কর্নেল বললেন–জাস্ট আ মিনিট মি. হাটি! একটা কথা আছে।
দুজনে একটু তফাতে গিয়ে চুপিচুপি কী কথা বললেন। এদিকে জাহাজিবাবুর কোমরে এবং দুই দড়ি বেঁধে কনস্টেবলরা ততক্ষণে জিপের পিছনের দিকে ঢুকিয়েছে।
পুলিশের জিপ চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন-ফরেস্ট বাংলোয় যাওয়ার আগে একটা কাজ সেরে নেওয়া যাক হালদারমশাই! আপনি জুতোর ছাপ দেখে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই ছাপগুলো কোথায় প্রথমে আপনার চোখে পড়েছিল, একবার দেখে নিতে চাই।
হালদারমশাই রাস্তা থেকে ডাইনে জঙ্গলের দিকে কয়েক পা এগিয়ে কর্নেলকে সেই ছাপ দেখালেন। কর্নেল হাঁটু মুড়ে বসে আতশ কাচ দিয়ে কিছু দেখার পর পাশের একটা ঘন ঝোপের কাছে গেলেন। বললেন-হালদারমশাই! শম্ভুনাথ চৌধুরি সম্ভবত এখানে কিছু খুঁজতে এসেছিল। মাই গুডনেস! লক্ষ্য করছেন কি, ঝোপের ওপর রক্তের ছাপ এখনও স্পষ্ট। শিশিরে কিছুটা ধুয়ে দিলেও ছাপগুলো রয়ে গেছে!
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন-লোকটার হাতে ব্যান্ডেজ দেখলাম! কর্নেল স্যার! আর হাতে কেউ .. গুলি করছে! তাই না?
-ঠিক ধরেছেন। গুলি খেয়ে পালিয়ে গিয়ে জাহাজবাবু কোথাও ব্যান্ডেজ বেঁধে নিয়েছে। চেনা কোনও ডাক্তারের কাছে গিয়ে থাকবে। কিন্তু আজ এখানে কী খুঁজতে এসেছিল সে?
কর্নেলের কথা শুনে হালদারমশাই জায়গাটা খুঁজতে শুরু করলেন। গাড়িতে হেলান দিয়ে দুই গোয়েন্দার কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছিল, অন্য কেউ দেখতে অবাক হয়ে ভাবত, দুই পাগল এখানে এসে জুটল কোথা থেকে?
কিছুক্ষণ পরে গোয়েন্দাপ্রবর ঘন ঘাসের ভিতর থেকে কী একটা জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন-পাইছি! কর্নেল স্যার! পাইছি!
তিনি কর্নেলের কাছে গিয়ে জিনিসটা দেখালেন। এবার দেখতে পেলাম, ওটা একটা ফায়ার, আর্মস। কর্নেল ওটা পরীক্ষা করে দেখে বললেন-সিরাউন্ডার রিভলবার! হুঁ, বিদেশি অস্ত্র। পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবার। জাহাজিবাবুর হাতে কেউ গুলি করার সময় এটা ছিটকে পড়েছিল। সে আজ খুঁজতে এসেছিল অস্ত্রটা। পুলিশের গাড়ি থেকে জঙ্গলের আড়ালে ওত পেতে বসেছিল। তারপর আমরা এসে গেলাম এবং আপনি জুতোর ছাপ আবিষ্কার করে এগিয়ে গেলেন। পুরো ঘটনাটা অঙ্কের মতো কষে ফেলা যায়।
-হঃ! বলে উল্লসিত প্রাইভেট ডিটেকটিভ লম্বা পায়ে গাড়ির কাছে এলেন। একটিপ নস্যি নিয়ে খিক খিক করে হাসলেন। -জয়ন্তবাবু কিছু বোঝলেন?
আমিও বললাম-হঃ!…
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কর্নেলের নির্দেশমতো এগিয়ে ডানদিকে একটা মোরাম বিছানো সংকীর্ণ রাস্তায় চললাম। চন্দ্রপুরগামী পিচরাস্তা বাঁদিকে এগিয়েছে। আমরা এবার ঘন জঙ্গলের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। দুধারে ল্যাম্পপোস্ট এবং টেলিফোনের তার দেখা যাচ্ছিল। মিনিট সাতেক পরে সেই নদীর ওপর ছোটো ব্রিজ দেখা গেল। ব্রিজে উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ কর্নেল বললেন-জাস্ট আ মিনিট জয়ন্ত! একটু থামো।
কর্নেল নেমে গাড়ির পিছনদিকে রাস্তার ডানদিকে উঁচু একটা গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপরই দ্রুত এসে গাড়িতে উঠে বললেন–চলল! জিজ্ঞেস করলাম–কী দেখতে গিয়েছিলেন?
-অর্কিড।
এখানে অর্কিড? এটা তো পাহাড়ি এলাকা নয়।
জয়ন্ত! পরগাছা বললে তুমি বুঝবে। আসলে অর্কিড দুরকম হয়। ভূমিজীবী আর পরজীবী। পরজীবী অর্কিডকেই আমরা পরগাছা বলি!
পিছনে হালদারমশাই মন্তব্য করলেন-কর্নেলস্যারের লগে-লগে ঘুরলে নলেজ বাড়ে।
ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে সুদৃশ্য ফরেস্ট বাংলো চোখে পড়ল। একটা উঁচু জায়গার ওপর রঙিন ছবির মতো বাংলার পিছনের অংশ দোতলা। সামনে খোলা ছাদে বসে রাত্রিকালে অরণ্যের সৌন্দর্য দেখা যাবে।
হালদারমশাই বললেন–এ জঙ্গলে বাঘ-ভালুক নিশ্চয় আছে। হাতিও থাকতে পারে। তাই না কর্নেলস্যার!
কর্নেল বললেন–বাঘ, ভালুক, হাতি যদি না-ও থাকে, ভূতপ্রেত অবশ্যই আছে।
আমরা দুজনে হেসে ফেললাম। একটুখানি চড়াইয়ের উঠে বাংলোর গেট। গেটের সামনে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরা এক সুদর্শন আমার বয়সি যুবক দাঁড়িয়ে ছিলেন। করজোড়ে নমস্কার করে তিনি সহাস্যে বললেন–আমি এই ফরেস্টের রেঞ্জার সৌম্য চক্রবর্তী! কর্নেলসায়েব! আমি ভাবিনি চর্মচক্ষে আপনাকে দেখতে পাব। ভিতরে গাড়ি রাখার গ্যারাজ আছে। প্লিজ! ভিতরে আসুন। …
আমাদের জন্য দোতলার প্রশস্ত ঘরটি খালি রাখা হয়েছিল। সৌম্যবাবুর কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলাম চন্দ্রপুর থানার ওসি রাজেন্দ্র হাটিই এ ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানে মাঝে মাঝে পর্যটক আসে। দল বেঁধে কিংবা একা। তবে শীতের সময় খুব কম লোকই বেড়াতে আসে। গত শরতে সব ঘর নাকি ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। এটা ফরেস্ট বাংলো হলেও পর্যটন দফতরের সুপারিশে পর্যটকদের থাকতে দেওয়া হয়। নদীর দুধারে ঘন জঙ্গল শরৎকালে সবুজ হয়ে ওঠে। নদীর ধারে পিকনিক করারও অনুমতি দেওয়া হয়। তা ছাড়া শখের অ্যাডভেঞ্চারের জন্য মোগল ফৌজদার জাহান খাঁর কেল্লাবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আছে। প্রায় ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে কেল্লাবাড়ি ছিল। পূর্বপ্রান্তে দোমোহানির কাছে এখনও কিছু অংশ অটুট আছে, তা আমার দেখা হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপ বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে আছে। হালদারমশাই বাঘ-ভালুকের খবর জানতে উদগ্রীব ছিলেন।
সৌম্যবাবু বললেন–ভালুক না থাকলেও বাঘ আছে। একদল হরিণ এনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বুনো শুয়োর, হনুমানের পাল, শেয়াল, সাপ এসব প্রাণীর নির্ভয় আশ্রয় এই জঙ্গল।
