দুজনে একগলায় বলে উঠল, বলো আবদুলচাচা!
চত্বরে ভেঙেপড়া দেয়ালের একটা পাথরের চাঙড়ে বসে আবদুল বলল, তোমাদের তো জিন-পরির কত গল্প শুনিয়েছি। জিনরা হল আসমানের মানুষ। তাদের ডানা আছে! তো তাদের মধ্যে দুরকম জিন আছে। সাদা জিন আর কালো জিন। সাদা জিন মানুষের উপকার করে। কালো জিন মানুষের ক্ষেতি করে। তা আজ অনেকদিন পরে একটা কালো জিনের পাল্লায় পড়েছিলাম বাবারা।
দুই বন্ধু একগলায় বলল, সত্যি?
সত্যি, আবদুল একটু করুণ হাসল, বারো বছর আগে ওই কালো জিন একবার আমার পিছু নিয়েছিল। কিন্তু সে আমাকে কাবু করতে পারেনি। এতকাল পরে আবার তাকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে এলাম, সোনারা!
শানু ও সেলিম পরস্পর তাকাতাকি করল। তারপর শানু বলল, যাঃ! তোমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না আবদুলচাচা। তুমিই না বলল, জিন-পরি দিনেরবেলা আকাশ থেকে নামে না, মানুষকে দেখাও দেয় না!
আবদুল গুম হয়ে বলল, সে তো সাদা জিন। এ যে কালো জিন! মানুষের চেহারায় দেখা দেয়। বাগে পেলে মানুষকে জানসুন্ধু খতম করে দেয়। বাবারা, মানিকরা! আর এখানে থেকো না। শিগগির বাড়ি চলে যাও। এই দ্যাখো, আমিও লুকুতে চললাম মসজিদের ভেতর। এই বলে সে সত্যি পোড়ো-মসজিদের ভেতর ঢুকে গেল।
সেলিম খি-খি করে হেসে বলল, এই জন্যই লোকে ওকে আবদুল-খ্যাপা বলে! মুরুকগে, আয় শানু! আর বই-টই নয়। কর্নেলদাদু কটা প্রজাপতি ধরলেন দেখি।
শানু অবাক হয়ে বলল, কর্নেলদাদু। সে আবার কে রে?
সেলিম বলল, ও! তুই তো চিনিসনে ওঁকে। কাল কলকাতা থেকে এসেছেন। আমার দাদুর বন্ধু। নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আবদুলচাঁচার চাইতেও অদ্ভুত লোক রে! মুখে একরাশ সাদা দাড়ি, মাথায় ইয়াব্বড় টাক। যেন ক্রিসমাসের সান্তাক্লজ, বলেই সেলিম নড়ে উঠল, তুই কী রে শানু! ফার্স্ট বয় হলে কি স্কুলের বই ছাড়া কিছু পড়তে নেই? পড়িসনি কর্নেলের অ্যাডভেঞ্চারের কোনও বই?
শানু একটু ভেবে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, পড়েছি মনে হচ্ছে, বলে সেও চঞ্চল হয়ে উঠল, মনে পড়েছে। কর্নেল আর তার সঙ্গী সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর একটা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি পড়েছি। কী আশ্চর্য!
সেলিম বলল, কর্নেল কিন্তু একা এসেছেন। আয়, তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
দুই বন্ধু প্রায় দৌড়ে জঙ্গল ভেঙে এগিয়ে চলল। শানু এত অবাক যে, সাপের ভয়টা একেবারে কেটে গেছে মন থেকে। কালো জিনের কথাও সে ভুলে গেছে। এমন সব সাঙ্ঘাতিক অ্যাডভেঞ্চারের নায়ককে সে সশরীরে শুধু দেখতেই পাবে না, তার সঙ্গে আলাপও হবে, এ তো অকল্পনীয়।
একটু এগিয়ে গিয়ে সেলিম থমকে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল, ওই দ্যাখ!
শানু দেখল, একটা ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রলোক। মাথায় টুপি। পরনে ছাইরঙা জ্যাকেট আর প্যান্ট। কাঁধে ঝুলছে একটা ক্যামেরা। চোখে বাইনোকুলার রেখে তিনি পাখি দেখছেন হয়তো। সেলিম চেঁচিয়ে উঠল, কর্নেলদাদু, তখন কর্নেল ঘুরলেন। শানু হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে সেলিম তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। বলল, কর্নেলদাদু। এর নাম শানু। আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়।
কর্নেল সস্নেহে শানুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমার ডাক নাম তো শানু। আসল নাম কী?
শানু আস্তে বলল, সন্দীপন।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে পোড়া-মসজিদের দিক থেকে একটা আর্তনাদ ভেসে এল। কর্নেল চমকে উঠেছিলেন। সেলিম চমক খাওয়া গলায় বলল, আবদুলচাচার গলা বলে মনে হল!
শানু বলে উঠল, সর্বনাশ। আবদুলচাচাকে কালো জিনটা অ্যাটাক করেনি তো?
কালো জিন, কর্নেল অবাক হয়ে বললেন। তারপর পা বাড়িয়ে ডাকলেন দুই বন্ধুকে, এসো তত, কী ব্যাপার দেখি।
পোড়ো-মসজিদের কাছে পৌঁছতেই চোখে পড়ল চত্বরে পড়ে আবদুল ছটফট করছে যন্ত্রণায়। কর্নেল এক লাফে চত্বরে উঠে আবদুলের কাছে গেলেন। ব্যস্তভাবে বললেন, কী হয়েছে তোমার?
আবদুল অতি কষ্টে ঠোঁট ফাঁক করে বলল, সা-সা- তারপর তার লম্বা-চওড়া শরীরটা হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তার ঠোঁটের পাশে চাপচাপ ফেনা আর রক্ত।
শানু আর্তনাদের সুরে বলল উঠল, সাপ! সাপ! সেই সাপটা!….
.
০২.
ব্রেকফাস্ট টেবিলে মুখোমুখি বসে কর্নেল আর মির্জা গোলাম হায়দার কথা বলছিলেন। কর্নেল বললেন, বিষাক্ত সাপের প্রতিশোধ নেওয়ার অনেক গল্প আমিও শুনেছি। কাগজেও খবর বেরিয়েছিল সে-বার।
মির্জাসায়েব বললেন, গ্রামাঞ্চলে লোকেরা এটা বিশ্বাস করে বলেই বিষাক্ত সাপ মেরে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। কিন্তু সেলিম বলল, কিছুক্ষণ আগে নাকি আবদুল বলেছিল, একটা কালো জিন তাকে তাড়া করেছিল–
কর্নেল কথা কেড়ে বললেন, হ্যাঁ, বারো বছর আগেও নাকি একবার ওই কালো জিনটা তাকে তাড়া করেছিল!
মির্জাসায়েব হেসে উঠলেন হো-হা করে। আবদুলখ্যাপা উদ্ভটে সব গল্প শোনাত ছেলেপুলেকে। ভূত প্রেত ও জিন-পরিতে আমার বিশ্বাস নেই, সে তো আপনি জানেন কর্নেল। যৌবনে একসময় শিকারের নেশায় কত জঙ্গলে একা রাত কাটিয়েছি। কখনও কোনও অশরীরীর হদিশ পাইনি, যদিও আমি শুনেছি বহু শিকারি নাকি কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। প্রখ্যাত শিকারি জিম করবেটও ভূতে বিশ্বাস করতেন।
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে আনমনে শুধু সায় দিলেন। নবাবগঞ্জের এই অংশটায় শহরের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ আছে। বাজার আছে। একটি হাইওয়ে চলে গেছে গা ঘেঁসে সুদূর কলকাতার দিকে। মির্জাসায়েবের বাড়িটি বিশাল। এঁরা এখানকার বনেদি মুসলিম পরিবার। এঁরা নিজেদের সেই তুর্কি সুলতানের বংশধর বলে দাবি করেন, নদীর ধারে যাঁর রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় এখনও।
