-এই মারুতি গাড়িটা কোন দিক থেকে এসেছিল, আপনি দেখেছিলেন?
-না। তবে অজয়ের হাতে সেলফোন দেখেছিলাম। আমার ধারণা, ওই ফোনে সে গাড়িটাকে আনতে বলেছিল।
-তারপর আপনাকে এই গাড়িতে চাপিয়ে অজয়েন্দু চন্দ্রপুর নিয়ে গিয়েছিল?
-তাই হবে। মাথা তখন ঝিমঝিম করছিল। শুধু মনে আছে, একটা বাড়ির দোতলায় আমাকে খেতে দিয়েছিল।
-তারপর আজ বিকেলে আপনাকে এই গাড়িতে চাপিয়ে তিতলিপুরের জঙ্গলে নিয়ে এসেছিল।
-হ্যাঁ। অজয়ের দৃঢ় বিশ্বাস, শম্ভু আর আমি ওর চোরাই মাল বেচে অনেক টাকা পেয়েছি। শম্ভুকে খুঁজে না পেয়ে অজয়েন্দু আমার ওপর লক্ষ্য রেখেছিল। নিশ্চয় সুশীলাকে টাকা খাইয়ে বশ করেছিল সে।
–আপনার কাছে গচ্ছিত রাখা জিনিসটা কী, তা আপনি কি জানেন?
–জানতাম। কায়রো মিউজিয়াম থেকে চুরি করে আনা একটা পার্চমেন্ট। পেতলের নলে সেটা ভরা ছিল। তখন অজয়ে ফেরারি আসামি। গোপনে একরাত্রে আমার কাছে ওটা রাখতে এসেছিল।
-ওটার সঙ্গে কোনও ফলক ছিল না?
-না। …ও হ্যাঁ। অজয়ে বলেছিল, একটা ব্রোঞ্জের ফলকও ছিল। সেটা শম্ভু হাতিয়ে নিয়েছিল।
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন–অজয়েন্দ্র রায় ঠিক কথা বলেনি। সে নিজেই ওটা তার দাদা দীপনারায়ণকে রাখতে দিয়েছিল। দীপনারায়ণ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শম্ভুকে ওটা বেচবেন বলে টাকাকড়ি অগ্রিম নিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে সেটা হারিয়ে যায়। সেই আক্রোশে শম্ভু সম্প্রতি এক রাত্রে দীপনারায়ণবাবুকে খুন করেছে।
আমি কিছু জানি না। বলে ক্যাপটেন সিনহা আমার দিকে তাকালেন–বাবা! একটু জল খাওয়াতে পারো? গলা শুকিয়ে গেছে।
পিছনে থেকে কর্নেল তার জলের বোতল এগিয়ে দিলেন। ক্যাপটেন সিনহা অতিকষ্টে কিছুটা জল খেলেন। কিছুটা তার প্যান্ট ভিজিয়ে দিল। …
চন্দ্রপুর থানা থেকে পুলিশের দুটো গাড়ি এসেছিল। একটা গাড়ি আমায় ও হালদারমশাইকে ফরেস্ট বাংলোয় পৌঁছে দিয়েছিল। কর্নেল অন্য গাড়িতে ও. সি. মি. হাটিকে তিতলিপুর জঙ্গলে সেই পাতালঘর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্যাপটেন সিংহকে চন্দ্রপুরে একটা নার্সিংহোমে রাখা হয়েছিল।
গোয়েন্দাবরের খুব ইচ্ছা ছিল, তিনিও কর্নেলের সঙ্গে যাবেন। কিন্তু কর্নেল বলেছিলেন আপনি আর জয়ন্ত একত্র থাকা দরকার। এখনও আমরা বিপদের মধ্যে আছি। জাহাজিবাবুর গ্যাংয়ের লোকেরা সবাই ধরা পড়েনি।
কর্নেল ফিরে এসেছিলেন রাত এগারোটায়। পাতালঘরে দেশবিদেশের কিছু দেবমূর্তি, সোনাদানার অলংকার আর কয়েক প্যাকেট বিস্ফোরক ছিল। আর একটা কথা–সেই ট্যাক্সিচালকের খোঁজ পাওয়া গেছে। লালবাজার থেকে নরেশ ধর চন্দ্রপুর থানায় জানিয়েছেন কাল সকালে তাকে নিয়ে চন্দ্রপুরে আসছেন।
জিজ্ঞেস করেছিলাম–কালকের দিনটাও এখানে আমরা থাকব নাকি?
-না জয়ন্ত! আমরা কাল সকালেই কলকাতা ফিরব। হালদারমশাই তাঁর মক্কেল ক্যাপটেন সিনহার জন্য থেকে যেতে পারেন অবশ্য!
গোয়েন্দাপ্রবর মাথা নেড়ে বলেছিলেন–না কর্নেলস্যার! আমার মক্কেল নার্সিংহোমে আছেন। পুলিশ ওনার দেখভাল করতাছে। আমার কাজ শেষ।
আমি বললাম–আচ্ছা কর্নেল! মিশরের রানি নেকারতিতির চিঠি আর সেই ফলকটার কী ব্যবস্থা করবেন?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন–বেচলে কোটিপতি হতাম। কিন্তু অত টাকা নিয়ে করবটা কী? তার চেয়ে ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রকের মধ্যস্থতায় মিশরের রাষ্ট্রদূতের হাতে সমর্পণ করব। দেখব, কী হইচই পড়ে যায়। পৃথিবী সব দেশের টিভিতে সেই দৃশ্য দেখা যাবে।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ খি খি করে হেসে বললেন–আমাগো য্যান বাদ দিবেন না কর্নেলস্যার! কী কন জয়ন্তবাবু?
সায় দিয়ে বললাম–ঠিক বলেছেন হালদারমশাই। …
২.১১ জুতো রহস্য
ভদ্রলোক দরজার পর্দার ফাঁকে উঁকি মেরে কাঁচুমাচু মুখে বললেন, জুতা পায়ে ঢুকতে পারি স্যার?
নিশ্চয় পারেন। তবে খুলে রেখে এলেও আপনার নতুন জুতো যে চুরি যাবে না, সে-গ্যারান্টি আমি দিতে পারি।
অ্যাই! তা হলে যথাস্থানেই এসেছি। বলে ভদ্রলোক হন্তদন্ত ঘরে ঢুকলেন। তারপর সোফায় বসে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। আমার ভাগ্নে গোকুল স্যার, আপনি চেনেন ওকে–বাবুগঞ্জ ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার। আপনার ঠিকানা দিয়ে বলল, এর কিনারা করতে আপনিই পারবেন।
জুতো চুরির?
আজ্ঞে।
কজোড়া চুরি গেছে এ-পর্যন্ত?
তিনজোড়া। ভদ্রলোক, করুণমুখে বললেন, এ-বাজারে একজোড়া চামড়ার জুতোর দাম চিন্তা করুন স্যার। এক সপ্তায় তিন-তিনজোড়া জুতো লোপাট। গত রোববার থেকে শুরু। রোববার সন্ধেবেলায়। তারপর বিদবার ঠিক সেই সন্ধেবেলায় আবার লোপাট। শুক্রবার ফের কিনলাম। ফের সেদিনই সন্ধেবেলা লোপাট হয়ে গেল। এ কেমন চোর স্যার, সবার জুতো ঠিকঠাক পড়ে থাকে, আর আমার জুতোই ব্যাটাছেলে নিয়ে পালায়? নতুন জুতো তো আরও কত লোকে পরে যায়। তাদের জুতো ভুলেও ছোঁয় না। খালি আমার জুতো!
ঠাকুরবাড়ির দরজা থেকে?
ঠিক ধরেছেন স্যার। রাজাদের ঠাকুরবাড়ি। কবে ওঁরা কলকাতায় চলে এসেছেন। দালান-কোঠা সবই ধসে পড়েছে। শুধু ঠাকুরবাড়িটাই কোনওরকমে টিকে ছিল। পোড়া খাঁ-খাঁ অবস্থা। দেবতার নামে জমি আছে! কিন্তু পুজো-আচ্চা বন্ধ ছিল। সেবায়েত থাকলে কী হবে? পায়ে বাত। চলাফেরা করতে পারে না। নিজের ঘরে শুয়েই নমো-নমো। বুঝলেন তো স্যার?
