কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, মোহরটা আপনি রেখে দিন। একটু সাবধানে রাখবেন। আমি বেরোচ্ছি। দেখি, আজ একটা অন্তত প্রজাপতি ধরতে পারি নাকি!
রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে গেছেন, সেলিম এসে সামনে দাঁড়াল। বলল, আজ আমাকে সঙ্গে না নিয়ে বেরোচ্ছেন যে কর্নেলদাদু?
কর্নেল হাসতে হাসতে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, জানি, তোমাকে সঙ্গে পেয়ে যাব। তা তোমার বন্ধুটি কোথায়?
শানু? সেলিম বলল, শানুকে ডেকেই তো আসছি। আজ সোমবারও স্কুলে ফতেহা-দোয়াজ দহমের ছুটি।
কর্নেল বললেন, হু, তোমাদের প্রফেটের বার্থডে।
একটু পরে রাস্তায় শানুকে দেখা গেল। সে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। কর্নেলের সঙ্গে দুই বন্ধু মোড় দিয়ে নদীর দিকে হাঁটতে থাকল। এদিকে গ্রামের শেষ প্রান্ত। বিদ্যুতের তার এদিকে আসেনি। গরিব-গুরবো মানুষের বসতি। খোড়ো ঘর। জীর্ণ দশা। পেছনেই খেলার মাঠ, তারপর জঙ্গল আর ঐতিহাসিক ধ্বংসস্তূপ নদীর ধার অবধি ছড়ানো। জঙ্গলের ভেতর পোড়ো-মসজিদের বিশাল গম্বুজটি দেখা যাচ্ছিল। গম্বুজেও ফাটল ধরেছে। গজিয়ে উঠেছে বট-অশ্বথের চারা।
যেতে-যেতে শানু বলল, কর্নেল। কাল রাত্তিরে আমাদের দোতলার ছাদ থেকে মসজিদের কাছে টর্চের আলো দেখেছি, জানেন?
কর্নেল বললেন, তারপর?
শানু বলল, বারকতক টর্চ জ্বেলে কে কী যেন খুঁজছে মনে হল। তারপর আর কিছু দেখিনি।
সেলিম বলল, একটা কথা, কর্নেলদাদু।
কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে একটা পাখি দেখতে দেখতে বললেন, বলো।
সেলিম বলল, মরা গোখরো সাপটা আবার জ্যান্ত হয়ে আবদুলচাচাকে কামড়েছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। দাদুকে আপনি একটা মোহর–
কর্নেল দ্রুত বললেন, চুপ! জানো না? বাতাসেরও কান আছে।
সেলিম কাঁচুমাচু মুখে হাসল। শানু বলল, কিন্তু কাল সারা বিকেল কর্নেলদাদুর সঙ্গে আমরা সেই মরা সাপটাকে তন্নতন্ন করে খুঁজেও তো পাইনি।
সেলিম তর্কের সুরে বলল, তার মানে, তুই ওই সব গল্পে বিশ্বাস করিস?
শানু বলল, কিন্তু সাপটা গেল কোথায়? আমার সামনেই তো আবদুলচাচা সাপটার লেজ ধরে ঘোরাতে ঘোরাতে ছুঁড়ে ফেলল। কোথায় গিয়ে পড়ল আমি দেখেছিলাম। অথচ সেখানে কোথাও মরা সাপ নেই!
সেলিম বলল, শেয়াল বা কুকুর মুখে করে নিয়ে গেছে।
কর্নেল বললেন, শেয়াল-কুকুর গোখরা সাপের মাংস সুস্বাদু বলে মনে করে না, ডার্লিং। তবে ঈগল, চিল, ময়ুর কিংবা বাজপাখির কথা আলাদা। সাপের মাংস এসব পাখির প্রিয় খাদ্য।
সেলিম বলল, কর্নেলদাদু, কাক, কাকের কথা বলছেন না?
হুঁ, কাকের অবশ্য অখাদ্য বলে কিছু নেই, বলে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে পোড়ো-মসজিদটা দেখতে থাকলেন।
সেলিম জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল কিছু, হঠাৎ কর্নেল হন্তদন্ত হাঁটতে শুরু করলেন মসজিদটার দিকে। শানু ও সেলিম তার পেছন পেছন চলল। মসজিদের চত্বরে উঠে কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, এসো। আমরা মসজিদের ভেতরটা একবার দেখি।
কর্নেল পা বাড়িয়েছেন, সেলিম বলে উঠল, কর্নেলদাদু, কর্নেলদাদু! জুতো খুলে তবে মসজিদে ঢুকতে হয়।
কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ ডার্লিং!
তিনজনে চত্বরে জুতো খুলে রেখে মসজিদের ভেতর ঢুকল। চার-পাঁচশ বছর ধরে এই মসজিদ পোড়ো হয়ে রয়েছে। একটা দিক ধসে পড়েছে। প্রতি মুহূর্তে ভয় হয়, এখনই বুঝি হুড়মুড় করে ধসে পড়বে। গম্ভুজটা বিশাল। তার তলায় ছাদ ফুঁড়ে গাছপালার শেকড় বেরিয়ে এসেছে। ফাটল দিয়ে রোদ্দুর এসে ভেতরটা স্পষ্ট করেছে বটে, কিন্তু কোণার দিকটা ভেঙে পড়ায় আবছা আঁধার জমে আছে। গা ছমছম করে ওঠে ভেতরে ঢুকলে। প্রকৃতি যে অসংখ্য নখ দিয়ে আঁচড় কেটে চলেছে একটা ঐতিহাসিক কীর্তিকে খতম করে দেবে বলেই।
একঝাঁক চামচিকে সেলিম ও শানুর ওপর আচমকা এসে পড়তেই তারা আঁতকে উঠেছিল মেঝেয় চামচিকের নাদি, পলেস্তারা খসা বালি আর চুন সুরকির আস্তরণ, দেয়ালে-দেয়ালে মাকড়সার জাল, চড়ুইপাখির বাসা ঘুলঘুলিতে। শুধু একটা কোণ বেশ পরিষ্কার। সেখানেই আবদুলের ডেরা ছিল।
কর্নেল বললেন, আশ্চর্য তো! কাল বিকেলে আমি এখানে আবদুলের বিছানা ছড়িয়ে থাকতে দেখেছি। সেগুলো তো নেই।
সেলিম ও শানু মুখ তাকাতাকি করল। তারাও ভারি অবাক হয়ে গেছে।
কর্নেল ঝুঁকে পড়ে মেঝেয় আতশকাচ দিয়ে কী যেন খুঁজতে ব্যস্ত হলেন। সেলিম বলল, কী খুঁজছেন কর্নেলদাদু?
কর্নেল বললেন, কাল বিকেলে টর্চের আলোয় যা খুঁজে পাইনি, এখন পাচ্ছি।
শানু উত্তেজিতভাবে জিগ্যেস করল, কী?
কর্নেল সোজা হয়ে বললেন, জুতোর ছাপ।
সেলিম মুচকি হেসে বলল, কাল নিশ্চয় আপনি জুতো পরে ভেতরে ঢুকেছিলেন?
হ্যাঁ কর্নেল স্বীকার করলেন, কাল আমার খেয়াল হয়নি, ধর্মস্থানে পায়ে জুতো পরে ঢুকতে নেই। তবে যে ছাপ এখন দেখলাম, তা আমার জুতোর ছাপ নয়। অন্য কারও। যে আবদুলের বিছানা তন্নতন্ন খুঁজেছিল, এ নিশ্চয় তারই জুতোর ছাপ।
শানু চমকে উঠে তাকাল সেলিমের দিকে। সেলিম চোখের ইশারায় জানিয়ে দিল, ব্যাপারটা পরে ওকে খুলে বলবে।
কর্নেল পকেট থেকে টর্চ বের করে অন্ধকার জায়গাগুলোও পরীক্ষা করতে ব্যস্ত হলেন। দু বন্ধু অবাক চোখে প্রখ্যাত গোয়েন্দাবুড়োর কীর্তিকলাপ দেখতে থাকল।
একটুপরে কর্নেল এক টুকরো মাটি কুড়িয়ে নিলেন। তারপর বললেন, হুঁ, লোকটা আবদুলবে ফলো করে এসেছিল নদীর ওপার থেকে। তার জুতোয় এই মাটি লেগে ছিল।
