের ডিটেলস আছে।
কর্নেল হাসলেন, আপনার নাতিকে উদ্ধারের আগে ওই বইটাতে আমি একটু চোখ বুলোতে চাই।
বাঁকা হেসে দারোগা মহিউদ্দিন বললেন, কর্নেল কি ওই বইয়ের ভেতর মির্জাসাহেবের নাতিকে কিডন্যাপ করার ক পাবেন নাকি?
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, মহিউদ্দিন সায়েব, সেই কবিতাটি নিশ্চয় জানেন : যেইখানে পাবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ পাইলে পাইতে পার অমূল্যরতন। আমি তাই ছাইপাঁশ হাতড়ে দেখারই পক্ষপাতী।
মহিউদ্দিনদারোগা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমাকে এখনই থানায় ফিরতে হবে। ভাববেন না মির্জাসাহেব। এমন ফাঁদ পেতে রাখব, যাতে গোখরো-পাঠান পা না দিয়ে পারবে না।
মির্জাসায়েব আঁতকে উঠে বললেন, সে যদি জানতে পারে, পুলিশকে খবর দিয়েছি, তা হলে সেলিমকে আর ফিরে পাব না। আল্লার দোহাই। আপনারা যা কিছুই করুন, যেন সেলিমকে–
বাধা দিয়ে মহিউদ্দিন বললেন, না, না। আমরা যথেষ্ট সাবধানে কাজ করব।
জিতেন্দ্রনাথও উঠলেন। দুই পুলিশ অফিসার কর্নেল ও মির্জা সায়েবকে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেলেন। সতর্কতা হিসেবে ওঁদের খিড়কির দরজা দিয়ে অন্দরমহলে নিয়ে আসা হয়েছিল। বাড়ির বিশ্বাসী ভৃত্য করিম ওঁদের গোপনীয়তার জন্য ওদিকটায় নজর রেখেছিল। করিম অবস্থা বুঝে দুই পুলিশ অফিসারকে খিড়কি দিয়ে নিয়ে গেল।
মির্জাসায়েব ও কর্নেল এসে বাইরের ঘরে বসলেন এবার। মির্জাসায়েব আলমারি থেকে স্মিথের বইটি কর্নেলকে দিয়ে বললেন, গোখরা না গোখরো-পাঠানের গায়ের রং নাকি কালো। অথচ মকবুল লাঙল চষার সময় সেলিমকে যার সঙ্গে যেতে দেখেছিল, তার গায়ের রং নাকি কালো নয়। আমি কিছু বুঝতে পারছি না কর্নেল!
কর্নেল বইটার পাতা ওলটাতে-ওলটাতে বললেন, লোকটাকে মকবুল চেনে না বলেছে। কাজেই গোখরো-পাঠান নবাবগঞ্জে কোনও সঙ্গী জোটায়নি।
তার মানে এ লোকটা গোখরো-শয়তানের কোনও চেলা। বদমাশটা তাকে সঙ্গে নিয়েই এসেছে, এই তো? বলে মির্জাসাহেব কর্নেলের দিকে তাকালেন।
কর্নেল তখন বইটার একটা পাতায় চোখ রেখেছেন। যেন মির্জাসায়েবের কথা কানেই ঢুকছে না। তিনি হঠাৎ বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ নিঃশব্দ হাসিতে উজ্জ্বল। তারপর মির্জাসায়েবকে স্তম্ভিত করে হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন। কতকটা দৌড়নোর ভঙ্গিতেই।
