কর্নেল হাসলেন। হরিবাবু নিজে না এসে তার চ্যালা ভগতকে সেসব জিনিস নিয়ে যেতে বলে থাকবে। কারণ হালদারমশাই দেখেছিলেন, বাড়িতে ভগতকে রেখে সে সুশীলার সঙ্গে ট্যাক্সিতে চেপে চলে যায়। যাই হোক, এবার হালদারমশাইকে একটা কাজ করতে হবে।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন কন কর্নেলস্যার!
–আপনি সুশীলার বাড়ি চলে যান। খোঁজ নিন সে বাড়িতে আছে কি না। বাড়িতে থাকলে তার সঙ্গে কথা বলবেন না। আমাকে কোনও জায়গা থেকে টেলিফোনে শুধু জানিয়ে দেবেন। আর ট্যাক্সির নাম্বারটা এই কাগজে লিখে দিন।
কর্নেলকে নাম্বারটা লিখে দিয়ে হালদারমশাই বললেন–আপনি চাইলে ক্যাপটেন সিংহের নেমকার্ড আপনারে দিমু।
–দিন। সুশীলার ঠিকানাটাও বরং লিখে দিন। …
গোয়েন্দাপ্রবর অভ্যাসমতো সবেগে বেরিয়ে গেলেন। তারপর কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। একটু পরে সাড়া এলে তিনি বললেন-কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। ..মি. সোম! আপনাকে অজয়েন্দ্র রায়ের সম্পর্ক…ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ। ওটা কি কাকেও দিয়ে আমার কাছে পাঠাবেন?…ইউ আর ওয়েলকাম মি. সোম! আমার সৌভাগ্য…হ্যাঁ। আমি আছি। অন্তত এ-রাতে কোথাও বেরুচ্ছি না। শীতের রাতে এই বৃদ্ধ অর্কিড-পাখি-প্রজাপতি-ক্যাকটাসের জন্য কোথাও হানা দিতে অক্ষম মি. সোম। … ঠিক আছে। আসুন। ….
কর্নেল রিসিভার রেখে সোফায় হেলান দিলেন। বললাম–মি. সোম নামটা আমার শোনা মনে হচ্ছে।
কর্নেল চোখ বুজে বললেন–শিপিং কর্পোরেশনের কলকাতা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার মিঃ অসীম সোম।
-উনি থাকেন কোথায়?
–ক্যামাক স্ট্রিটে কোম্পানির বাংলোবাড়িতে…
প্রাধ আধঘণ্টা পরে ডোরবেল বাজল। তারপর একজন স্মার্ট চেহারার প্রৌঢ় ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে বললেন-পথে একটু দেরি হয়ে গেল। পার্ক স্ট্রিটে জ্যাম। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট আসবার কথা কাগজে পড়েছিলাম। সম্ভবত তার জন্যই পার্ক স্ট্রিটের ওই অবস্থা।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে তার করমর্দন করে বসালেন। তারপর বললেন–অনেকদিন পরে আপনি এলেন!
মি. সোম একটা ব্রিফকেস খুলতে খুলতে বললেন–হ্যাঁ। প্রায় এক বছর। গত নভেম্বরে এসে আপনাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিলাম।
কর্নেল হাসলেন। –ও কিছু না। আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডনরা অনেকেই আমার পাল্লায় পড়ে কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে। শাহিন খান এখন নাকি দুবাইয়ে ঘাঁটি করেছে। আপনাদের আর সে বিরক্ত করে না আশা করি?
–না। এই নিন আপনার অজয়েন্দু রায়ের পুরো ডেটা। এই খামে সব কাগজপত্র, মাদার কম্পিউটার থেকে বের করতে একটু সময় লেগেছে, এই যা।
কর্নেল একটা লম্বা পেটমোটা খাম নিলেন এবং বললেন–আগে কফি। এটা পরে খুলব। খুঁটিয়ে পড়ার পর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে পরে আপনাকে রিং করব। ষষ্ঠী! শিগগির কফি চাই। হা–আলাপ করে দিই।
মি. সোম হাসলেন। দরকার হবে না। জয়ন্তবাবুকে আমি দেখেই চিনেছি। উনি হয়তো আমাকে ভুলে গেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে খিদিরপুর ডকে শিপিং কর্পোরেশনের একটা জাহাজভর্তি মাল চুরি যাওয়ার সাংঘাতিক ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। মি. সোমের সঙ্গে করমর্দন করে বললাম–দুঃখিত মি. সোম। ভুলে গিয়েছিলাম আপনার কথা।
-তাতে কী? আপনারা সাংবাদিক। নিত্যনতুন ঘটনা এসে আপনাদের ব্যস্ত রাখে।
এইসময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন–হ্যাঁ। বলুন মি. হাটি। .ও মাই গড! কোথায় ছিল ট্যাক্সিটা?..রাস্তা থেকে ছিটকে পড়েছিল, আপনি শিয়োর?…মেয়েটিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন?…সুশীলা দাসী?…মাথার পিছনে গুলি-কী অদ্ভুত! ঠিক দীপনারায়ণবাবুর মতো…হা, ট্যাক্সিড্রাইভারের পালানোরই কথা। …সকালে দেখা হবে। রাখছি। …
.
১০.
শিপিং কর্পোরেশনের ম্যানেজার অসীম সোম কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার রেখে তার দিকে ঘুরে বসলেন। মি. সোম একটু হেসে বললেন–অজয়েন্দু রায়ের সঙ্গে কোনও এক সুশীলা দাসীকে মার্ডারের সম্পর্ক নেই তো?
কর্নেলও হাসলেন। –আছে।
–বলেন কী কর্নেল সরকার!
যথাসময়ে সব আপনাকে জানাব।
ঘড়ি দেখে মি. সোম উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–চলি তাহলে। আজ সন্ধ্যায় আমাদের ক্লাবে একটা ডিনার পার্টি আছে। আপনাকে খামটা দিয়ে সেখানে যাব ভেবেছিলাম। একটু দেরি হয়ে গেল। …
অসীম সোম চলে যাওয়ার পর বললাম–একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল তাহলে। যে-সুশীলার সাহায্যে হরিবাবু ক্যাপটেন সিংহকে কিডন্যাপ করেছে, তাকেই হরিবাবু কেন গুলি করে মারল?
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অভ্যাসমতো চোখ বুজলেন। বুঝলাম, আমার এই প্রশ্ন নিয়ে তিনি আপাতত আলোচনায় রাজি নন।
কিছুক্ষণ করে ডোরবেল বাজল। তারপর সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই। তাঁকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কর্নেল চোখ খুলে বললেন-বলুন হালদারমশাই!
হালদারমশাই জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন-সুশীলা থাকত একটা তেরপলের ঝোপড়িতে। একজন কইল, সুশীলা তার ঝোপড়ি পাঁচু মিস্ট্রিরে বিক্রি কইর্যা দ্যাশে গেছে। পাঁচু মিস্ট্রিরে জিগাইলাম সুশীলার দ্যাশ কোথা? পাঁচু কইল, সে-খবর তার জানা নাই!
-আপনাকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে কেন?
গোয়েন্দাপ্রবর এক টিপ নস্যি নেওয়ার পর আস্তে বললেন–ক্যাপটেন সিংহর বাড়ি গিছলাম। পুলিশ ওনার ঘরের তালা ভাইঙ্গ্যা ঢুকছে। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সেই নরেশবাবুরে দেখলাম। আমারে দেইখ্যা উনি কইলেন, ঘরে ক্লোরোফর্মের কড়া গন্ধ ট্যার পাইছেন।
