ও সি বললেন-হ্যাঁ। রাত্রেই ওটা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই জঙ্গলের ধারে পড়ে থাকলে গাড়িচোররা ওটাকে হাপিস করে দিত। এই এলাকার চোর-ডাকাত দমন করা কঠিন। এই জঙ্গল আর পনেরো কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের বর্ডার।
–চলুন। ঘটনাস্থলটা দেখি।
ডানদিকে একটু এগিয়ে মি. হাটি বললেন-সুশীলা দাসীর বডি এই ঝোপের ধারে পড়ে ছিল। আর ট্যাক্সিটা ছিল এখানে রাস্তার কাছাকাছি। সম্ভবত গাড়ির মধ্যে ধস্তাধস্তি হচ্ছিল। ড্রাইভার ট্যাক্সির ব্রেক না চাপলে নিচের ওই খালে গিয়ে পড়ত।
হালদারমশাই বললেন–হ্যাঁ। ঠিক কইছেন। ঝোপের অবস্থা দেইখ্যাই তা বুঝছি।
দেখলাম, সুশীলার লাশ যেখানে পড়ে ছিল, সেখানে এখনও রক্তের ছোপ। শিশিরে অবশ্য রক্তের রং ফিকে হয়ে গেছে। ততক্ষণে কর্নেলের গোয়েন্দাগিরি শুরু হয়ে গেছে। ইতস্তত তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনও হাঁটু মুড়ে বসে আতশ কাচে কী দেখছেন। হালদারমশাইও অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘোরাঘুরি করছেন।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মি. হাটি আমাকে সহাস্যে চাপা স্বরে বললেন–আমাদের পক্ষ থেকে তন্নতন্ন খোঁজা হয়েছে। এবার দেখা যাক, কর্নেলসাহেব কোনও ক্ল পান নাকি।
হালদারমশাই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মি. হাটি বললেন–ভদ্রলোকের মাথায় ছিট আছে মনে হচ্ছে। ওভাবে কোথায় যাচ্ছেন উনি?
একটু হেসে বললাম–ঠিক ধরেছেন মি. হাটি। উনি আপনার মতো পুলিশ অফিসার ছিলেন। কিন্তু মাথায় ছিট আছে। কর্নেলেরও আছে। ওই দেখুন, কর্নেলও অদৃশ্য হলেন।
মি. হাটি এবার একটু গম্ভীর মুখে বললেন–আমরা অবশ্য জঙ্গলে ঢুকিনি। ঢোকার কোনও কারণও ছিল না। ওঁরা কীসের জন্য জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলেন বুঝতে পারছি না।
মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর মি. হাটি একজন সশস্ত্র কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেল যেদিকে, সেদিকে চলে গেলেন।
আরও দশ মিনিট পরে দেখলাম, হালদারমশাই হন্তদন্ত বেরিয়ে আসছেন জঙ্গল থেকে। জিজ্ঞেস করলাম–কী ব্যাপার হালদারমশাই?
গোয়েন্দাবরের পোশাক শিশিরে ভিজে গেছে। উত্তেজিতভাবে তিনি বললেন–জুতার ছাপ ফলো করছিলাম। একখানে দেখলাম পুরানকালের ধ্বংসস্তূপ।
-হ্যাঁ। এই জঙ্গলের মধ্যে মোগল আমলের একটা কেল্লাবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আছে। কিন্তু কর্নেল কোথায়? তাকে দেখতে পাননি?
–নাঃ। ধ্বংসস্তূপের আড়ালে কে য্যান খাড়াইয়া ছিল। আমি শুধু শুনলাম শুকনা পাতার ওপর দৌড়াইয়া পালানোর শব্দ। জয়ন্তবাবু! এখনই মি. হাটি যদি পুলিশফোর্স লইয়া-বলেই তিনি অবাক হলেন। -অ্যাঁ? মিঃ হাটি গেলেন কই?
-জঙ্গলে। কর্নেলকে ফলো করে গেছেন উনি।
হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন-মিসটিরিয়াস কারবার।
ওঁদের ফিরতে যত দেরি হচ্ছে, তত আমার উদ্বেগ বাড়ছিল। অবশেষে ওঁদের দেখতে পেলাম। ও সি মি. হাটি একজন লোকের সোয়েটার ও শার্টের কলার চেপে ধরে টানতে টানতে তাকে আনছেন। ভদ্রলোক বলাই উচিত তাকে। কাছাকাছি এলে আমি তাকে চিনতে পারলাম। এই ভদ্রলোকই দীপনারায়ণবাবুর সঙ্গে দোমোহানিগামী রাস্তায় মল্লযুদ্ধ করছিলেন। সেই ছবি কর্নেল তুলেছিলেন। কাজেই আমার চিনতে দেরি হল না। ইনিই সেই শম্ভুনাথ চৌধুরি! অদ্ভুত ব্যাপার! এখন এই জঙ্গলে ঢুকে কী করছিলেন জাহাজিবাবু?
কাছে এসে কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন–জাহাজবাবু দৌড়ে আসছে দেখে আমরা দু-পাশে দুটো স্কুপের আড়ালে ওত পেতেছিলাম। ইনি একেবারে আমাদের ওপর এসে পড়লেন।
হালদারমশাই বলে উঠলেন–আমার সাড়া পাইয়া এই লোকটাই দৌড় দিছিল। ..
.
১১.
স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যে জাহাজিবাবু শম্ভুনাথ চৌধুরি কাজিসায়েবের ছদ্মবেশে কর্নেলের জ্যাকেটে ভয়-দেখানো কথা লেখা কাগজের টুকরো এঁটে পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল, যাকে প্রায় দশ বছর ব্যাপী কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দারা খুঁজে হন্যে হয়েছেন, এমনকী কলকাতার লালবাজারের ঘুঘু গোয়েন্দারাও এযাবৎ যার টিকিটিও দেখতে পাননি, সে যেন আজ কর্নেলের কাছে স্বমূর্তিতে ধরা দেওয়ার জন্য তিতলিপুরের জঙ্গলে এসে অপেক্ষা করছিল।
মাঝে মাঝে বহু ঘটনা দেখে আমার মনে হয়েছে, কর্নেলের যেন কিছু অলৌকিক শক্তি আছে। আজ আবার তা বিশ্বাস করার মতো ঘটনা ঘটল। এ কথাটা কর্নেলকে বললেই তার বিখ্যাত অট্টহাসি শুনতে পাব। কাজেই চুপ করে থাকাই উচিত।
হালদারমশাইয়ের কথায় আমার সম্বিৎ ফিরল। তিনি বললেন–এই লোকটা সুশীলার সাহায্যে ক্যাপটেন সিংহের ঘর থেইক্যা দামি জিনিস চুরি করছিল? কী কাণ্ড! আর ডানহাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা ক্যান?
কর্নেল সহাস্যে বললেন–কারও সঙ্গে আবার মল্লযুদ্ধ করেছে।
অবাক গোয়েন্দাপ্রবর বললেন–আবার মানে? আগেও কি
তাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন–যথাসময়ে সব শুনবেন। প্রথম মল্লযুদ্ধের ছবিটাও আপনাকে দেখাব। মি. হাটি! আপনি তা হলে জাহাজিবাবুকে নিয়ে যান। ওর পেট থেকে কিছু বেরোয় কি না দেখুন। আমরা ফরেস্ট বাংলোয় গিয়ে একটু বিশ্রাম করে নিই। ফরেস্ট বাংলোয় টেলিফোন আছে তো?
মি. হাটি বললেন–আছে। এই বাংলোটা সেচবাংলোর চেয়ে সুন্দর। মৌরীনদী পেরিয়ে এসেছেন। সেই নদীর ধারেই ফরেস্ট বাংলো। নদীটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দোমোহানি জলাধারে গিয়ে মিশেছে। আচ্ছা, চলি কর্নেলসায়েব। সময়মতো দেখা করব।
