কর্নেল সেজেগুজে বেরিয়ে এলেন। বললেন–আপনি ভুল করেননি হালদারমশাই! আপনি ঘুড়ির সুতো ঢিলে করে দিয়েছেন। ক্যাপটেন সিংহকে কিডন্যাপ করার যথেচ্ছ সুযোগ পেয়েছে হরিবাবু। এর ফলে বরং আমাদেরই সুবিধে হয়েছে। চলুন। বেরুনো যাক। ষষ্ঠী! দরজা বন্ধ কর। কোনও ফোন এলে বলবি, আমি বেরিয়েছি। কখন ফিরব, কিছু ঠিক নেই। …
গাড়ির পিছনের সিটে হালদারমশাই আর কর্নেল বসলেন। দু-পাশের জানালার কাচ তুলে দিলেন কর্নেল। বুঝলাম, উনি সারাপথ আত্মগোপন করে থাকতে চান। বড়ো রাস্তায় পৌঁছে আমার অস্বস্তি ফিরে এল। ব্যাকভিউ মিররে লক্ষ্য রাখলাম, কোনও লাল মারুতি আমাদের অনুসরণ করছে। কি না।
কর্নেল নির্দেশে ড্রাইভ করছিলাম। রাস্তায় লাল মারুতি পিছনে বা সামনে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। একবার ভাবলাম, অস্ত্রটা বাঁ পাশে সিটের ওপর ফেলে রাখি। কিন্তু কার্নেল কী বলবেন ভেবে তা করলাম না। শীতের বিকেল দ্রুত রং হারিয়ে ফেলছে। ল্যান্সডাউন রোডের মোড়ে জ্যামে কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেলাম। তারপর ক্রমশ রাস্তার দু-ধারে আলো জ্বলে উঠল।
পিছনে কর্নেলকে বলতে শুনলাম–সেই গলিটা চিনতে পারবেন তো?
হালদারমশাই বললেন–পারব। মুখস্থ হইয়া গেছে। এখনও কিছুটা দুর আছে। হাজরা রোড পার হইয়া।
কর্নেল একটু ঝুঁকে আমার প্রায় কানের কাছে বললেন-হাজরা রোডের মোড়ে গাড়ি একটু সময় দাঁড় করাবে। ওখানে লালবাজার থেকে ডিটেকটিভ এস আই নরেশ ধরের জিপ আর বালিগঞ্জ থানার পুলিশের গাড়ি অপেক্ষা করার কথা। বরং স্পিড কমিয়ে বাঁদিকে ঘেঁষে চলল।
একটু হেসে বললাম–আপনার বাইনোকুলার আনা উচিত ছিল।
কর্নেল কিছু বললেন না। হালদারমশাই বললেন–কী যে কন জয়ন্তবাবু! চারিদিকে আলোর প্রচণ্ড ছটা। বাইনোকুলারের কাম না।
মিনিট দশেক পরে দেখতে পেলাম, হাজরা রোডের মোড়ের এদিকে ফুটপাত ঘেঁষে পুলিশের। একটা জিপ আর একটা কালো ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। নরেশবাবু জিপের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। আমার ফিয়াট গাড়ির নম্বর ওঁর জানা।
কাছাকাছি গিয়ে একবার হর্ন বাজালাম। নরেশবাবু তাকালেন। তারপর হাতের মৃদু ইশারায় এগিয়ে যেতে বললেন। একটু পরে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে এগিয়ে চললাম। ব্যাকভিউ মিররে লক্ষ্য করলাম, নরেশবাবুর বাহিনী একটু দূর থেকে আমাদের অনুসরণ করছে।
মিনিট পাঁচেক পরে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন-সামনে বাঁদিকের গলি জয়ন্তবাবু!
গলিটা সংকীর্ণ। দুটো গাড়ি যাতায়াত করতে পারে। রিশ, ঠ্যালাগাড়ি, মানুষজনের ভিড় পেরিয়ে হালদারমশাইয়ের নির্দেশে আবার বাঁদিকে ঘুরলাম। কর্নেল বললেন-জয়ন্ত! গাড়িটা ওই বটতলার মন্দিরের কাছে রাখো।
এই গলিতে তত আলো নেই। দুধারে ঠাসাঠাসি উঁচু বাড়ি। ফুটপাত বলতে কিছু নেই। তবে এখানে তত ভিড় নেই। শুধু মন্দিরের চত্বরে বসে বিহারের দেহাতি লোকেরা ঢোল কত্তাল তুমুল বাজিয়ে ধর্মসঙ্গীত গাইছে। পাঁচটা বাজতেই এখন রাতের ছায়া। সেই ছায়াকে অবশ্য দুধারের বাড়ির জানালা থেকে আসা আলোর ছটা এলোমেলো করে ফেলেছে। গলিটা ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। পথচারীদের কোনও কৌতূহল এখুন লক্ষ্য করছিলাম না।
বেরিয়ে গাড়ি লক করে দেখলাম, কর্নেলও হালদারমশাই একটা বাড়ির দরজার সামনে পৌঁছে গেছেন। তাদের একটু তফাতে পুলিশের গাড়ি দুটো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু নরেশবাবু জিপ থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এটাই তা হলে সেই হরিবাবুর বাড়ি? বাড়িটা দোতলা। একপাশে দরজা বা গেট। দোতলা বা একতলায় কোনও আলো নেই। কর্নেল চাপা স্বরে বললেন–হালদারমশাই! ব্যাড লাক। দরজার বাইরে তালা আঁটা।
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন-মাগো পুলিশ হেল্প করুক। তালা ভাইঙ্গা বাড়ি সার্চ করুম! আপনি নরেশবাবুরে ডাকেন।
নরেশবাবু ততক্ষণে এসে গেছেন। একটু হেসে বললেন–ব্ল্যাংক সার্চ ওয়ারেন্ট এনেছি। নাম, বাড়ির নাম্বার, গলির নাম বসিয়ে নিলেই চলবে। তবে আপাতত তার দরকার দেখছি না। তালা ভেঙেই ঢুকতে হবে।
পুলিশভ্যান থেকে একজন উর্দিপরা অফিসার এবং সশস্ত্র কনস্টেবল বাহিনী ডেকে আনলেন নরেশবাবু। এবার পথচারীরা থমকে দাঁড়াচ্ছে দেখতে পেলাম। নরেশবাবুর জিপ থেকে সাদা পোশাকের পাঁচজন পুলিশ নেমে এল। তাদের হাতে বেঁটে লাঠি। তারা ভিড় হটাতে ব্যস্ত হল। দু-পাশের বাড়ির জানালা আর ব্যালকনি থেকে লোকেরা ব্যাপারটা দেখছে।
এক ভদ্রলোক নরেশবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন-হরিবাবুকে খুঁজছেন কি?
-হ্যাঁ। আপনি কে?
আজ্ঞে স্যার, আমার নাম অমরেন্দ্র বিশ্বাস। পাশের বাড়িটা আমার।
–তা হলে তো হরিবাবুকে আপনি চেনেন?
–চিনি মানে, তত কিছু না। উনি বেরোন কদাচিৎ। ওঁর সারভ্যান্ট ভগতকেও একটু-আধটু চিনি। হরিবাবু বাড়ি বেচে চলে যাবেন শুনেছি। প্রায়ই খদ্দের আসে দেখেছি। কী জানি কী ব্যাপার বুঝি না। তা স্যার আপনারা…
নরেশবাবু এবার পুলিশি মেজাজে বললেন-বাড়ির পাশে একজন ক্রিমিন্যাল থাকত। আর আপনারা কিছু টের পেতেন না?
অমরেন্দ্র বিশ্বাস করজোড়ে বললেন–আমি ছাপোষা মানুষ স্যার! কী করে জানব পাড়ার কোন লোক ক্রিমিন্যাল?
-হরিবাবু তালা এঁটে কখন কেটে পড়েছে, জানেন?
ভদ্রলোক বললেন-না স্যার! আমি লক্ষ্য করিনি কিছু। অফিস থেকে ফিরে একটা নার্সিং হোমে গিয়েছিলাম। আমার ভগ্নীপতির হার্টের অসুখ। সেখান থেকে আসছি।
