বুঝলাম! তারপর কোনও সাধু-সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হল ঠাকুরবাড়িতে?
অ্যাই! ভদ্রলোক নড়ে বসলেন। গোকুল যা বলছিল ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে।
তিনি আসার পর রোজ সন্ধে থেকে শাস্ত্রপাঠ-কথকতা-কীর্তনের আসর বসছিল?
আজ্ঞে। ভদ্রলোক আবার নড়ে বসলেন। গোকুল যা বলছিল-
আপনার নাম কী?
পাঁচুগোপাল সিংহ।
আপনার বাবার নাম?
আজ্ঞে যদুগোপাল সিংহ। তিনি আমার ছোটবেলায়
আপনার ঠাকুরদার নাম?
জয়গোপাল সিংহ।
তিনি কী করতেন?
তিনি রাজবাড়ির খাজাঞ্চি ছিলেন।
খাজাঞ্চি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। খাজাঞ্চি মানে ক্যাশিয়ার স্যার। আজকাল খাজাঞ্চি বললে-
আপনার বাবা কী করতেন?
রাজবাড়ির সেরেস্তাদার–মানে অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন।
আপনি কী করেন?
রেলে টিকিটচেকার ছিলাম। গত মাসে রিটায়ার করে পৈতৃক বাড়িতে এসে উঠেছি। বিয়ে-টিয়ে করিনি। আমার বিধবা দিদি-গোকুলের মা স্যার। দিদিই আমাদের বাড়িতে থাকত। আমি আসার পর সে গোকুলের সরকারি কোয়ার্টারে চলে গেছে। অত করে বললাম। থাকল না। বলে কী, আর এ-বাড়িতে ভূতের অত্যাচার সইতে পারবে না।
ভূতের অত্যাচার?
আজ্ঞে! ভদ্রলোক চাপা গলায় বললেন, রাতবিরেতে কীসব অদ্ভুত শব্দ। কুকুর চাচালেই থেমে যেত। তবে প্রথম প্রথম গা করিনি। শেষে শান্তিস্বস্ত্যয়ন করলাম। তাতেও কাজ হল না। এমন সময়-
সাধুবাবার আবির্ভাব। কাজেই তার শরণাপন্ন হলেন।
হলাম। কিন্তু সাধুবাবার কৃপায় ভূতের অত্যাচার যদি বা বন্ধ হল, হঠাৎ এই আরেক উপদ্রক শুরু হয়ে গেল। জুতো-চুরি। তিন তিনজোড়া জুতো স্যার।
সাধুবাবা কোনও আস্কারা করতে পারলেন না?
ভদ্রলোকের মুখে এতক্ষণে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল। আস্কারা করতে গিয়েই সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড স্যার। কাল শনিবার সকালে ঠাকুরবাড়ির যে ঘরটায় সাধুবাবা থাকতেন, সেই ঘরের বারান্দায় চাপ-চাপ রক্ত দেখা গেল। সারাবাবুগঞ্জে হুলুস্থুল। পুলিশ এল। রক্তের ছাপ পেছনকার দরজার ঘাটেও পাওয়া গেল। নিচে গঙ্গা। পুলিশ বলল, বডি গঙ্গায় ফেলে দিয়েছে। আমি এর মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারছিলাম না। শেষে গোপনে গোকুলকে সব বললাম। তখন গোকুল-
আপনার বাড়িতে আর কে থাকে?
কেউ না স্যার। আমি একা থাকি। স্বপাক খাই। বরাবর নিজের কাজ নিজে করার অভ্যেস আছে।
আপনি যে রোজ সন্ধেয় বাড়ি থেকে সাধুবাবার আসরে যেতেন
কাছেই স্যার। খুব কাছে।
হ্যাঁ। কিন্তু আপনার কী মনে হতো না বাড়িতে চোর ঢুকতে পারে?
ভদ্রলোক হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ভুলো স্যার। ভুলোর চাঁচানি যে একবার শুনেছে, সে-ই কানে আঙুল খুঁজে পালাবে।
ভুলো কোনও কুকুরের নাম?
আজ্ঞে। ঠিক ধরেছেন। গোকুল যা-যা বলছিল-
ভুলোকে আপনি কোথায় পেলেন?
দিদির পোষা দিশি কুকুর। দিদি চলে গেলেও ভুলো চলে যায়নি।
তা বলে ভুলো এখন আপনার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে?
অ্যাঁ? ভদ্রলোক চমকে উঠলেন। তাই তো! ওর কথা কাল থেকে আমার খেয়ালেই নেই। ভুলোকে আমি কাল থেকে দেখেছি, না দেখিনি? হুঁ, দেখিনি। কী আশ্চর্য। ভুলো কি তাহলে দিদির-কাছে চলে গেছে? অকৃতজ্ঞের কাণ্ড দেখছ?
আপনি ফিরে গিয়ে ওর খোঁজ নিন। দেরি করবেন না।
পাঁচুগোপালবাবু তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আর একটা কথাও না বলে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। …..।
এতক্ষণ চুপচাপ বসে এইসব কথা শুনছিলাম। এবার দেখলাম আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ এবং রহস্যভেদী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চোখ বুজে সাদা দাড়িতে হাত বুলোচ্ছেন। চওড়া টাক বড় বেশি চকচক করছে। একটু হেসে বললাম, আশ্চর্য কর্নেল! আপনি অন্ধকারে ঢিল ছোড়েন এবং দিব্যি সেই ঢিল লক্ষ্যভেদ করে।
কর্নেল চোখ খুলে জোরে মাথা দোলালেন। অন্ধকারে? নাহ জয়ন্ত! আমি আলোতেই ঢিল ছুঁড়েছি।
জুতো-চুরির কথা আপনি জানতেন তাহলে?
নাহ। ভদ্রলোককে আমি কস্মিনকালেও চিনি না। তবে গঙ্গার ধারে ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার গোকুলবাবুকে চিনি। গত এপ্রিলে বাবুগঞ্জে উনি আমাকে কয়েকটা অর্কিডের খোঁজ দিয়েছিলেন। কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটি যত্ন করে ধরিয়ে বললেন, জুতোর ব্যাপারটা তুমিও আঁচ করতে পারতে, যদি ওঁর কথাগুলো লক্ষ করতে। তাকে বুঝে প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তর বেরিয়ে আসে।
কিন্তু সাধুবাবার ব্যাপারটা?
ডার্লিং! বরাবর দেখে আসছি, কাগজের লোক হয়েও তুমি কাগজ খুঁটিয়ে পড়ো না। তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকাতেই বাবুগঞ্জের সাধুবাবা নিখোঁজ এবং রক্তের খবর বেরিয়েছে।
বেশ। কিন্তু কুকুরের ব্যাপারটা?
পাঁচুগোপালবাবুর মুখেই শুনেছ, কুকুর চ্যাঁচালে ভূতুড়ে শব্দ থেমে যেত। কাজেই একটা কুকুর থাকার চান্স ছিল।
তাহলে ভূত আসলে জুতো চুরি করতেই আসত।
বাহ! কর্নেল হাসলেন। ক্রমশ তোমার বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে।
রীতিমতো রহস্যজনক ঘটনা। কুকুরটা নিপাত্তা হয়ে গেল সাধুবাবার মতো?
এবং তিনজোড়া জুতোও নিপাত্তা হয়ে গেছে।
কিন্তু কুকুরের জন্য ভদ্রলোক প্রায় গুলতির বেগে বেরিয়ে গেলেন কেন বলুন তো?
কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। আবার চোখ বুজে ইজিচেয়ারে হেলান দিলেন এবং চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে ওকে আপনমনে বিড়বিড় করতে শুনলাম। খাজাঞ্চি। আগের দিনে রাজা খেতাবধারী বড় জমিদারদের খাজাঞ্চিখানা থাকত। ট্রেজারি। খাজাঞ্চি ঠিক ক্যাশিয়ার নয়, ট্রেজারার। সে আসলে খুব সম্মানজনক পদ। তবে খুব আস্থাভাজন লোক হওয়া চাই। আস্থা! খুব গুরুত্বপূর্ণ এই শব্দটা–আস্থা!
