কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন-ক্যাপটেন এস কে সিংহের দেশের বাড়ি ছিল চন্দ্রপুরে। অজয়ে তার বাল্যবন্ধু।
–এসব কথা কি মি. সোমের দেওয়া কাগজে লেখা আছে?
–মোটেই না।
–আমি চোখ না খুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন–ওই তথ্য থেকে একটা স্কেচ এঁকেছি। শুনতে ইচ্ছে হলে শোনো।
হাসতে হাসতে বললাম-ঠিক আছে। বলে যান।
-ক্যাপটেন সুশীল কুমার সিংহের সুপারিশে অজয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। শম্ভুনাথ চৌধুরি চাকরি পেয়েছিল অজয়ের সুপারিশে। ওরা দুজনে কোম্পানির নিয়মকানুন না মেনে কোথায়-কোথায় চলে যেত, তা আগেই বলেছি। নিয়মকানুন বিরোধী হলেও জাহাজের লগবুকে ক্যাপটেন সিংহকে সে-কথা লিখে রাখতে হত। কারণ বাইরে গিয়ে বিপদ-আপদ হলে জাহাজ কোম্পানিকেই ঝক্কি সামলাতে হবে। যাই হোক, বছর দশেক আগে একটা জাহাজ মিশরের পোর্ট সইদ ভারত থেকে কলকারখানার যন্ত্রাংশ নিয়ে গিয়েছিল। মাল খালি হলে সেই জাহাজে মিশরের তুলো বোঝাই করার কথা। আমেদাবাদের কাপড়কলের অর্ডার ছিল। তুমি জানো মিশরের তুলো ইজিপ্সিয়ান কটন নামে বিশ্বখ্যাত। তো তুলো আসতে দেরি হচ্ছিল। এই অছিলায় অজয়েন্দু শম্ভুনাথকে সঙ্গে নিয়ে কায়রোতে তুলো কোম্পানির অফিসে যান। দুদিন পরে ওঁরা জাহাজে ফিরে আসেন। তারপর তুলো এসে বন্দরে পৌঁছোয়। সেই তুলো বোঝাই করে জাহাজ বোম্বাই ফিরে আসছিল। আগস্ট মাস। বোম্বাই থেকে আঠারো নটিক্যাল মাইল দূরে ঝড়ের মুখে জাহাজডুবি হয়। ক্যাপটেন সিংহ রবারে ভেলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে অজয়েন্দু বা শম্ভুনাথ ছিল না। এদিকে বোম্বাইয়ে তার আগে মিশর সরকারের অভিযোগ অনুসারে ভারত সরকার গোয়েন্দাবাহিনী তৈরি রেখেছিলেন। মিশরের অভিযোগ ছিল, ওই তুলোর জাহাজের দুজন অফিসার জাদুঘর থেকে অমূল্য প্রাচীন সম্পদ চুরি করে পালিয়েছে। তাদের সাহায্যকারী ইব্রাহিম বেগকে মিশর সরকার গ্রেফতার করেছিল। ইব্রাহিম ধোলাইয়ের চোটে ওই দুই ভারতীয়ের পরিচয় দিয়েছে।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন। বললাম-তারপর?
কর্নেল একটু হেসে বললেন নিশ্চয় ওরা দুজনে এমন কিছু আঁচ করে থাকবে। তা না হলে জাহাজডুবির পর আর তাদের খোঁজ পাওয়া যাবে না কেন? মালবাহী জাহাজ। লোকজন তত বেশি ছিল না। রবারের নৌকো ছাড়াল কয়েকটা হালকা কাঠের বোটও ছিল। রবারের পোশাকও ছিল, যাতে হাওয়া ভরলে ফুলে ওঠে। সমুদ্রে ভেসে থাকা যায়।
-তার মানে সবাই উদ্ধার পেয়েছিল। শুধু অজয়েন্দু আর শম্ভুনাথের খোঁজ পাওয়া যায়নি?
-হ্যাঁ, প্রায় দশ বছর এই দুজন লোক কোম্পানির খাতায় মৃত হলেও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সি বিআই-এর খাতায় জীবিত। কয়েক বার খোঁজ পেয়েও সি বি আই তাদের ধরতে পারেনি। মি. সোম ফুটনোটে এইসব কথা লিখে দিয়েছেন। আর একটা মূল্যবান তথ্য আছে। মি. সোমের কোম্পানির একজন জাহাজি অফিসার নাকি খিদিরপুর ডকে হংকংয়ের একটা জাহাজে শম্ভুনাথ চৌধুরিকে দেখতে পেয়েছিলেন। সে জাহাজ থেকে একটা বোটে নেমে ডকইয়ার্ডে এসেছিল। সেই অফিসার তাতে চার্জ করতেই শম্ভুনাথকে আড়াল করে তার গ্যাংয়ের লোকেরা। তারপর বেচারা নিরীহ অফিসারকে সেই গুণ্ডারা মারধর করে। সেই সুযোগে শম্ভুনাথ উধাও হয়ে যায়।
বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন। –জয়ন্ত, সাড়ে নটা বেজে গেছে! এ রাতে শিগগির ডিনার খেয়ে। শুয়ে পড়া যাক, সকালে বেরুতে হবে। বলে তিনি ডাকলেন-ষষ্ঠী!..
ষষ্ঠীচরণ আড়াল থেকে নিশ্চয় কর্নেলের কথা শুনছিল। কিচেনের দিক থেকে সে সাড়া দিয়ে বলল–সব রেডি বাবামশাই!…
সকালে কথামতো হালদারমশাই এসে পৌঁছেছিলেন। আমরা তখনই বেরিয়ে পড়েছিলাম। কর্নেল বলেছিলেন, পথে কোথাও ব্রেকফাস্ট করা যাবে।
তিতলিপুরের মোড় পেরিয়ে কর্নেলের নির্দেশে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। ডানদিকে টানা জঙ্গল। বাঁদিকে কখনও মাঠ, কখনও গ্রাম। কিছুক্ষণ পরে হাইওয়ে যেখানে বাঁদিকে ঘুরে গেছে, সেখানে একটি মোটামুটি চওড়া পিচরাস্তা জঙ্গলের ভিতরে দিয়ে এগিয়েছে। কর্নেল বললেন–আমরা ফরেস্ট বাংলোতে উঠব।
হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন–সেই ট্যাক্সিখান কি এই রাস্তায় আইতেছিল?
-হ্যাঁ। এই জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে চন্দ্রপুর যেতে হয়। বলে তিনি বাইনোকুলারে চোখ রাখলেন। একটু পরে বললেন-জঙ্গলে এখনও কুয়াশা। তাই খালি চোখে পুলিশের গাড়ি দেখা যাবে না। বললাম–বাইনোকুলারে পুলিশের গাড়ি দেখতে পাচ্ছেন?
–পাচ্ছি। থানার ওসি রাজেন্দ্র হাটি জিপের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
এবার একটা ছোটো জলভরা নদীর ব্রিজ দেখা গেল। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে পুলিশের জিপ দেখতে পেলাম। বাঁদিকে রাস্তাটা ঘুরে গেছে। সেদিকে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছিল। সমৃদ্ধ গ্রাম বা গ্রামনগরী। বলা যায়। কারণ, অনেক পাকাবাড়ি আর যানবাহন চোখে পড়ল। কর্নেল বললেন–পশ্চিমে একটা পাকা সড়ক আছে। শর্টকাটে হাইওয়েতে পৌঁছোনো যায়। তাই এই রাস্তা এমন নির্জন হয়ে আছে।
ও সি রাজেন্দ্র হাটি সহাস্যে বললেন-মর্নিং কর্নেল সরকার।
কর্নেল হাসলেন। -মর্নিং হাটি। আশা করি, আমাদের দেরি হয়নি?
মোটেও না।
আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। কর্নেল প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদারের সঙ্গে মি. হাটির আলাপ করিয়ে দিলেন। তারপর বললেন–সেই ট্যাক্সিটা কি থানায় নিয়ে গেছেন?
