বললাম–তা হলে কখন বেরোবেন? চন্দ্রপুর থেকে রাত্রিবেলা জঙ্গলের পথে ফিরে আসতে হবে। এখনই বেরিয়ে পড়া উচিত।
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন-জয়ন্তবাবুর চিন্তার কারণ নাই। থানা থেইক্যা পুলিশফোর্স আমাগো এসকর্ট কইর্যা আনব।
কর্নেল বললেন–মি. হাটিকে বলেছি, আপনারা জাহাজিবাবুকে জেরা চালিয়ে যান। আজ আমি থানায় যাচ্ছি না। ফরেস্ট বাংলোর দিকে আসবার সময় একটা গাছের ডালে আশ্চর্য প্রজাতির একটা অর্কিড দেখেছি। পায়ে হেঁটেই সেখানে যাব। জয়ন্ত ইচ্ছে করলে ভাতঘুম দিয়ে নিতে পারে।
বললাম–আর ভাতঘুম আসবে না। আপনার সঙ্গে অর্কিড দেখতে যাব।
গোয়েন্দাপ্রবর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–আমিও যামু! কর্নেলস্যার! গাছের ফাঁকে দেখছিলাম, একখান উঁচু দেউড়ি এখনও খাড়াইয়া আছে। দেখতে ইচ্ছা করে। …
সেজেগুজেই বেরুতে হল। কারণ এখানে শীতের প্রকোপ যেন দোমোহানি এলাকার চেয়ে বেশি। অবশ্য এমনও হতে পারে, এই কয়েকদিনে শীতের দাপট বেড়েছে। দোমোহানি সেচবাংলোয় থাকলে হয়তো শীতের কামড়ে জব্দ হয়ে যেতাম। কারণ ওখানে বিস্তীর্ণ একটা জলাধার আছে।
ব্রিজ পেরিয়ে মোরামবিছানো রাস্তায় আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল সেই গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গাছটা বিশাল এবং গুঁড়ি থেকে শাখাপ্রশাখা পর্যন্ত মোটা লতা তাকে জড়িয়ে ধরেছে। লতাটার পাতা চওড়া। গুঁড়িকে ঢেকে ফেলেছে।
বিকেলের জঙ্গলে ছায়া ঘন হয়ে আছে। আমি অর্কিডটা খুঁজছিলাম। হালদারমশাই এদিকে-ওদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সম্ভবত জাহাজিবাবুর সাঙ্গোপাঙ্গদের খুঁজছিলেন। তার ডান হাত প্যান্টের পকেটে। অর্থাৎ তিনি তার ফায়ার আর্মসের বাঁটে হাত রেখেছেন। কিন্তু কেউ ঝোপঝাড় বা গাছের আড়াল থেকে গুলি ছুঁড়লে তিনি কী করবেন?
কথাটা ভেবে আমার শরীরে মুহূর্তে আতঙ্কের শিহরন জাগল। এদিকে কর্নেল রাস্তা থেকে নেমে পিঠের কিটব্যাগের চেন টেনে একটা ছোটো কাটারি বের করলেন। ওটা একটা জাঙ্গল-নাইফ-যা তার সামরিক জীবনের একটা স্মারক বলে তিনি গর্ব করেন। কাটারির গড়ন কতকটা ভোজালির মতো। সেটা দিয়ে তিনি গুঁড়িতে জড়িয়ে থাকা লতা-পাতা ছাঁটতে শুরু করলেন।
এবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম–কোথায় আপনার অর্কিড? লতাপাতার ভিতরে লুকিয়ে আছে নাকি?
কর্নেল জবাব দিলেন। না গুঁড়ির পিছনে জঙ্গলের দিকে মাটি পর্যন্ত লতাপাতার খানিকটা অংশ হেঁটে ফেলে আপন মনে বললেন-। যা ভেবেছিলাম, ঠিক তা-ই।
হালদারমশাই কাছে গিয়ে বললেন–কী কর্নেলস্যার?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন–বিদ্যুতের তার।
-অ্যাঁ?
-আসার সময় বাইনোকুলারে ব্যাপারটা চোখে পড়ছিল। বলে কর্নেল রাস্তায় উঠে। এলেন। -ওই দেখুন! এই গাছটার উপরের ডালপালা ঘেঁটে বিদ্যুতের চারটে লাইন গেছে ফরেস্ট বাংলোর দিকে। ওই তারগুলো যাতে গাছের কোনও অংশের সঙ্গে ছোঁয়া না লাগে, তাই গাছটার অনেকটা অংশ কেটে রাখা হয়েছে। বাতাসে বা ঝড়ের সময় দৈবাৎ গাছটার কোনও অংশের সঙ্গে ছোঁয়া লাগলেই ট্রান্সফর্মার জ্বলে যাবে। কারণ সজীব উদ্ভিদ বিদ্যুৎ পরিবাহী। এবার লক্ষ্য করুন। দুটো লাইন অর্থাৎ নেগেটিভ-পজিটিভের সঙ্গে নন-কন্ডাক্টিভ রবারে মোড়া একটা তার জোড়া আছে। সেই তার গাছের লতাপাতার আড়াল দিয়ে মাটিতে এসে ঢুকেছে।
গোয়েন্দাবর গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে বললেন-কী কাণ্ড! মাটির তলা দিয়্যা ইলেকট্রিক লাইন চুরি করছে কেউ। কর্নেলস্যার! জঙ্গলের মধ্যে তাহলে কোনও ঘরে বিদ্যুৎ লইয়া গেছে।
আমি বললাম-হয়তো ফরেস্টগার্ডদের কোনও গোপন ঘাঁটি আছে জঙ্গলে। কাঠচোরদের জন্য গার্ডরা সেখানে পাহারা দেয়।
কর্নেল বললেন-জঙ্গলে এমন পাহারার ব্যবস্থা থাকতেই পারে। কিন্তু সে-খবর রেঞ্জার সৌম্যবাবু ছাড়া বাংলোর কেউ সম্ভবত জানে না। সৌম্যবাবু তো দুপুরে জিপ নিয়ে চন্দ্রপুরে তাঁর অফিসে চলে গেছেন।
হালদারমশাই বললেন-কর্নেল স্যার! ফরেস্টগার্ডদের ঘাঁটি খোঁজার দরকার কী?
দরকার আছে। কিন্তু ঘন জঙ্গলে সেই ঘাঁটিটা কোথায়, তা খুঁজে বের করা কঠিন। বোদ কমে আসছে।
–তা হইলে আমরা মাটি খুঁড়িয়া তারটারে ফলো করি?
কর্নেল হেসে উঠলেন। -কাজটা অন্তত হাফডজন মজুরের। কোদাল দরকার। বলে তিনি রাস্তার উত্তরদিকে–যেদিক থেকে আমরা ফরেস্ট বাংলোতে এসেছিলাম, সেই দিকটা দেখতে থাকলেন। বললেন–উত্তর থেকে বাতাস বইছে। কী একটা শব্দ শুনলাম যেন। থানা থেকে মি. হাটি জিপে চেপে আসছেন নাকি?
তারপরই তিনি চাপাস্বরে বলে উঠলেন ফের-মাই গড! লাল মারুতি!
হালদারমশাই ও আমি এক গলায় বললাম–কই? কই?
-বাঁদিকে জঙ্গলে ঢুকে গেল। জয়ন্ত! হালদারমশাই! রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে আমাদের নামতে হবে। ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে এগোব। কুইক! বলে কর্নেল রাস্তা থেকে নেমে জঙ্গলে ঢুকলেন। আমরা তাকে অনুসরণ করলাম।
.
১২.
কখনও গুঁড়ি মেরে কখনও ঘন গাছের আড়ালে একটুখানি দাঁড়িয়ে কর্নেল গাড়িটাকে খুঁজছিলেন। প্রায় আধঘণ্টা পরে তিনি চাপাস্বরে বললেন–এখানে গাড়িটা রাস্তা থেকে নেমে জঙ্গলে ঢুকেছে। চাকার দাগ দেখা যাচ্ছে। ফাঁকা ঘাসে ঢাকা জায়গা দিয়ে গেছে গাড়িটা। কিন্তু আমরা ফাঁকা জায়গায়। যাচ্ছি না।
বলে তিনি আমাদের থামতে ইশারা করলেন। তারপর বাঁ দিকে এগিয়ে ঝোপঝাড়ে থাকা একটু ধ্বংসস্তূপে উঠে গেলেন। বুঝলাম, কর্নেল বাইনোকুলারে গাড়িটা খুজবেন। কিন্তু ক্রমে ছায়া ঘন হয়ে এসেছে। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে কি গাড়িটা ওই যন্ত্র দিয়ে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
