হালদারমশাইয়ের সাহায্যে কর্নেল পিছনের দুটো সিটের মাঝখানে যেন গুঁজে দিলেন মোটাসোটা নাদুসনুদুস অজয়েন্দু নারায়ণ রায়কে। এখন তার পরনে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট।
কর্নেল বললেন–আমি হরিবাবুকে সামলাচ্ছি। আপনি ড্রাইভারকে কাঁধে বয়ে নিয়ে আসুন।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ লম্বা ধ্বংসস্তূপটার কাছে গিয়ে খি খি করে হাসলেন–ভগত মরে নাই কর্নেলস্যার। বাঁধন খুলবার চেষ্টা করতাছে। এই ব্যাটা! মিলিটারি বাঁধন তুই খুলবি ক্যামনে? আয়! তরে মড়া কইর্যা কান্ধে চাপাই।
যে কথা, সেই কাজ। আমি বললাম-ওকে এটুকু গাড়িতে কোথায় ঢোকাবেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন-এ গাড়ির ডিকিতে ঢোকাতে হলে ওকে কেটে টুকরো টুকরো করতে হবে।
হাত-পা বাঁধা ভগত হালদারমশাইয়ের কাধ থেকে ঝুলছিল। এ-কথা শুনে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল।
কর্নেল বললেন-বরং এক কাজ করুন হালদারমশাই। ওকে হরিবাবুর কোলের ওপর দিয়ে লম্বালম্বি শুইয়ে দিন। আপনি আমার পাশের সিটে বসে ওর মুণ্ডুটা ধরে থাকুন।
সে এক অদ্ভুত অবস্থা। পিছনের দুটো সংকীর্ণ সিটে ডানদিকে কর্নেল, বাঁদিকে হালদারমশাই এবং মাঝখানে অজয়েন্দ্র রায়, তার দুই পা দুমড়ে তলায় ঢুকে আছে। বেচারা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এদিকে তার বুকের ওপর বোঝা তার বিশ্বস্ত অনুচর ভগত। হালদারমশাই বললেন-হালা এই হাত দিয়া আমারে মারতে ড্যাগার তুলছিল!
কর্নেলের নির্দেশে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম। আমার গাড়িটা পুরোনো ফিয়াট। কিন্তু কালেভদ্রে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার মারুতি জিপসি আমাকে চালাতে হয়েছে। এক্ষেত্রে একটাই অসুবিধে। জায়গাটা জঙ্গল হেডলাইটে ফাঁকা জায়গা খুঁজে এগোতে হচ্ছিল। মারুতির মতো খুদে গাড়িতে আটজন লোক। যেকোনও মুহূর্তে উলটে যাওয়ার ভয়ও ছিল।
মোরামরাস্তায় সবেগে উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কর্নেল! চন্দ্রপুরের পথ আমি চিনি না। থানা কোথায় তা-ও জানি না।
আমার পাশ থেকে ক্যাপটেন সিংহ জড়ানো গলায় বললেন–চলুন। আমি চিনিয়ে দেব।
চন্দ্রপুরগামী পিচরাস্তায় পৌঁছোনোর পর সামনে দূরে একটা গাড়ির জোরালো হেডলাইট দেখা যাচ্ছিল। পিছন থেকে হালদারমশাই বললেন–জয়ন্তবাবু! সাবধান! এইটুখান রাস্তা।
আমি হর্ন বাজাতে বাজাতে এবং হেডলাইট কখনও নিভিয়ে কখনও জ্বালিয়ে এবার গতি কমিয়ে এগোচ্ছিলাম। একটু পরেই আমাদের গাড়ির পথ আটকে সেই গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল এবং টর্চের আলো পড়ল আমাদের ওপর। তারপরই সামনের গাড়ি থেকে ও সি রাজেন্দ্র হাটিকে রিভলভার উঁচিয়ে নামতে দেখলাম। কর্নেল গাড়ি থেকে নেমে সহাস্যে বললেন–আসুন মি. হাটি! আপনার হাতে অমূল্য সম্পদ দুটো তুলে দিই।
রাজেন্দ্র হাটি এসে আমাদের গাড়ির ভিতর টর্চের আলো ফেললেন, যদিও কর্নেল দরজা খুলে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারুতির ভিতরে আলো জ্বলে উঠেছিল। মি. হাটি মুচকি হেসে বললেন–কোনটা কে মি. হালদার?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন–মি. হাটি! আগে এই মালটারে হ্যান্ডকাপ পরানো দরকার। এটা হইল গিয়া হরিবাবু–মানে, অজয়েন্দু নারায়ণ রায়। আর যারে বাইন্ধা মড়ার মতো লম্বা করছি, এটা হইল গিয়া অর চ্যালা ভগত।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে টানছিলেন। পুলিশের জিপ থেকে ততক্ষণে একদঙ্গল কনস্টেবল নেমে লাল মারুতিটাকে ঘিরে ধরেছে। মি. হাটির নির্দেশে অজয়েন্দু এবং ভগতকে টেনে তারা বের করল। হাতকড়ি পরিয়ে অজয়েন্দু রায়কে টেনে নিয়ে গেল। ভগতের পায়ের বাঁধন খোলা যাচ্ছিল না। অগত্যা কর্নেল তার মিলিটারি বাঁধন খুলে দিলেন। তাকেও কনস্টেবলরা পুলিশ জিপের পিছনে ঢোকাল।
মি. হাটি বললেন–সামনের সিটে ইনি কে?
কর্নেল বললেন–ইনিই ক্যাপটেন এস কে সিনহা। অজয়েন্দু রায় এঁকে কলকাতা থেকে কিডন্যাপ করে এনেছিল। বাকি কথা যথাসময়ে শুনবেন। চলুন। আপনার ডেরায় গিয়ে কফি খাব। তারপর অন্য কথা।
পুলিশের গাড়িকে অনুসরণ করে এগোচ্ছিলাম। পিছনের সিটে এবার আরাম করে কর্নেল ও হালদারমশাই বসেছেন। হালদারমশাই বললেন-কর্নেল স্যার! ওই পাতালঘরে চোরাই জিনিস আছে মনে হয়। মি. হাটিরে জানান দেওয়া উচিত ছিল। ক্যান কী, এই সুযোগে অগো চ্যালারা যদি জিনিসগুলি লইয়া যায়?
কর্নেল বললেন–পাতালঘরটার দিকে আপাতত কেউ পা বাড়াবে না।
-কর্নেলস্যার! আমার ধারণা, পাতালঘরটার কথা জাহাজিবাবু জানে। অজয়েন্দু রায়ের লগে অর বন্ধুতা ছিল। বর্ডার এলাকায় দুইজনেই চোরাকারবার করত। আপনি কী কন?
–ঠিক বলেছেন।
–কিন্তু অগো বন্ধুতা নষ্ট হইল ক্যান?
-পরে সব খুলে বলব। ক্যাপটেন সিনহার কাছে গচ্ছিত জিনিসটা জাহাজবাবু চুরি করার পর জাহাজিবাবু সম্ভব অজয়েন্দ্র রায়ের সঙ্গে আর দেখা করত না। এদিকে অজয়ের সন্দেহ হয়েছিল, ক্যাপটেন সিনহাই সেই জিনিস গোপনে বেচবার চেষ্টা করছেন। তাই সুশীলার সাহায্যে ক্যাপটেন সিনহাকে সে কিডন্যাপ করল।
ক্যাপটেন সিনহা বললেন-আমার এই দুরবস্থার জন্য সুশীলাই দায়ী। মেয়েটার জন্য কষ্ট হয়। কিন্তু শয়তানের ফাঁদে পড়লে মানুষকে মরতে হয়। হতভাগিনী বেঘোরে মারা পড়ল।
কর্নেল বললেন–ট্যাক্সি খারাপ হওয়ার পর সুশীলা বেরিয়েছিল। তাই না?
-হ্যাঁ। তারপর গুলির শব্দ শুনলাম। সুশীলা ঝোপের ওপর পড়ে গেল। তারপর আবার গুলির শব্দ হল। কিন্তু তখন কে কাকে গুলি করছে বুঝতে পারিনি। আমাকেও গুলি করে মারবে ভেবে ঈশ্বরকে ডাকছিলাম।
