কর্নেল হাসলেন। চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছি। কিন্তু ক্যাপটেন সিংহ যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা হালদারমশাইকে জানাননি, এটাই আশ্চর্য!
–আমার মতে, যে-ভাবে হোক, ক্যাপটেন সিংহের সঙ্গে আপনার দেখা করা উচিত।
–দেখা যাক।
বলে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ধ্যানস্থ হলেন। আমার ভাতঘুম কেটে গেছে। আমি উঠে গিয়ে সোফায় বসলাম। শীতের দিনের আলো কমে এসেছে। একটু পরে ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে। গেল। কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর কফিতে চুমুক দিলেন। মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য। তাই আমিও গম্ভীর হয়ে কফি খেতে থাকলাম।
কফিপানের পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। দেখলাম, সেই বিকট গাম্ভীর্যটা আর নেই। মুখে একটু হাসি ফুটেছে। বললেন–ডার্লিং! ভাতঘুম নষ্ট করেছি এবং একটু বকে দিয়েছি বলে এই বৃদ্ধের প্রতি তোমার ক্ষোভ হওয়া স্বাভাবিক।
হেসে ফেললাম। –মোটও না। আপনি তুম্বো মুখ করে থাকলে অস্বস্তি হয়।
-আমি ক্যাপটেন সিংহের পরিচারিকা সুশীলার ব্যাপারটা ভাবছিলাম। মেয়েটি জাহাজিবাবু। শঙ্কু চৌধুরির চর বলে হালদারমশাইয়ের অনুমান। অনুমানটা সম্ভবত ঠিকই। কিন্তু সেই মেয়ে আজ হরিবাবুর বাড়ি এসে ট্যাক্সি চেপে হরিবাবুর সঙ্গে কোথাও বেরিয়েছে। তাহলে হরিবাবুর সঙ্গে জাহাজিবাবুর সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই না?
–অঙ্ক কষলে তা-ই দাঁড়াচ্ছে বটে! কিন্তু কে এই হরিবাবু?
–সঠিক প্রশ্ন।
–তার মানে, আমরা তিতলিপুরের জঙ্গলে পথ হারিয়ে হন্যে হচ্ছি।
কর্নেল তার বিখ্যাত অট্টহাসিটি হাসলেন। তারপর বললেন–ঠিক বলেছ। তিতলিপুরের জঙ্গলে দুর্লভ প্রজাতির নীল সারসের চেয়ে আরও দুর্লভ কিছু আছে।
অবাক হয়ে বললাম–তার মানে?
এইসময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। –বলছি! বলুন নরেশবাবু!..ধন্যবাদ! চন্দ্রপুরের ও সিমি. রাজেন্দ্র হাটি বুদ্ধিমান!…হ্যাঁ। দীপনারায়ণবাবুর ঘরে নিশ্চয় কিছু সূত্র পাওয়া যেতেই পারে। ..ঠিক আছে। রাখছি।
কর্নেল রিসিভার রেখে আবার আমার দিকে সহাস্যে তাকালেন। বললাম–সুনয়নী দেবীর বাড়িতে সাদা পুলিশের গার্ড রাখবার কথা বলেছিলেন। সেই ব্যাপারটা কি?
-ঠিক ধরেছ।
–কিন্তু কখন লালবাজারের ডিটেকটিভ সাব-ইনপেকটার নরেশবাবুকে ফোন করেছিলেন?
–তুমি যখন বাথরুমে স্নান করছিলে!
-একটু আগে আপনি বললেন, তিতলিপুরের জঙ্গলে নাকি আরও দুর্লভ কিছু আছে। ব্যাপারটা কী?
কর্নেলের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে আবার বাধা পড়ল। ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!
তারপর প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার আবার সবেগে প্রবেশ করে সোফায় সশব্দে বসলেন। বললেন-হেভি মিস্ট্রি কর্নেলস্যার!
কর্নেল বললেন-বলুন হালদারমশাই!
এবার হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে যা বললেন, তার সারমর্ম এই : গোয়েন্দাপ্রবর ক্যাপটেন সিংহের বাড়ি গিয়ে দেখেন, তার দোতলার ঘরের দরজা এবং কোলাপসি গেটে তালা আঁটা। একতলার মুদির দোকানের মালিক মিছরিলালকে তিনি ক্যাপটেন সিংহের কথা জিজ্ঞেস করেন। মিছরিলাল তাকে বলেছে, ক্যাপটেনসায়েবের হঠাৎ স্ট্রোক হয়েছিল। সুশীলা ট্যাক্সিতে একজন ডাক্তারবাবুকে ডেকে এনেছিল। সেই ট্যাক্সিতে অজ্ঞান অবস্থায় ক্যাপটেনসায়েবকে কোনো নার্সিং হোম কিংবা হাসপাতালে নিয়ে গেছে। মিছরিলালকে সুশীলা ডেকেছিল। মিছরিলাল একা একশো। সে ক্যাপটেনসাহেবকে সিঁড়ি দিয়ে বয়ে এনে ট্যাক্সিতে ঢুকিয়েছিল। সুশীলা পিছনের সিটে ক্যাপটেনসায়েবকে ধরে বসে ছিল। সামনের সিটে বসেছিলেন ডাক্তারবাবু।
সবটা শোনার পর আমি বললাম–কিন্তু হেভি মিস্ট্রি বলছেন কেন হালদারমশাই?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন–বুঝলেন না? হরিবাবু তো ডাক্তার না। তারে ডাকতে অত দূর থেইক্যা সুশীলা আইবে ক্যান? ক্যাপটেন সিংহরে কিডন্যাপ করছে হরিবাবু।
দেখলাম, কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করে কাকে চাপাস্বরে কিছু বলছেন। হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন–ট্যাক্সির নম্বর লইছি। পুলিশেরে কর্নেলস্যার নম্বরটা জানাবেন। তারে ধরলে মিস্ট্রি সম্ভ হওনের কথা। …
.
০৯.
রিসিভার রেখে কর্নেল বললেন–জয়ন্ত! পোশাক বদলে নাও। এখনই বেরুতে হবে। আমিও রেডি হয়ে নিই।
তখনই উঠে পড়লুম। যে ঘরে আমার ডেরা, সেখানে গিয়ে পোশাক বদলে নিলাম। জ্যাকেটের ভেতর-পকেটে গুলিভরা রিভলভারটাও সাবধানে রাখলাম।
ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি, হালদারমশাই বিরসবদনে বসে আছেন। কিন্তু গোঁফের ডগার কাপন দেখে বোঝা যাচ্ছে, উনি প্রচণ্ড উত্তেজিত। আমাকে দেখে বললেন–প্রব্লেম হইল গিয়া, তখন আমি পাগলার বেশ ধরছি। সেই ট্যাক্সিটারে ফলো করবার উপায় ছিল না। বড়ো রাস্তায় ট্যাক্সি পাইতাম। কিন্তু পাগলেরে কোনো ট্যাক্সিড্রাইভার পাত্তা দিত, কন জয়ন্তবাবু?
বললাম–ঠিক বলেছেন। আপনার কিছু করার ছিল না।
–ছিল। একটুকখান উপায় ছিল। আমারই ভুল।
–কীসের ভুল?
–বাড়ি ফিরিয়্যাই ক্যাপটেন সিংহরে ফোন করা উচিত ছিল আমার। সাড়া নিশ্চয় পাইতাম না। কাজেই সোজা ওনার বাড়ি যাওয়াই উচিত ছিল। গোয়েন্দাপ্রবর শ্বাস ছেড়ে ফের বললেন–তা না কইরা স্নান করছিলাম। খাওয়ায় মন দিছিলাম। তারপর কর্নেলস্যারেরে ফোন করছিলাম। ক্যান যে এমন মতিভ্রম হইল কে জানে? চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। এমন ভুল কখনও হয় নাই।
