সেলিম বলল, কী করে বুঝলেন কর্নেলদাদু?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, নদীর এপারটা উঁচু। প্রাচীন রাজধানী হওয়ার দরুন এপারে মাটিতে চুনসুরকি বালি মিশে রয়েছে। কিন্তু ওপারের মাটিটা স্রেফ পলিমাটি। এই মাটির টুকরো পলিমাটি।
শানু ও সেলিম একগলায় বলল ঠিক, ঠিক।
কর্নেল বললেন, চলো। বেরোনো যাক।
শানু ও সেলিম এখান থেকে বেরোতে পারলেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। তারা আগে বেরিয়ে গেল কর্নেল আর একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে তবে বেরোলেন।
কিন্তু তারপরই শানু ও সেলিমের উত্তেজিত চিৎকার শুনলেন। বেরিয়ে গিয়ে দেখেন, তিন জোড়া জুতোই উধাও। শানু ও সেলিম এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। সেলিম শাসাচ্ছে ভালো হবে না বলছি। কে জুতো লুকিয়েছে, বলো! নইলে…
শানু বলল, কে সে কর্নেলদাদু?
কর্নেল জবাব দিলেন না। চোখে বাইনোকুলার রেখে চারপাশে সেই লোকটিকেই যেন খুঁজতে থাকলেন। ওদিকে সেলিম এক লাফে চত্বর থেকে নেমে গেল। তারপর, তবে রে জুতোচোর বলে ঝোপজঙ্গলের ভেতর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। কর্নেল ডাকলেন, সেলিম, সেলিম। কিন্তু সেলিম যেন শুনতেই পেল না। শানু হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর সে যেই বন্ধুকে অনুসরণের জন্য পা বাড়িয়েছে, কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, যেও না শানু। ও জুতোচোরকে ধরতে পারবে বলে মনে হয় না। এখনই ফিরে আসবে।
দুজনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। কর্নেল আবার বাইনোকুলারে সেলিমকে খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু তাকে দেখতে পেলেন না। আর কিছুক্ষণ পরে কর্নেল বললেন, চলো তো দেখি। সেলিম কোনদিকে গেল?
সেলিম জঙ্গলের ভেতর যেদিকে গেছে, সেদিকে এগিয়ে চললেন দুজনে। মাঝে-মাঝে দুজনেই সেলিমকে ডাকছিলেন। কিন্তু কোনও সাড়া পেলেন না। তখন শানুর মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠল। সে কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, কর্নেলদাদু। সেলিম কালো জিনটার পাল্লায় পড়েনি তো?
কর্নেলের মুখেও এতক্ষণে উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। শুধু বললেন, এসো।
দুজনে গোটা এলাকা সেলিমকে খুঁজে খুঁজে হন্যে হচ্ছিলেন। কিন্তু সেলিমের পাত্তা নেই। জঙ্গলে ধ্বংসস্তূপের পরে খানিকটা চষা জমি। সেখানে লাঙল চছিল একটা লোক। কর্নেল ও শানুকে দেখে সে লাঙল থামিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। কর্নেলকে সে সায়েব ভেবেছিল। কর্নেল যখন বাংলায় তাকে জিগ্যেস করলেন, তুমি কি এদিকে মির্জাসায়েবের নাতি সেলিমকে দেখেছ? তখন সে আরও অবাক হয়ে গেল। সেলাম ঠুকে বলল, হ্যাঁ, স্যার। একটু আগেই তো দেখলাম, একটা লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওই দিকে চলে গেল!
শানু বলে উঠল, ওদিকে মানে, সাতবুড়ুয়ার দিকে?
চাষি লোকটি মাথা নাড়ল। কর্নেল বললেন, সাতবুড়ো। সেটা কী?
শানু বলল, ওই যে দেখছেন গাছপালার ভেতর মন্দিরগুলো। আসলে ওটা সপ্তশিবের মন্দির। ভেঙেচুরে পড়ে আছে। বুড়োশিবের মন্দির আর কী। তাই লোকে বলে সাতবুড়ুয়ার মন্দির। কিন্তু সেলিমের কাণ্ডটা শুনে রাগ হচ্ছে। অমন করে কার সঙ্গে…..
তার কথায় বাধা পড়ল। একটা লোক দৌড়ে আসছিল গ্রাম থেকে। সে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে সেলাম করে বলল, কর্নেলসায়েব! মির্জাসায়েব আপনাকে এখনই ডেকেছেন। শিগগির আসুন।
কর্নেল ও শানু তার পেছন-পেছন ব্যস্তভাবে গ্রামের দিকে চললেন।
মির্জাসায়েব বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, কী একটা ঘটেছে। কর্নেলকে দেখেই নিঃশব্দে একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দিলেন। কর্নেল ভাঁজ খুলে দেখলেন একটা চিঠি। তাতে লেখা আছে :
আজ বারো ঘন্টার মধ্যে আবদুলের মোহরটা জঙ্গলে নবাবি মসজিদের ভেতর কাগজে মুড়ে চোখেপড়ার মতো জায়গায় না রেখে এলে মির্জার নাতিকে জবাই করা হবে। যদি পুলিশকে খবর দেওয়া হয়, তাহলে তার নাতিকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে।
.
০৩.
মির্জাসায়েব বাড়ির অন্দরমহলের একটি ঘরে মির্জাসায়েব, কর্নেল, নবাবগঞ্জ থানার অফিসার ইন-চার্জ মহিউদ্দিন এবং সদর শহরের সি. আই. ডি ইন্সপেকটার জিতেন্দ্রনাথ গোপনে আলোচনা করছিলেন। বেলা প্রায় একটা বাজে। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নবাবগঞ্জ এসেছেন এবং সামান্য এক মানুষ আবদুলের মৃত্যু নিয়ে তাঁর এত উৎসাহ ও সন্দেহের কথা জেনে জিতেন্দ্রনাথ ছুটে এসেছেন সদর থেকে জিপে চেপে। মির্জাবাড়িতে গোপনে এবেলা ওঁদের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হয়েছিল। বাড়িতে কান্নাকাটি হুলস্থুল পড়ে গেছে সেলিমের জন্য। সেলিমের বাবা থাকেন সুদূর আবুধাবিতে। তাকে এখনই ট্রাংক বা টেলিগ্রাম করে এ বিপদের কথা জানাতে বারণ করেছেন কর্নেল।
আলোচনারত মুখগুলি গম্ভীর। সবাই চাপা গলায় কথা বলছেন। ও.সি. মহিউদ্দিন বললেন, মর্গের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিষাক্ত সাপের কামড়ে মৃত্যু। বিষাক্ত সাপের দুটো দাঁত থেকে। আবদুলের ডান পায়ের ওপর সে-চিহ্ন দেখেছেন ডাক্তার। কিন্তু আশ্চর্য। মির্জাসায়েবের নাতিকে-
তার কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, সে কথা পরে হবে মহিউদ্দিনসায়েব। আবদুলের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে কি না বলুন।
মহিউদ্দিন বললেন, হ্যাঁ। কালই বিভিন্ন থানায় রেডিও মেসেজে জানিয়েছিলাম। আজ সকালে লালগোলা থানার রেডিও মেসেজে যা জানলাম, তা হল এই : আবদুলের বাড়ি ছিল পদ্মার ধারে সাহেবগঞ্জে। ও ছিল আসলে বনেদি ফ্যামিলির লোক। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই একটু ছিটগ্রস্ত টাইপের। বছর বারো আগে আবদুলের সঙ্গে গফুর খা পাঠান নামে একজন লোকের মারামারি হয়। মারামারির কারণ কেউ জানে না। গফুর একজন দাগি ক্রিমিন্যাল। বহুবার জেল খেটেছে। গফুরকে স্থানীয় লোকে বলে গোখরো-পাঠান। বুঝলেন তো? ওকে সবাই বলত, গোফরা-পাঠান। তা থেকেই শেষে ওর নাম হয়েছিল গোখরো পাঠান। যাই হোক, তার গায়ে হাত তোলার পরিণাম সাঙ্ঘাতিক হওয়ার কথা। সম্ভবত সেই ভয়েই আবদুল গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসে।
