কিন্তু টেলিফোনের বিরক্তিকর শব্দে আমার ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল।
কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন-বলুন হালদারমশাই!..কিন্তু আপনি কোথা থেকে ফোন করেছেন?..বাড়ি থেকে তার মানে…আশ্চর্য! বলেন কী! সুশীলা..হা আপনার অনুমান তাহলে সত্যি? তারপর? ..হুঁ..হুঁ..হুঁ ঠিক আছে। আপনি আপনার ক্লায়েন্ট ক্যাপটেন সিংহকে এখনই কথাটা জানাবেন না। …হ্যাঁ। আপনি এখনই আমার কাছে চলে আসুন। …আহা! চর্মচক্ষে দিনের বেলায় হরির দর্শন পেয়েছেন। আপনি ভাগ্যবান। ..রাখছি। চলে আসুন।
কর্নেল রিসিভার রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। বললাম–আমার ভাতঘুম আজ আর বরাতে নেই। কিন্তু গোয়েন্দাপ্রবর সাংঘাতিক কিছু খবর আপনাকে জানিয়ে দিলেন মনে হচ্ছে। ঘুমের জন্য তাই আমার দুঃখু নেই। কিন্তু সুশীলা-র ব্যাপারটা কী? ক্যাপটেন সিংহের পরিচারিকা
কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-ঘুম না আসে, চোখ বুজে ভেড়ার পালের ভেড়াগুলো শুনতে থাকো। আমি ততক্ষণ চুরুটের সুখ উপভোগ করি। নো মোর টক। …
কতক্ষণ পরে ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!
তারপর সবেগে গোয়েন্দাপ্রবর কে কে হালদার ঘরে ঢুকলেন। দেখলাম, তার মুখে প্রসন্ন হাসি। পরনে প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার। ছদ্মবেশ ছেড়ে স্নান করেছেন, তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। সোফায় বসে আগে একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর বললেন-কর্নেল স্যার কইছিলেন হরির দর্শন পাইছি। হঃ! তা পাইছি।
কর্নেল বললেন এবং ক্যাপটেন সিংহের কাজের মেয়ে সুশীলারও?
-হঃ। ঠিক কইছেন!
–কার দর্শন কোথায় পেলেন?
–ফোনে কওন যায় না। এখন কইয়া ফেলি। আমি পাগলা সাজছিলাম। সেই গলির অন্যদিকে বটতলায় একখান মন্দির আছে। সেইখানে বইয়া ছিলাম। হঠাৎ দেখি, সুশীলা আইয়া হরিবাবুর বাড়িতে ঢুকল। তারপর সেই লোকটা–যে ক্যাপটেন সিংহরে ফলো করে, সে বারাইল। কিছুক্ষণ পরে সে একখান ট্যাক্সি আনল। এইবার বাড়ি থেইক্যা যিনি বারাইলেন, তিনিই যে হরিবাবু তা বুঝলাম। ক্যান কী, গলিতে এক ভদ্রলোকে তারে নমস্কার কইরা কইল–এই যে হরিবাবু! কেমন আছেন? হরিবাবু ট্যাক্সিতে চাপল। তার লগে সুশীলাও চাপল। ট্যাক্সিখান যাওয়ার পর সেই ভদ্রলোক হরিবাবুর লোকেরে জিগাইলেন, তোমার বাবু বাড়ি বেচবেন শুনলাম? নোকটা কী একটা কইল, বুঝলাম না। সে বাড়ি ঢুকল। আমিও উঠলাম। ট্যাক্সির নাম্বার দেখছিলাম। পরে নোটবইয়ে টুকছি। কে কইল দেখি নাই–পাগলা লেখাপড়া জানে! আর একজন হাসতাছিল সেয়ানা পাগল! এইসব শুইন্যা আমি কাট করলাম।
কর্নেল গম্ভীর মুখে শুনছিলেন। এতক্ষণে বললেন-হরিবাবুর চেহারা কেমন?
–দেইখ্যা বুড়া মনে হইব। কিন্তু বুড়া না। তাগড়া শরীর। মাথায় সাদা চুল। গোঁফ আছে। গোঁফ কাঁচাপাকা। পরনে ধুতি, সার্জের খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। কাঁধে শাল ছিল। হাতে ছড়ি ছিল। আর একখানা ব্রিফকেস।
আমি বলে উঠলাম–তাহলে এই হরিবাবু কখনই চন্দ্রপুরের জাজিবাবু নয়। হালদারমশাই আমার দিকে ঘুরে কী বলতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে আমাকে বললেন–উঠে পড়ো জয়ন্ত! শুয়ে কথা বলে রোগীরা। উঠে বোসো।
তারপর তিনি হালদারমশাইকে বললেন–আপনি কি সুশীলার বাড়ির ঠিকানা জানেন?
হালদারমশাই সোয়েটারের গলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে শার্টের পকেট থেকে একটা ছোট্ট নোটবই বের করলেন। পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললেন-ক্যাপটেন সিংহর লগে ঠিকানা লইছিলাম। উনি সুশীলারে বিশ্বাস করেন। কইছিলেন, মাইয়াটারে ওনার দেশের বাড়ি থেইক্যা আনছিলেন।
–ক্যাপটেন সিংহের তাহলে গ্রামে বাড়ি ছিল?
–হঃ।
–আপনি এ কথাটা আমাকে তো বলেননি।
গোয়েন্দাপ্রবর অবাক হয়ে বললেন–আপনি জিগান নাই। জিগাইলে কইতাম।
-ক্যাপটেন সিংহের দেশের বাড়ি কোথায়, তা কি জিজ্ঞেস করেছিলেন?
–না। আপনি যখন কইতাছেন, তখন এবার জিগাইমু।
–দেরি করা ঠিক হবে না হালদারমশাই। আপনি বরং এখান থেকে ফোনে ক্যাপটেন সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ওঁর ফোনে আড়ি পেতেছে কেউ, সে-কথা উনি আমাকে জানিয়েছেন। তাই না?
-হঃ।
–তাহলে ফোনে ওঁকে শুধু বলুন, আপনি ওঁর সঙ্গে জরুরি কাজে দেখা করতে যাচ্ছেন।
গোয়েন্দাপ্রবর তখনই রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। তারপর বললেন–রিং হইতাছে। কেউ ধরতাছে না ক্যান? আমি যাইয়া দেখি বরং। মিসটিরিয়াস ব্যাপার।
বলে উনি যথারীতি সবেগে বেরিয়ে যাওযার পর কর্নেল জাপানি ওয়ালকুকে সময় দেখে নিলেন। তারপর বললেন–শিপ কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মি. অসীম সোম এখনও সম্ভবত অজয়েন্দ্র রায়ের ব্যাপারে কোনও রেকর্ড খুঁজে পাননি। অথচ খুব শিগগির আমার ওটা দরকার।
বললাম–সুনয়নী দেবী বলছিলেন, ওঁর মেজদা পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এদিকে ক্যাপটেন সিংহ বলেছেন, জাহাজডুবির আগে উনি একটা গোপন জিনিস তার কাছে লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিলেন।
–হ্যাঁ। ক্যাপটেন সিংহ রিটায়ার করার পর সেই গোপন জিনিসটা নাকি বিছানার তলায় রেখেছিলেন। তা ছাড়া সেই জিনিসটা যে কী, তা কি ক্যাপটেন সিংহের জানবার কৌতূহল হয়নি? জয়ন্ত! ক্যাপটেন সিংহের কথাটা বড্ড গোলমেলে।
একটু উত্তেজিত হয়ে বললাম-কর্নেল! জিনিসটা জাহাজিবাবু চুরি করেছিলেন–এটা আপনারই সিদ্ধান্ত। তাহলে জিনিসটা একটা নলে রাখা পার্চমেন্ট! আপনি সেটা তিতলিপুরের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছেন।
