কিন্তু অসম্ভব হয়তো কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে। তিনি সাবধানে স্তূপ থেকে নেমে এলেন। হালদারমশাই ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করলেন-কিছু দ্যাখলেন?
কর্নেল বললেন–একটা ভাঙা দেউড়ি এখনও খাড়া হয়ে আছে। তার নিচের দিকে লাল মারুতির একটুখানি অংশ দেখা যাচ্ছে। সাবধানে আসুন আপনারা। জয়ন্ত তোমার ফায়ার আর্মস এনেছ তো?
বললাম-এনেছি।
–হালদারমশাই?
–হঃ! জঙ্গলে নিরস্ত্র হইয়া ঢুকব ক্যান?
-কিন্তু বিন্দুমাত্র শব্দ নয়। দেখছেন তো? সবখানে ঝরাপাতা পড়ে আছে। যত সময় লাগুক, নিঃশব্দে এগোতে হবে। আর্মস রেডি রাখুন।
শীতের জঙ্গলে ঝরা পাতার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে হাঁটা খুব সহজ কাজ নয়। তবে আমরা ঝোপঝাড় এবং কেল্লার ধ্বংসস্তূপের আড়ালে গুঁড়ি সময় লাগল। তারপর একটা স্তূপের আড়ালে লাল মারুতিটা দেখতে পেলাম। একটা উঁচু টুটাফাটা এবং আগাছাটাকা দেউড়ি কাছাকাছি দেখা গেল। গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের পাশ কাটিয়ে প্রথমে কর্নেল তার সামরিক জীবনের গেরিলাযুদ্ধের একটা কৌশল যেন দেখিয়ে দিলেন।
পিছন থেকে লোকটার ঘাড়ের ওপর ডান হাত দিয়ে আঘাত করলেন। এখন তার বাঁ হাতে রিভলভার। আর লোকটা তখনই নিঃশব্দে নেতিয়ে পড়ে গেল। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন জয়ন্ত! আমার কিটব্যাগের চেন টেনে দড়ি বের করো।
হালদারমশাই অস্ত্রহাতে চিতাবাঘের মতো চারদিকে লক্ষ্য রেখেছেন। দড়ি বের করে চেন এঁটে দিলাম। কর্নেল লোকটার দুই হাত টেনে পিঠমোড়া করে বাঁধলেন। দুটো পা বেঁধে ফেললেন। লোকটা গাড়ির ড্রাইভার, তা বোঝা গেল। তার হাত থেকে চাবির গোছা ছিটকে পড়েছিল। চাবি কর্নেল কুড়িয়ে নিলেন।
এবার দেখলাম, দেউড়ির অন্য পাশে বৌদ্ধস্তূপের মতো দেখতে একটা গম্বুজঘর। এ ধরনের গম্বুজঘর দিল্লি, আগ্রা এবং অন্যত্র দেখেছি। এগুলো মোগল আমলে প্রহরীদের জন্য তৈরি করা হত। এই গম্বুজঘরটা ঘন লতাগুল্মে ঢাকা। মুখের দিকটায় লতার ঝালর ঝুলে আছে। তার ফাঁকে আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে।
কর্নেলের নির্দেশে হালদারমশাই আর আমি লোকটাকে ধরাধরি করে একটু তফাতে আরেকটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে রেখে এলাম।
কর্নেল বললেন–আর্মস রেডি করে আমার পিছনে আসুন হালদারমশাই! জয়ন্ত! তুমিও এসো।
ঝুলন্ত লতাপাতার ঝালর একটু ছেঁড়া দেখে বোঝা গেল, কেউ বা কারা গম্বুজঘরে ঢুকেছে। গুঁড়ি মেরে সাঁতসেতে শ্যাওলাঢাকা হাত চার-পাঁচ মেঝের পর সিঁড়ির ধাপ দেখা গেল। নিচে থেকে আলোর ছটা ধাপে পড়েছে। শেষ ধাপে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। সামনে বন্ধ দরজা। দরজার ফাটল দিয়ে আলো বেরিয়ে গম্বুজঘরের মেঝে পর্যন্ত ছটা ফেলেছে।
ভিতর থেকে চাপা গলায় কেউ কাকে ধমক দিচ্ছে–এই শেষবারের জন্য বলছি, সঠিক জবাব দাও।
জড়ানো গলায় এবং কাতর স্বরে কেউ বলল–আমাকে আর কষ্ট দিয়ো না। মেরে ফ্যালো।
–তবু কথাটা বলবে না? তাহলে থাকো তুমি এই পাতালঘরে। আলোর লাইন কেটে দিয়ে দরজায় তালা এঁটে চলে যাই। কেমন?
–অজু! অজু! দয়া করো ভাই। একটু দয়া করো।
–কোনও দয়া নয়। বিশ্বাসঘাতকের জন্য এই শাস্তিাটাই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম।
আচমকা ঘরের আলো নিভে গেল। তারপর কপাটের ফাটল দিয়ে টর্চের আলো দেখা গেল। আর হ্যাঁচকা টানে কেউ ভিতর থেকে দরজা খুলতেই কর্নেল তার বিশাল শরীরের ধাক্কায়। লোকটাকে ধরাশায়ী করলেন। আমি টর্চ জ্বালোম। হালদারমশাই একলাফে পাতালঘরে ঢুকে ধরাশায়ী লোকটাকে দেখে বলে উঠলেন-অ্যাঁ! এই হালা তো দেখি সেই হরিবাবু।
হরিবাবুর হাতের টর্চ ছিটকে পড়ে মেঝেয় আলো ছড়াচ্ছিল। কর্নেল বললেন–হালদারমশাই! আপনার হরিবাবুর জ্যাকেটের ভিতর-পকেটে শক্ত কী একটা ভরা আছে। ওটা নিশ্চয় ফায়ার আর্মস! বের করে নিন।
গোয়েন্দাপ্রবর এ-কাজে পটু। একটা ফায়ার আর্মস জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করে তিনি গর্জন করলেন–ইচ্ছা করে দিই হালার খুলি উড়াইয়া।
কর্নেল হরিবাবুর বুক থেকে উঠে তার জামার কলার ধরে তাকে দাঁড় করালেন। হরিবাবু লাল চোখে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ছিলেন। কর্নেল তার ডান কানের পিছনে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে বললেন-একটুও নড়বে না হরিবাবু। নড়লেই মুণ্ডু উড়ে যাবে। এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো আমার সঙ্গে চলো। হালদারমশাই! আপনি আমার পাশে এসে হরিবাবুকে নিয়ে যেতে সাহায্য করুন। জয়ন্ত! তুমি ক্যাপটেন সিনহাকে নিয়ে এসো।
টর্চের আলোয় ঘরের কোণে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোককে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখলাম। উনিই সেই ক্যাপটেন এস কে সিনহা। তাঁর কাছে গেলে তিনি কান্নাজড়ানো গলায় বললেন–ও হরিবাবু নয়। ওর নাম অজয়েন্দু রায়।
হালদারমশাই শুধু বললেন-অ্যাঁ! তারপর কর্নেলের সঙ্গে অজয়েন্দু নারায়ণ রায়ের কাঁধের কাছে অন্যদিকের কলার ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলেন।
আমি বুদ্ধি করে সুইচ খুঁজে আবার আলোটা জ্বেলে দিলাম। এবার চোখে পড়ল, ঘরের মেঝেয়। কয়েকটা প্রকাণ্ড প্যাকেট। একটা বস্তায় কী সব আছে। বস্তার মুখ বাঁধা। কিন্তু সিঁড়ি থেকে কর্নেলের তাড়ায় ক্যাপটেন সিনহাকে ধরে ওঠালাম। পা ফেলতে ওঁর কষ্ট হচ্ছিল।
গম্বুজঘর থেকে বেরিয়ে কর্নেল আমাকে তার প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে লাল মারুতির চাবি বের করে নিতে বললেন। –জয়ন্ত! ক্যাপটেনসাহেবকে সামনের সিটে বসাও। অজয়েন্দু ওরফে হরিবাবুকে পেছনে ঢোকাচ্ছি।
