এ সব গল্প শোনার পর শানু বড্ড ভয় পেত এখানে আসতে। একটু শব্দ হলেই চমকে উঠত, এই বুঝি বাঘ এসে হালুম করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু আবদুলকে এখানে দেখার পর থেকে তার সে-ভয় ঘুচে যায়।
তবে আবদুলের মুখে এই পোডো-মসজিদের ভূত-পেরেতের গল্প শোনার পর থেকে তার গা ছম-ছম করেও বটে। তাছাড়া শুধু কি ভূত-পেরেত? আকাশ থেকে নাকি জিন-পরিরাও এখানে আসে। কিন্তু আবদুল এও বলেছে, সে তো সবই রাতের বেলায়। দিন-দুপুরে মানুষের কাছে ঘেঁসে এমন সাধ্যি ওদের নেই। ভূত-পেরেত বলল, জিন-পরি বলো, সব্বাই মানুষকে বড় ভয় পায়। এ দুনিয়ায় মানুষের চেয়ে ভয়ানক জীব আর কিছু নেই রে সোনা।
চত্বরে বসে শানু আজ আনমনা। মাঝে-মাঝে আবদুলচাচা কতরকম অদ্ভুত কথা বলে বটে; কিন্তু মানুষ কথাটা কেন অমন করে বলে সে? আবদুলের কথাটা তার মনে প্রতিধ্বনি তুলছিল, মানুষের মধ্যেও কিছু গোখরা আছে।
আজ ছুটির দিনের দুপুরবেলা। সবে শীত পড়েছে। শেষ হেমন্তের রোদ্দুর এখনও ঝকমকে। তবে গাছপালা, ঝোপঝাড় আর ঘাসের সেই গাঢ় সবুজ রঙের চেকনাই ভাবটি ক্ষয়ে গেছে। চত্বরে বসে শানু দেখতে পাচ্ছিল, নদীর ওপারে সাদা ফুলে ভরা শবনের ভেতর একা হেঁটে চলেছে। আবদুলচাচা। কিন্তু কোথায় চলেছে সে?
গোখরো সাপ দেখার পর থেকে আজ কিছুতেই পড়ায় মন বসছিল না শানুর। মাঝে-মাঝে মুখ তুলে এদিকে-ওদিকে দেখে নিচ্ছিল। তার ভয় হচ্ছিল, আবদুলচাচা তো মরা ভেবে গোখরো। সাপটাকে ছুঁড়ে ফেলল। সেটা যদি সত্যি না মারা পড়ে থাকে? গাঁয়ের লোকে বিষাক্ত সাপ মেরে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। তাদের বিশ্বাস, তা না করলে সাপটা আবার বেঁচে উঠবে এবং যে তাকে মেরেছে তাকে ছোবল মারার জন্য ওত পেতে বেড়াবে। বেড়ালের নাকি নটা প্রাণ। আর সাপের নাকি একশ নটা!
কিন্তু আবদুল এমন উদ্ভুটে নোক যে, সে-কথা বিশ্বাসই করে না দেখা যাচ্ছে।
শানুর ভয় হচ্ছিল, সাপটা হয়তো বেঁচে উঠেছে এতক্ষণে এবং আবদুলের সঙ্গে তাকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে। কারণ, আবদুল তো আসলে শানুকে বাঁচানোর জন্যই সাপটার মাথায় ইট ছুঁড়ে মেরেছিল।
শানু এই ভেবে ঘাসজমিটার দিকে তাকাচ্ছে, কখনও নদীর ওপর কাশবনের ভেতর আবদুলকে লক্ষ করছে, এমন সময় টুপ করে একটুকরো ঢিল এসে পড়ল চত্বরে। অমনি শানু আঁতকে উঠল। তত ভিতু ছেলে সে নয়। কিন্তু এখন সে অবস্থাটাই অন্যরকম। টুপ-টুপ করে আবার কয়েকটা টিল এসে পড়তেই শানু বই গুটিয়ে উঠে দাঁড়াল।
অমনি মসজিদের ওপাশ থেকে হি-হি হাসি শোনা গেল। তারপর শানু দেখল, ভূত-টুত নয়, মির্জাবাড়ির ছেলে, শানুরই সহপাঠী ও বন্ধু সেলিম হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে।
সেলিম চোখ নাচিয়ে বলল, কী রে? খুব যে বড়াই করিস, ভূতের ভয় নাকি তোর নেই?
শানু অপ্রস্তুত হেসে বলল, ভ্যাটু! আমি কি ভয় পেরেছিলাম নাকি?
সেলিম ভেংচি কেটে বলল, না! তাইতো বই গুটিয়ে শ্রীমান ফার্স্টবয় উঠে দাঁড়িয়েছিল? হাতে আমার ক্যামেরাটা থাকলে তোর পোজখানা তুলে রাখতাম, আর ক্লাসসুদ্ধ সবাইকে দেখতাম!
শানু হার মেনে বলল, হঠাৎ অমন করে এমন জায়গায় ঢিল পড়লে তুই কেন, আবদুলচাচাও আঁতকে উঠত।
সেলিম হঠাৎ শানুর হাত ধরে বলল, শানু! দ্যাখ, দ্যাখ। আবদুলচাচা দৌড়ে আসছে কেন?
নদীর ওপারে আবদুলকে দৌড়ে আসতে দেখে শানুর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। তা হলে কি সত্যিই মরা গোখরোটা জ্যান্ত হয়ে ওকে তাড়া করে গেছে এবং ছোবল দিয়েছে? শানু ঝটপট সেলিমকে একটু-আগের ঘটনাটা শুনিয়ে দিল। ততক্ষণে আবদুল এসে নদীতে নেমেছে।
নদীটা ছোট্ট। হেমন্তের শেষে তার বুকে এখন হাঁটুজল। এখানে-সেখানে বালির চড়া জমেছে। আবদুল জল ভেঙে এপারে পৌঁছল। তারপর একটা হাত কপালে রেখে সূর্যকে আড়াল করে পুবের ওই কাশবনে যেন কী দেখতে থাকল।
তখন উদ্বিগ্ন শানু চেঁচিয়ে তাকে ডাকল, আবদুলচাচা, আবদুলচাচা। কী হয়েছে?
শানুর ডাক শুনে আবদুল এদিকে ঘুরল। কিন্তু তার মুখে হাসি দেখা গেল। সে লম্বা পায়ে এগিয়ে এসে এক লাফে পোভড়া-মসজিদের চত্বরে উঠল। তারপর সেলিমকে দেখে বলল, তুমিও আছ দেখছি গোশানুর জন্যে পাকা বুনোকুল আনতে গিয়েছিলাম ওপারে। এই দ্যাখো, কী রসালো কুল ধরেছিল কুলের জঙ্গলে। নাও, দুই বন্ধুতে মিলে খাও!
সে কোঁচড় থেকে একরাশ সোনালি কুল ঢেলে দিল চত্বরে। সেলিম ঝাঁপিয়ে পড়ল। শানু তবু আবদুলের দিকে তাকিয়ে আছে। আবদুল বলল, এই মলো। হাঁ করে কী দেখছ তুমি?
শানু বলল, তুমি অমন করে দৌড়ে এলে। তারপর—
তার কথা কেড়ে আবদুল বলল, ও কিছু না। তুমি কুল খাও দিকি। ওই দ্যাখো, বুড়ো মির্জার নাতি একাই সব সাবাড় করে ফেলল!
শানু দেখল সত্যিই বটে। সেলিম টপাটপ কুলগুলো মুখে পুরছে আর যেন আঁটিসুষ্ঠু চিবিয়ে খাচ্ছে। শানুও এবার ভাগ বসাল। কাড়াকাড়ি করে দুই বন্ধুতে কুল খেতে লাগল। একটু পরে শানু দেখল, আবদুল তেমনি দাঁড়িয়ে নদীর ওপারটা দেখছে। ব্যাপারটা সেলিমও লক্ষ করেছিল। এবার। বলল, আবদুলচাচা, ব্যাপারটার খুলে না বললে আমরা আর তোমার কুল খাব না। এমনকী, তোমার সঙ্গে কথাও বলব না।
আবদুল ঘুরে দুই বন্ধুর দিকে তাকাল এ বার তার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর। পরমুহূর্তে সে একটু হাসল। বলল, তাহলে একটু খুলেই বলি, সোনারা!
