ঘাসের ভেতর থেকে আচমকা একটা গোখরো সাপ ফোঁস করে ফণা তুলল। অমনি এক লাফে পিছিয়ে এল শানু। পাড়াগাঁয়ের ছেলে। সাপ কখনও দ্যাখেনি তা নয়। কিন্তু এমন করে বিষাক্ত সাপের মুখোমুখি কখনও হয়নি। তাছাড়া নদীর ধারে এই জঙ্গুলে নিরিবিলি জায়গায় সে প্রায় রোজই আসে। এই খোলামেলা ঘাসের জমি পেরিয়ে নবাবি আমলের পোড়া-মসজিদটার উঁচু চত্বরে যায়। সেখানে বসে স্কুলের বই পড়ে। সামনে পরীক্ষা। এদিকে বাড়িতে বড্ড বেশি হইচই।
কিন্তু এখানে একটা গোখরো সাপ থাকতে পারে, সে-কথা শানুর মাথায় আসেনি। আর সাপটাও কী প্রকাণ্ড! রোদ্দুরে ঝলমল করছে তার বিশাল চক্কর। লকলক করছে সরু জিভ। নিষ্পলক নীল চোখে সে শানুকেই দেখছে যেন।
তারপরই তেমনি আচমকা কোত্থেকে এক-টুকরো ইট এসে পড়ল ফণা-তোলা সাপটার মাথায়। সঙ্গে-সঙ্গে নেতিয়ে পড়ল সেটা। লেজটা ঘাসের ভেতর প্রচণ্ড নড়তে থাকল।
শানু অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। তারপর আবার একটুকরো ইট এসে পড়ল সাপটার ওপর। ছটফটানি থেমে গেল ক্রমশ। তখন শানু দেখল, ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে, আর কেউ না, স্বয়ং আবদুলচাচা, নবাবগঞ্জ গ্রামের লোকে যাকে বলে আবদুলখ্যাপা।
শানুর মুখে এতক্ষণে কথা ফুটল। বলল, আবদুলচাচা।
একটু খ্যাপাটে চালচলনের জন্য গাঁয়ের লোকে তাকে আবদুলখ্যাপা বলে বটে, কিন্তু সবাই যেমন জানে, তেমনি শানুও জানে, লোকটা সত্যি-সত্যি খ্যাপামানুষ নয়। আসলে সে বড় খামখেয়ালি। এ গাঁয়ে তার ঘরদোর বলতে কিছু নেই। কখনও কোথাও ছিল কিনা সেটাই বিশ্বাস হয় না লোকের। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ফাইফরমাশ খেটে বেড়ায়। পয়সাকড়ি পায়-টায় না। শুধু দুমুঠো খেতে পেলেই সে খুশি। যেখানে-সেখানে সে খুঁজে নেয় রাত কাটানোর ডেরা। শানু জানে, ইদানিং সে গাঁয়ের বাইরে নদীর ধারে জঙ্গলের ভেতর পোড়া-মসজিদটাকেই ডেরা করে ফেলেছে। এখানে নির্জনে পড়াশুনো করতে এসেই শানুর সঙ্গে তার ভাব হয়েছে। শানু তাকে চাচা বলে ডাকে। শানু যতক্ষণ পড়াশুনো করে আবদুল থাকলে তাকে এতটুকুও বিরক্ত করে না। কিন্তু পড়া শেষ হলে শানু আবদুলচাচা বলে ডাকলেই সে হাসিমুখে বেরিয়ে আসে মসজিদ থেকে। শানুর পাশে বসে পড়ে। তারপর সে তার গল্পের ঝুলি খোলে। কত অদ্ভুত অদ্ভুত গল্পই না। জানে আবদুল। শানু অবাক হয়ে শোনে। কতদিন তার সাধ জাগে, এই নিঝুম পুরনো নবাবি মসজিদে আবদুলচাচার সঙ্গে সে রাত কাটাবে, আর দেখতে পাবে জ্যোৎস্না-রাতে ছায়ামূর্তিগুলো এসে সার বেঁধে নমাজ পড়ছে। তাদের মধ্যে আছেন ইতিহাসের বইতে পড়া সেই সব সুলতান, উজির, আমির-ওমরার আত্মারা! ভাবতেই শানুর গা শিউরে ওঠে।
আবদুলের পরনে খাটো ঘেঁড়াখোঁড়া একটা নীলচে লুঙ্গি। খালি গা। তার মুখে খোঁচা খোঁচা একরাশ গোঁফদাড়ি। একমাথা ঝাকড়া চুল। মুখে হাসিটি সবসময় লেগেই আছে। শুধু তার বড় বড় চোখদুটি কেমন যেন রহস্যময় মনে হয় শানুর। তবে আবদুলের শরীরখানি বেশ তাগড়াই। জোরও কম নেই। একসময় শানুদের জমিতেও সে মজুর খেটেছে।
শানু তার বাবার কাছে শুনেছে, শানুর তখন তিন বছর বয়স, সে ছিল এক ভয়ঙ্কর বন্যার বছর। নদীর ওপারে বিস্তীর্ণ উলুকাশের জঙ্গলে বন্যার জলে সেবার অথৈ সাগর হয়ে উঠেছিল। সেখানে একটা হিজল-গাছের ডগা থেকে চিৎকার শুনে রিলিফের নৌকোয় লোকেরা গিয়ে দ্যাখে, একটা লোক গাছের ডালে বসে আছে। তারা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। সেই এই আবদুল। তারপর থেকে সে এই নবাবগঞ্জেই থেকে গেল। ……।
শানু অবাক হয়ে দেখছিল, আবদুল মরা সাপটির লেজ ধরে মাথার ওপর চরকির মতো বারকতক পাক খাইয়ে ছুঁড়ে ফেলল ঝোপের ওদিকে। তারপর হাসিমুখ শানুর সামনে দাঁড়াল। বলল, ভয় পেয়েছিল, মালিক? হুঁ, গোখরো বলে কথা। তবে কিনা, মানুষের মধ্যেও কিছু-কিছু গোখরো আছে।
শানু চমকে উঠে বলল, কেন ও কথা বলছ আবদুলচাচা?
আবদুল সে-প্রশ্নের জবাব দিল না। বলল, যাও যাও। লেখাপড়া করো গে। আমি ততক্ষণ নদীর ওপারটা ঘুরে আসি।
শানু এবার ঘাসের ভেতর সতর্ক দৃষ্টি রেখে হাঁটতে থাকল। আবদুল ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে নদীর দিকে চলে গেল। গম্বুজওয়ালা মসজিদটির দশা জীর্ণ। এদিকে-সেদিকে কিছু-কিছু ধ্বংসস্তূপ আছে। সেগুলিতে জঙ্গল গজিয়েছে। বোঝা যায়, প্রাচীন সময়ে এখানেই বসতি ছিল। কিংবদন্তি আছে, এখানে নাকি ছিল কোনও এক সুলতানের রাজধানী। এখনও জঙ্গল আর চাষের জমিতে কিছু চিহ্ন চোখে পড়ে। এক-টুকরো কারুকার্য করা পাথর, কিংবা একটা স্তূপ। কোথাও বা একটা শ্যাওলা-ধরা ফটকের একাংশ। …
পোড়া মসজিদের উঁচু চত্বরটি পাথরের। কোথাও কোথাও ফাটল ধরেছে। গজিয়ে উঠেছে কোনও উদ্ভিদ। ভেতরে রাজ্যের চামচিকের আস্তানা। একদিন একটা শেয়ালকেও বেরিয়ে আসতে দেখেছিল শানু। শেয়ালটা যেন ভারি অবাক হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল কযেক মুহূর্ত। যেন মনে-মনে বলছিল, এ ছেলেটা আবার কে রে বাবা- এখানে পড়াশোনা করতে আসে? শানু সেই ভেবেই শেয়ালটাকে দেখে হেসে ফেলেছিল। অমনি শেয়ালটা একলাফে চত্বর থেকে নেমে উধাও।
একসময় নাকি এইসব জঙ্গলে বাঘও থাকত। শানুর ঠাকমা বলেন, কত রাতে বাঘের ডাকও নাকি শুনেছেন। শানুর বাবা বলেন, ওই পোড়ো-মসজিদের ভেতরই তো বাঘের ডেরা ছিল। ওখানেই তো শেষ বাঘটাকে গুলি করে মেরেছিলেন মির্জাসায়েব। মির্জাসাহেব তখন এ জেলার নামকরা শিকারি।
