তার মানে ক্যাপটেন সিংহকে ক্লোরোফর্মের সাহায্যে অজ্ঞান করেছিল ওরা?
-হ্যাঁ। ঠিক কইছেন কর্নেল স্যার।
আপনি কি কফি খাবেন? কফি নার্ভ চাঙ্গা করে হালদারমশাই!
হালদারমশাই এবার মুচকি হেসে বললেন–খামু। কিন্তু আসল ঘটনা এখনও কই নাই। শোনেন কর্নেল স্যার! চৌতিরিশ বৎসরের পুলিশ-লাইফ যার, তারে ফান্দে ফেলে কোন হালায়?
কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন–আবার কি কেউ আপনাকে আক্রমণ করেছিল?
–হঃ। ক্যাপটেন সিংহর বাড়ির পিছনে একটা গলি দিয়া শর্টকাট করছিলাম। গলিতে আলো কম ছিল। হঠাৎ পাশ থেইক্যা কে আমারে কইল, আপনি মি. হালদার না? আপনার লগে কথা আছে। একটু দাঁড়ান। আমি যেই তার দিকে ঘুরছি, সে চিত্তকার করল, চোর! চোর! তারপর আমার গলার কাছে সোয়েটার চাইপ্যা ধরল। এদিকে তার চিৎকার শুইন্যা আরও লোকে চিৎকার করছিল। চোর! চোর! আমি তখনই তার ফান্দ ট্যার পাইছি। তার প্যাটে একখান লাথি মারলাম। হালা মাটিতে পড়ল। অমনি আমি দৌড় দিলাম। পিছনে পাড়াসুন্ধু চিৎকার করছিল, চোর! চোর।
কর্নেল হেসে ফেললেন। -হ্যাঁ। আপনি ঠিকই বলেছেন। ওটা একটা ফাঁদই বটে। কলকাতায় এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কোনও শত্রুকে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলার জন্য চোর! চোর চিৎকার ভালো কাজ দেয়। লোকেরা কিছু না বুঝেই বেচারাকে পেটাতে শুরু করে।
বললাম-হালদারমশাই তাহলে খুব বেঁচে গেছেন!
হালদারমশাই বললেন–আমারে পেটায় কে? পকেটে রিভলভার ছিল। দুরাউন্ড গুলি ছুঁড়লেই লোকেরা–হঃ! কী যে কন জয়ন্তবাবু!
ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল। চুপচাপ কফি খেয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভের উত্তেজনা থিতিয়ে গেল। আবার একটিপ নস্যি নিয়ে তিনি বললেন–লোকটা হরিবাবুর স্যাঙাত। কিন্তু আশ্চর্য লাগে কর্নেলস্যার, সে আমার নাম জানল কীভাবে?
কর্নেল এবার গম্ভীর হয়ে বললেন-বোঝা যাচ্ছে, হরিবাবু ক্যাপটেন সিংহের দিকে নজর রাখার জন্য ভগত ছাড়াও আরও কাকেও বেছে নিয়েছিল। সে এমন লোক, যে ক্যাপটেন সিংহের বাড়ির কাছাকাছি থাকে। সম্ভবত সুশীলাকে সে চেনে। যাই হোক, এবার কাজের কথা বলি।
হালদারমশাই বললেন–যেখানে যাইতে কইবেন, যামু।
–হালদারমশাই! উত্তেজিত হবেন না যেন। মাথা ঠান্ডা রেখে শুনুন।
–কন কর্নেল স্যার।
–কিছুক্ষণ আগে চন্দ্রপুর থানা থেকে খবর পেয়েছি, চন্দ্রপুর যাওয়ার পথে তিতলিপুর জঙ্গলের ধারে সেই ট্যাক্সিটা পাওয়া গেছে। সুশীলাকে কেউ মাথার পিছনে গুলি করে মেরে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছে। ট্যাক্সিডাইভারকে পাওয়া যায়নি। খালি ট্যাক্সিটা রাস্তার ধারে দাঁড় করানো আছে।
গোয়েন্দাপ্রবর গুলিগুলি চোখে কথাগুলো শুনছিলেন। গোঁফের দুইভাগ তিরতির করে কাঁপছিল। এবারে জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন–হরিবাবু না। অরে মারছেন ক্যাপটেন সিংহ। ওনার ফায়ার আর্মস থাকা স্বাভাবিক। জ্ঞান ফেরার পর ক্যাপটেন সিংহ সুশীলারে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দিচ্ছেন।
আমি বললাম-হরিবাবুর তা হলে কী হল?
–তারেও মারছেন ক্যাপটেন সিংহ।
–তার সঙ্গে ভগত ছিল!
–প্রাণভয়ে ভগত পলাইয়া গেছে। ট্যাক্সিড্রাইভারও পলাইয়া গেছে।
–ক্যাপটেন সিংহ নাকি অসুস্থ এবং বৃদ্ধ মানুষ। তিনি হরিবাবুর লাশের কি ব্যবস্থা করেছেন তা হলে?
ঘটনাস্থলে গিয়া ক্লু খুঁজলেই মিলব। শিয়োর! তাই না কর্নেল স্যার?
কর্নেল চুরুট টানছিলেন। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন-হালদারমশাই ঠিকই বলেছেন। ঘটনাস্থলে না গেলে কিছু বোঝা যাবে না। হালদারমশাই! এবার বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিন। তারপর কাল সকাল আটটার মধ্যে আমার এখানে চলে আসবেন। আপনার এবার বিশ্রাম দরকার। খুব ধকল গেছে। ….
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার আস্তেসুস্থে বেরিয়ে গেলেন। তারপর কর্নেল টেবিল-ল্যাম্পের আলো জ্বেলে মি. সোমের দিয়ে যাওয়া খামটা খুললেন। ভিতরে টাইপ-করা দু শিট কাগজ ছিল। ওতে শিপিং কর্পোরেশনের এক অফিসার অজয়েন্দু নারায়ণ রায়ের জাহাজি জীবন সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য আছে।
কর্নেল দু শিট কাগজে দেওয়া তথ্যগুলো অন্তত বার তিনেক পড়ার পর সোজা হয়ে বসলেন। আমার দিকে ঘুরে বললেন–ভদ্রলোক যেন আরব্য উপন্যাসের একটি চরিত্র। আশা করি, জয়ন্ত আরব্য উপন্যাস পড়েছে?
-পড়েছি। স্রেফ রূপকথা। তবে পড়তে ভালো লাগে। বিশেষ করে সিন্দবাদ নাবিকের উপাখ্যানগুলো রোমাঞ্চকর।
কর্নেল হাসলেন। –বাঃ সিন্দবাদ নাবিক! অজয়েন্দু নারায়ণ রায়ের জাহাজি জীবনটাও কতকটা ওইরকম মনে হল। অবশ্য জাহাজ কোম্পানির তথ্যে এ ধরনের ইশারা আছে মাত্র। কোনও বড়ো বন্দরে তাদের জাহাজ নোঙর করে বেশ কিছুদিন কোনও কারণে আটকে থাকলে অজয়েন্দুশম্ভুনাথ চৌধুরিকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে যেতেন। এটা জাহাজ কোম্পানির অফিসার বা কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়মবিরোধী কাজ। কিন্তু ক্যাপটেন সুশীলকুমার সিংহ তাদের গার্জেন। হা-ক্যাপটেন সিংহের দেশের বাড়ি ছিল চন্দ্রপুর।
-বলেন কি! ওই কাগজ দুটো আমাকে দিলে পড়ে আনন্দ পেতাম।
কর্নেল খামটা সকৌতুকে টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে মিটিমিটি হেসে বললেন–এখন বেশি কিছু জানতে নেই। জানলে চূড়ান্ত চমকের মজা থেকে বঞ্চিত হবে। মুখে-মুখে বরং যা বলি, শুনতে পারো।
অগত্যা বললাম–কাকেও হাতের তাস আগেভাগে দেখান না আপনি। তো ঠিক আছে। মুখেই বলুন।
