দরজা খুলে এক প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে কর্নেলকে দেখে যেন চমকে উঠলেন। কাঁপা-কাঁপা গলায় বললেন, কোত্থেকে আসছেন আপনারা?
কর্নেল বললেন, কলকাতা থেকে আসছি। একটা কথা বলেই চলে যাব।
উনি তো অসুস্থ।
নাহ। কথাটা আপনার সঙ্গে।
আমার সঙ্গে? কী কথা?
আপনি কি ঠাকুরবাড়িতে সাধুবাবার আসরে যেতেন?
ভদ্রমহিলা আবার চমকে উঠেই সামলে নিলেন। কেন সে-কথা জিগ্যেস করছেন বাবা? আপনারা কি পুলিশের লোক? আমরা কোনও সাতেপাঁচে থাকি না।
আমার কথার জবাব দিলে খুশি হব। ঠিক জবাব না পেলে কিন্তু ঝামেলায় পড়বেন।
কর্নেলের কথার ভঙ্গিতে ভয় পেলেন ভদ্রমহিলা। বললেন, আমরা তো কারও কোনও ক্ষতি করিনি বাবা!
আপনি কি সাধুবাবার আসরে যেতেন?
ঠাকুরমশাইয়ের স্ত্রী আস্তে বললেন, একদিন গিয়েছিলাম।
শুক্রবার সন্ধেয়?
হ্যাঁ বাবা।
কতক্ষণ ছিলেন আসরে?
যতক্ষণ ভাগবতপাঠ হল, ততক্ষণ ছিলাম।
সবাই চলে গেলে আপনি কি সাধুবাবার সঙ্গে চুপিচুপি দেখা করেছিলেন?
ভদ্রমহিলা শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, হ্যাঁ। তা-
আপনি তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন কেন?
ঠাকুরমশাইয়ের স্ত্রী চুপ করে থাকলেন।
বলুন। তা না হলে ঝামেলায় পড়বেন কিন্তু।
এই সময় ঘরের ভেতর থেকে খ্যানখেনে গলায় কে বলে উঠল, বলে দাও না। এত ভয় কীসের? ভুতো নিজের পাপের শাস্তি পেয়েছে। একদিন না-একদিন সে খুন হতোই। হয়েছে। পুলিশকে বলে দাও সব কথা।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, সাধুবাবাকে আপনি চিনতে পেরেছিলেন। তাই না? সেইজন্য চুপিচুপি তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কী বলেছিলেন আপনি তখন আপনার ভুতোঠাকুরপোকে?
ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন। ওকে বললাম, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। আর কিছুদিন থাকলে আরও অনেকে চিনে ফেলবে। তুমি শিগগির পালিয়ে যাও ঠাকুরপো। হঠাৎ সেই রাত্তিরে ঠাকুরপো খুন হয়ে গেল। চাপ-চাপ রক্ত।
কর্নেল বললেন, আপনার ঠাকুরপো ভূতনাথের নামে পুলিশের হুলিয়া জারি করা আছে। এলাকার কয়েকটা ডাকাতির মামলা ঝুলছে তার নামে।
জানি। সেইজন্যই তো
হ্যাঁ। তাই তাকে চিরদিনের জন্য বেঁচে যাওয়ার একটা ফন্দি দিয়েছিলেন। আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করছি।
কথাটা বলেই কর্নেল হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন। আমি হতবাক হয়ে ওঁকে অনুসরণ করলাম। ….
বাংলোয় ফিরে দেখি, পাঁচুগোপালবাবু অপেক্ষা করছেন। কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ। কর্নেলকে দেখে উত্তেজিতভাবে বললেন, অনেক খুঁজে পেয়ে গেছি স্যার। আপনি যা বলেছিলেন, ঠিক তা-ই।
কর্নেল বললেন, জুতো?
আজ্ঞে। বলে পাঁচুগোপালবাবু ব্যাগে হাত ঢোকালেন।
এখানে নয়। আমার ঘরে চলুন।
ঘরে ঢুকে পাঁচুগোপালবাবু ব্যাগ থেকে দুপাটি পামশু বের করলেন। জীর্ণ বেরঙা ঘেঁড়া বেটপ জুতো। বললেন, ঠাকুরদার সিন্দুকের তলায় লুকানো ছিল স্যার। ঠাকুরদার জুতোই মনে হচ্ছে। ইস! কী বিচ্ছিরি গন্ধ!
কর্নেল জুতোজাড়া নিয়ে খুঁটিয়ে দেখে টেবিলে রাখলেন। বললেন, এবার আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। রাজবাড়ির ওদিকটায় এতক্ষণে ঘন অন্ধকার। আপনি সেখানে গিয়ে এই গানটা গাইবেন
গা-গান? আমি স্যার গান গাইতে পারি না যে!
চেষ্টা করবেন। নিন, মুখস্থ করুন :
চলে আয় ওরে ভুতো
পায়ে দিবি রাঙা জুতো।
পাঁচুগোপালবাবু অনিচ্ছা-অনিচ্ছা করে আওড়ালেন। তারপর করুণমুখে বললেন, কে-কেন গান গাইতে হবে স্যার? আমার তো মাথায় কিছু ঢুকছে না!
আপনার জুতো-চোর ভূতটাকে ধরতে হবে না? তিন-তিনজোড়া জুতো চুরি করেছেন সে। তাকে ধরা উচিত নয় কি?
এই সময় একজন পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকে হাসিমুখে বললেন, বডি পাওয়া গেছে কর্নেলসায়েব! শকুনে প্রায় সাবাড় করেছে। তবে স্কেলিটনটা আছে। বেশি দূরে ভেসে যায়নি। মাত্র দুকিলোমিটার দূরে একটা খাড়িতে ভাসছিল। মুন্ডু-কাটা বডি।
পাঁচুগোপালবাবু লাফিয়ে উঠলেন। সাধুবাবার বডি?
কর্নেল বললেন, নাহ। আপনার ভুলোর।
পাঁচুগোপালবাবু আর্তনাদ করলেন, হায়, হায়। ভুলোকে কে মারল?
ভুতো। বলে কর্নেল উঠলেন। আপনার ঠাকুরদার জুতোজোড়া নিন। চলুন, ভুতোকে ফাঁদে ফেলা যাক।
পুলিশ জিপ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। অফিসার কর্নেলের স•ে চুপি চুপি পরামর্শ করে চলে । গেলেন। কর্নেল পাঁচুগোপালবাবুকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চললেন।
ঘুরঘুটে অন্ধকার এলাকা। এবার কর্নেল টর্চ জ্বালছিলেন না। কিছুক্ষণ পরে একটা কালো ঢিবির পাশে গুঁড়ি মেরে বসলেন। তারপর পাঁচুগোপালবাবুকে চাপাস্বরে বললেন, সামনে দাঁড়িয়ে জোরে গানটা শুরু করুন।
ভদ্রলোক কেশে গলা সাফ করে হেঁড়ে গলায় সুর ধরে আওড়ালেন :
চলে আয় ওরে ভুতো
পায়ে দিবি রাঙা জুতো।
বারকতক গাওয়ার পর কালো ছায়ামূর্তি ভেসে উঠল ওঁর সামনে। খোনা গলায় বলে উঠল, এঁনেছিস? দে! দে!
পাঁচুগোপাল চেঁচিয়ে উঠেছিলেন আতঙ্কে। ওরে বাবা! এ যে দেখছি সত্যিই ভূ-ভূ-ভূত!
অমনই এদিক-ওদিক থেকে টর্চের আলো জ্বলে উঠল। একটা সাধুবাবার চেহারার লোক পালানোর জন্য লাফ দিতেই কর্নেল গিয়ে তাকে ধরে ফেললেন। দুজন কনস্টেবলকে দেখলাম লোকটার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল। কর্নেল তার দাড়ি-জটা উপড়ে নিয়ে বললেন, ছদ্মবেশী সাধুবাবাকে চিনতে পারছেন না পাঁচুগোপালবাবু? রাজমন্দিরের সেবায়েত ঘনশ্যামবাবুর ভাই ভূতনাথ। আপনার ভুলোর মুন্ডু কেটে রক্ত ছড়িয়ে আত্মগোপন করেছিল। আপনার ঠাকুরদার দুপাটি জুতোর সোলের ভেতর লুকিয়ে রাখা দশটা সোনার মোহরের খবর বহুদিন আগে ভূতনাথ পেয়েছিল আপনার দিদির কাছে। আপনার দিদি কথায়-কথায় মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন ওকে। পরে বুদ্ধি করে বলেছিলেন, সেই মোহর আপনার জুতোর সোলে লুকনো আছে। তখন আপনি রেলের চাকরি করেন। ট্রেনে-ট্রেনে ঘোরেন। ভূতনাথ তাই সুযোগ পায়নি। আপনি রিটায়ার করে বাড়ি ফেরার পর তাই সে আপনার জুতো চুরির ধান্দা করেছিল। যাই হোক, চলুন। বাংলোয় ফেরা যাক।
২.১২ কালো গোখরো
০১.
