অন্য এক ভদ্রলোক একটু তফাতে পানের দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে সহাস্যে বললেন-হরিবাবুকে অ্যারেস্ট করতে এসেছেন তো? একদিন আপনারা আসবেন, তা জানতাম।
নরেশবাবু বললেন–আপনি কে? কোথায় থাকেন?
–আজ্ঞে, আমি অ্যাডভোকেট নরেন্দ্রকুমার সেনের ক্লার্ক পরিতোষ মণ্ডল। আমার স্যারেরও হরিবাবু সম্পর্কে সন্দেহ ছিল। বাড়িটা এক বিধবা মহিলার। বছর সাত আট আগে তার কাছে হরিবাবু কিনেছিল, পুরো টাকা দেয়নি। আমার স্যার সেই মহিলাকে হেল্প করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হরিবাবুর হাতে অনেক গুণ্ডামস্তান আছে। আজকাল কী অবস্থা হয়েছে তা তো আপনাদের চেয়ে বেশি কে বুঝবে স্যার? হ্যাঁ! তালা ভেঙে সার্চ করুন আপনারা। পাড়ার লোকরা খুশি হবে স্যার। লোকটা চোরাকারবারি বলে গুজব রটে গেছে।
কিছুক্ষণ পরে দুজন কনস্টেবল একটা ছোট্ট লোহার রডের সাহায্যে তালাটা ভেঙে ফেলল। বুঝলাম, এ-কাজে দুজনেই বেশ দক্ষ। এইসমর হালদারমশাই চাপাস্বরে নরেশবাবুকে বললেন পিছনের দিকে বাড়ির কোনও দরজা আছে কিনা কে জানে!
নরেশবাবু একটু হেসে বললেন–ভাববেন না মি. হালদার! আমাদের লোকজনের সেদিকেও নজর আছে।
দরজার ভিতরে সংকীর্ণ একটা করিডর। বাঁদিকে একটা তিনতলা বানি। জানালায়-জানালায় অজস্র মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। ডান দিকে হরিবাবুর বাড়ি এবং নিচের তলায় একটা দরজা। সেই দরজাতেও তালা আঁটা ছিল। তালা ভেঙে একটা ঘরে ঢুকে নরেশবাবু সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। পুরোনো সোফাসেট, জীর্ণ একটা চেয়ার আর টেবিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, এ ছাড়া ঘরটাতে কিছুই নেই। এই ঘরের কোণ থেকে দোতলার সিঁড়ি উঠে গেছে। কর্নেল নিচের তলার পাশের ঘরে উঁকি দিয়ে বললেন, -এই ঘরে ভগত থাকে মনে হচ্ছে।
একটা খাটিয়া। মশারি ঝুলছে দেয়ালের কোণে। বিছানা ছাড়া কেরোসিন কুকার, অ্যালুমিনি য়ামের হাঁড়ি, ঘটি আর বাসন-কোসন ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। কর্নেল বিছানা তুলে দেখলেন। তলায় কিছু নেই।
দোতলাতেও দুটো ঘর। প্রথম ঘরটার দরজার তালা ভাঙতে হল। এই ঘরে ভগতের খাটের মতোই খাট ছাড়া আর কোনও জিনিস নেই। পাশের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন নরেশবাবু। একটা সেকেলে খাটে বিছানা পাতা আছে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে। একটা মাত্র কাঠের আলমারিতে অগোছাল বই ঠাসা। সব বই ধর্মসংক্রান্ত। পুবের জানালার ওপরে একটা তাকে সিদ্ধিদাতা গণেশের সিঁদুররাঙা মূর্তি। কিছু শুকনো ফুল পড়ে আছে।
প্রথমে পুলিশি ধরনে সার্চ শুরু হল। কর্নেল খাটের তলায় উঁকি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুচকি হেসে বললেন–হালদারমশাই! হরিবাবু মনে হচ্ছে শুধু ব্রিফকেস আর ছড়ি নিয়ে কেটে পড়েছে। এমন কিছু রেখে যায়নি, যাতে তাকে খুঁজে বের করার সুত্র পাওয়া যায়।
বালিগঞ্জ থানার অফিসার নরেশবাবুকে বললেন–আমার ধারণা, হরিবাবু এখানে মাঝে মাঝে এসে থাকত। স্থায়ীভাবে কেউ এ-বাড়িতে বসবাস করলে আরও আসবাব বা জিনিসপত্র পাওয়া যেত।
বিছানার ওপর চাদরটা তত পরিষ্কার নয়। বালিশ দুটোও যেমন-তেমন। তলার পুরোনোনা তোশক নিচে ফেলে দুজন কনস্টেবল নারকেল ছোবড়ার গদি টেনে এনে একপাশে নামাল। নরেশবাবু বালিশ, তোশক আর গদি খোঁজাখুঁজি করে হাসলেন। লোকটা যে-ই হোক, খুব ধুরন্ধর। নিজের এতটুকু চিহ্ন রেখে যায়নি। কর্নেলসায়েব! আপনার কী ধারণা?
কর্নেল বললেন–আপনার সঙ্গে আমি একমত। চলুন। বেরুনো যাক…
বালিগঞ্জ থানার অফিসারের নির্দেশে দোতলার দরজায় একজন কনস্টেবল হাতকড়া এঁটে দিল। আমরা নেমে এলাম।
গলিতে ততক্ষণে মানুষের ভিড় হটাচ্ছে পুলিশ। নরেশবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে কর্নেল বললেন- বাকিটা পুলিশের হাতে ছেড়ে দিয়ে এবার আমরা কেটে পড়ি জয়ন্ত! আসুন হালদারমশাই!…
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ষষ্ঠীচরণের তৈরি সুস্বাদু কফি খেতে খেতে বললাম–একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে কর্নেল! সত্যি! ভীষণ অবাক হয়েছি।
কর্নেল বললেন- কী ব্যাপারে?
রীতিমতো হইহল্লা করে পাড়ায় শোরগোল তুলে হরিবাবুর বাড়িতে হানা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন কেন? এতে তো হরিবাবু খুব সতর্ক হয়ে যাবে। ওর চ্যালাদের কেউ-কেউ নিশ্চয় ঘটনাস্থলে ছিল।
হালদারমশাই বললেন- জয়ন্তবাবু ঠিক কইছেন। আমিও কিছু বুঝলাম না। দুয়ারে তালা আটকানো ছিল। তার মানে বাড়ির ভিতরে হরিবাবু নাই। আমার ক্লায়েন্টরে কিডন্যাপ কইরা নিজের বাড়িতে সে রাখবে ক্যান?
কর্নেল চুপচাপ কফি খাওয়ার পর চুরুট ধরালেন। তারপর একটু হেসে বললেন-হ্যাঁ! রীতিমতো শো-বিজনেস বলা যায়। তোমাদের কথা ঠিক। কিন্তু এর দরকার ছিল।
গোয়েন্দাপ্রবর বললে–ক্যান কর্নেলস্যার?
–হরিবাবুর সঠিক ডেরা যে ওই বাড়িটা নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল। ওখানে সে সবসময় থাকত না, তা ওর ঘরগুলো দেখেও বোঝা গেল। অথচ হালদারমশাই তাকে ফিটফাট ফুলবাবুর বেশে দেখেছেন। যে ওইরকম ফুলবাবুটি সেজে বেরোয়, ঘরে তার অন্তত একটু আভাস মিলবে। কিন্তু মিলল না। ঘরগুলো একেবারে সাদামাটা। চালচুলোহীন লোকের আস্তানা। সোফাসেটও ছেঁড়াখোঁড়া।
বললাম–ক্যাপটেন সিংহকে কিডন্যাপ করার পর সে এসে ঘরের দামি বা দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে গেছে হয়তো।
