মির্জাসায়েব হাসতে হাসতে বললেন, সারা গায়ে কিন্তু গোখরো সাপের প্রতিশোধের গল্পটাই হিড়িক তুলেছে। তবে লোকে বলছে আবদুল যে সাপটাকে মেরেছিল, সেটা ছদ্মবেশী কালো জিনও হতে পারে।
কর্নেল চুরুট জ্বেলে ধোঁয়ার ভেতর বললেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কী পাওয়া যায়, দেখা যাক।
মির্জাসায়েব অবাক হলেন, কেন? আপনি কি অন্য কিছু সন্দেহ করছেন?
কর্নেল আস্তে বললেন, হুঁ। একটা খটকা বেধেছে।
কী আশ্চর্য, মির্জাসায়েব একটু উত্তেজিতভাবে বললেন, আপনি নিজেই তো বলেছিলেন, মরার সময় বিষাক্ত সাপে-কাটা মানুষেরই স্পষ্ট লক্ষণ দেখেছেন। এমনকী আবদুল সাপ কথাটাও বলেছে। অথচ আপনিই থানায় খবর দিয়ে সদর শহরের মর্গে লাশ পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। খটকাটা কীসের, কর্নেল?
কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, পোড়া-মসজিদের ভেতর আবদুল ইদানীং ডেরা করেছিল। সেই ডেরায় ঢুকে আমি দেখেছি ওর নোংরা বিছানা তছনছ করে রেখেছে কেউ। কেউ-বা কারা যেন কিছু তন্নতন্ন করে খুঁজেছে।
মির্জাসায়েব আবার হাসলেন, কেউ না। আবদুল নিজেই করে থাকতে পারে। ওর খ্যাপামির কথা কে না জানে? হঠাৎ হঠাৎ খ্যাপামির চূড়ান্ত করে ফেলত–আমি নিজেও দেখেছি।
কর্নেল এবার গম্ভীর হয়ে বললেন, যে জিনিসটা কেউ বা কারা অমন তন্নতন্ন করে খুঁজছে, সম্ভবত সেটাই আমি কোনার দিকে মেঝের ফাটলে কুড়িয়ে পেয়েছি।
মির্জাসায়েব চমকে উঠে তাকালেন কর্নেলের মুখের দিকে। তখন কর্নেল পকেট থেকে কাগজে-মোড়া একটা ছোট্ট জিনিস বের করলেন। মোড়ক খুলে টেবিলে সেটা রাখতেই মির্জাসায়েব বলে উঠলেন, এ কী। এটা দেখছি একটা সোনার মোহর।
হ্যাঁ, সোনার মোহর, কর্নেল বললেন, ঐতিহাসিক ধ্বংসস্তূপে দৈবাৎ আবদুল একটা মোহর কুড়িয়ে পেয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা বাই দা বাই, আপনি তো ফার্সিভাষা জানেন। আগে দেখুন তো কী লেখা আছে এতে?
মির্জাসায়েব চশমা পরে মোহরটার একপিঠে দেখতে দেখতে বললেন, হরফগুলো ক্ষয়ে গেছে তবু পড়া যাচ্ছে :
খানখানান লতিফ খান, ২৮ জেলহজ্জ, হিজরি সন ৮৬৩ …একমিনিট, বলে মির্জাসায়েব উঠে গিয়ে বুক সেলফ থেকে একটা বই টেনে বার করলেন। বইটার পাতা উলটে বললেন, ই, ইংরেজি সন তারিখের হিসেবে ২৬ অক্টোবর, ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ। বাংলায় তখন ইলিয়াসশাহি বংশের রাজত্ব। সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদশাহের আমল। রাজধানী তখন ছিল গৌড়ে, বর্তমান মালদহে।
কর্নেল বললেন, এবার উলটো পিঠটা পড়ে দেখুন তো।
মির্জাসায়েব মোহরের উলটো পিঠটা চোখ বুলিয়ে বললেন, একটা ফারসি প্রবচন লেখা আছে দেখছি। সাদামাটা বাংলায় এর মানে হল, সাত বৃদ্ধ যেখানে, মানিক ফলে সেখানে। আসলে প্রাচীন পারস্য দেশে বৃদ্ধদের খুব খাতির করা হতো। কারণ পারসিকরা ভাবত, বৃদ্ধরাই সবচেয়ে জ্ঞানী। আর জ্ঞানকে তুলনা করা হতো মণি-মানিক্যের সঙ্গে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ভারতেও তাই। তবে শুধু বিশেষ বিশেষ দেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশেই প্রাচীন যুগে বৃদ্ধদের জ্ঞানী বলে খুব সম্মান করা হতো। বাংলা প্রবচনেও তত আছে, তিন-মাথা যেখানে, বুদ্ধি নেবে সেখানে।
মির্জাসায়েব অট্টহাসি হেসে বললেন, আমরা দুজনেও বৃদ্ধ। অথচ আজকালকার ছেলেরা যেন বৃদ্ধদের সবতাতেই অস্বীকার করতে চায়।
কর্নেল বললেন, সুতরাং শ্রীমান সেলিম তার দাদুকে আড়াল থেকে ভেংচি কাটতেই পারে।
অমনি দরজার পর্দার ওধারে ধুপ-ধুপ শব্দে এবং খিল-খিল হেসে কার দৌড়ে পালানো টের পাওয়া গেল। মির্জাসায়েব এগিয়ে গিয়ে পরদা তুলে দেখে বললেন, তবে রে বেওকুফ। রোসো দেখাচ্ছি মজা! আড়িপাতা হয়েছিল এখানে। কিন্তু এখানে যে এক বাঘা গোয়েন্দা বসে আছেন, তার নজর এড়ানো কি এতই সোজা?
কর্নেল নিবে-যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন, আচ্ছা মির্জাসায়েব, বাদশাহি মোহরে বাদশাহি গৌরব আর ঈশ্বরের মহিমার কথা লেখা থাকে, এটাই নিয়ম। কিন্তু এই মোহরে, এমন প্রবচন লেখা আছে দেখে অবাক লাগছে না আপনার?
মির্জাসায়েব গম্ভীর হয়ে বসে বললেন, তাই তো। আপনি ঠিকই বলেছেন। অবশ্য ব্যতিক্রম থাকতেও পারে হয়তো।
কর্নেল বললেন, পুরনো মুদ্রাসংক্রান্ত ব্যাপারে আমার কিঞ্চিৎ জ্ঞানগম্যি আছে। এই ব্যতিক্রমটা মেনে নিতে বাধছে। যাই হোক, আবদুলের মৃত্যুর ব্যাপারে আরও একটা খটকা লেগেছিল। সেটা হল, আবদুল শানু ও সেলিমকে বলেছিল, বারো বছর আগে নাকি এ অঞ্চলে ভীষণ বন্যা হয়েছিল এবং আবদুলকে গাছের ডালে পাওয়া গিয়েছিল। সেই থেকে আবদুল এই নবাবগঞ্জে এসে আছে।
মির্জাসায়েব একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, আবার সেই কালো জিনের কথা? জিন-টিন স্রেফ বাজে কথা!
কর্নেল বললেন, এমন তো হতে পারে মির্জাসায়েব, কালো জিন বলতে আবদুল তার কোনও শত্রুকেই বুঝিয়েছিল, যার ভয়ে সে তার দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার সময় বন্যায় ভেসে যায় এবং অনেক কষ্টে একটা গাছে আশ্রয় নেয়?
মির্জাসায়েব একটু থেমে বললেন, তা ঠিক। কিন্তু কোথায় ওর দেশ বা বাড়িঘর ছিল, সেটাই তো কেউ জানে না। আবদুল নিজের কাউকে বলেছে বলে জানি না। আমিই তো ওকে প্রথম আশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রায় এক বছর হাবাগোবার মতো মনে হতো তাকে। ফাইফরমাশ খাটত। কিন্তু কথা বলত খুব কম। শেষে একদিন নিজেই আমার বাড়ি থেকে চলে গেল। শুনলাম শানুদের বাড়ি গিয়ে উঠেছে। ওদের জমিতে মজুর খাটছে।
